হালফিল বয়ান
জাতীয় স্বার্থ এবং নিরাপত্তা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্ব
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ২৫ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র জাতীয় স্বার্থের আলোকে প্রথাগত ও অপ্রথাগত নিরাপত্তা, তথা হার্ড ও সফট পাওয়ারের মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণ করে থাকে। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও বাস্তবতার ভিত্তিতে বাংলাদেশের মতো একটি রাষ্ট্রের জন্য তা অধিকতর জরুরি। বাংলাদেশ বর্তমানে গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে এক ‘সংকটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে’ অবস্থান করায় জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার ধারণাগুলোর প্রয়োগিক গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
বর্তমানে নিরাপত্তার ধারণা কেবল প্রথাগত সীমান্ত রক্ষা বা সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। যদিও রাষ্ট্রের প্রথাগত নিরাপত্তা বা সামরিক সক্ষমতার গুরুত্ব সর্বাগ্রে, তথাপি অপ্রথাগত নিরাপত্তা তথা সাইবার নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সংঘাত, অন্তর্ঘাত, বিদ্রোহ, খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্যের মতো বিষয়ের গুরুত্বও কম নয়। যেমন-বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ। যখন সাধারণ জনগণের রাজনৈতিক অধিকার বা গণতান্ত্রিক স্পেস সংকুচিত হয়, তখন তা রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে।
হার্ড পাওয়ার ও সফট পাওয়ারবিষয়ক জোসেফ নাই-এর ধারণাগুলো বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। হার্ড পাওয়ার বলতে মূলত সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক জবরদস্তিকে বোঝানো হয়। বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের সময় যখন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে জনমত দমনের চেষ্টা করা হয়, তখন গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ ঘটে। রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো প্রতিষ্ঠানের বৈধতা কমিয়ে দেয় এবং রাষ্ট্রের হার্ড পাওয়ারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। অন্যদিকে, সফট পাওয়ার হলো, আকর্ষণ এবং প্ররোচনার মাধ্যমে উদ্দেশ্য অর্জনের ক্ষমতা। একটি রাষ্ট্রের সফট পাওয়ার নির্ভর করে তার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশীল সমাজের সক্রিয়তা এবং স্বচ্ছতার ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র নেতৃত্বাধীন আন্দোলন একটি শক্তিশালী সফট পাওয়ারের বহিঃপ্রকাশ, যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছে।
আধুনিক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, হার্ড ও সফট পাওয়ারের কার্যকর সমন্বয়ই একটি রাষ্ট্রের টিকে থাকার মূল চাবিকাঠি। এতে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংযম নিশ্চিত হয়ে রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। এভাবে রাষ্ট্র আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধি করতেও সমর্থ হয়। রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে গণতান্ত্রিক মানদণ্ড এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কের ঘনত্ব বৃদ্ধি করার মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তাকে আরও সুসংহত করতে পারে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা কেবল অস্ত্রের ভাষা নয়, বরং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালীকরণ এবং জনসম্পৃক্ততার মাধ্যমে অর্জিত হতে পারে। এ কারণেই ২০২৬ সালের আসন্ন নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সুসংহতকরণের একটি ‘সাংবিধানিক মুহূর্ত’, যাতে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় ইস্যুগুলোকে সমাধানের পথে নেওয়াও সম্ভব হতে পারবে। বর্তমানে বাংলাদেশ যে সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, তাতে প্রথাগত সামরিক শক্তির চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, অংশগ্রহণ, অন্তর্ভুক্তি ও জননিরাপত্তার মতো অপ্রথাগত বিষয়গুলোকেও নিশ্চিত করা জরুরি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘদিনের সংকট একটি স্থায়ী নিরাপত্তার হুমকি তৈরি করেছে। একইভাবে, রোহিঙ্গা সমস্যা বাংলাদেশের জন্য আরেক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ। এটি কেবল মানবিক নয়, বরং একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক সমস্যাও বটে। অতীতের সরকার রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা অবলম্বন করেছিল। বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে লিংকেজ বা সংযোগ বৃদ্ধি করে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে। নির্বাচনের পর যে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসবে, তাদের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। সব রাজনৈতিক দল ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধভাবে এক ও অভিন্ন নীতিমালা ও কৌশলপত্র তৈরি করে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানকল্পে উদ্যোগী হতে হবে নতুন সরকারকে।
২১ জানুয়ারি চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওন্যাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি) আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় নির্বাচনি ইশতেহারে জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যু অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করে দলগুলোর পক্ষে গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে স্পষ্ট বক্তব্য দাবি করা হয়। রোহিঙ্গাদের কারণে যে মানবিক, আর্থিক, সামাজিক বা পরিবেশগত সমস্যা চলছে, সামনের দিনগুলোতে এর সঙ্গে যদি রাজনৈতিক ও সামরিক সমস্যা যুক্ত হয়, তা বাংলাদেশের জন্য বড় বিপদ তৈরি করবে বলেও আশঙ্কা করা হয়। রোহিঙ্গাদের ঘিরে রাজনৈতিক ও সশস্ত্র সমস্যার সৃষ্টি হলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হবে, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও ভয়াবহ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। যদি এ সমস্যা সমাধানে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে না পারি, তাহলে তা ভয়াবহ রূপ নেবে।
তিন স্তরে রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবিলায় কাজ করতে হবে-মানবিক সহায়তা, দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক সংযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা। এখন পরিস্থিতি যা দাঁড়িয়েছে, তাতে শুধু মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা করে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট সব স্টেকহোল্ডারের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমাধানে আসতে হবে। সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা গেলে মিয়ানমারকে চাপ দেওয়া ও বাংলাদেশের পক্ষে শক্তিশালী অবস্থান নেওয়া সহজ ও সম্ভব হবে। ২০২৬ সালের নির্বাচনকে একটি গঠনমূলক মুহূর্ত হিসাবে গণ্য করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাই রাজনৈতিক দলগুলোর কর্তব্য হওয়া উচিত। রাজনৈতিক দলগুলোকে কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী হলে চলবে না, তাদের গণতন্ত্রকে রক্ষাকারীর ভূমিকাও পালন করতে হবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে।
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ‘শূন্য-সমষ্টির রাজনীতি’ বা একজনকে ধ্বংস করে অন্যজনের টিকে থাকার নীতিতে বিশ্বাসী। বর্তমান সন্ধিক্ষণে তাদের ভূমিকা হওয়া উচিত ‘ইতিবাচক-সমষ্টির রাজনীতি’, যেখানে জাতীয় স্বার্থে দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে পারস্পরিক সহনশীলতা বজায় রাখবে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু মনে না করে বৈধ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে গ্রহণ করবে। তাদের প্রাতিষ্ঠানিক সংযম বজায় রেখে দলীয় স্বার্থে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা ক্ষমতাকে চরমভাবে ব্যবহার না করা থেকে বিরত থাকতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা ও শান্তি রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রথাগত দ্বন্দ্বের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি সমাধানের পথে হাঁটতে হবে। দলগুলোর উচিত একটি ‘আদর্শিক ঐকমত্য’ তৈরি করা, যাতে ক্ষমতার পরিবর্তনের কারণে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত না হয়। দলগুলোকে পার্বত্য অঞ্চলের জাতিগত সংখ্যালঘু ও স্থানীয় বাঙালিদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসতে হবে, যাকে রাজনৈতিক তত্ত্বে ‘সুরক্ষিত পরামর্শ’ প্রক্রিয়া বলা হয়।
জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে, বিশেষত নির্বাচনি সংঘাত ও নিরাপত্তার বিপদ এড়াতে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য কিছু কৌশলগত বাধ্যবাধকতা মান্য করা দরকার। তাদের একটি লিখিত আচরণবিধি বা ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ স্বাক্ষর ও প্রচার করতে হবে, যা একটি ‘প্রাক-অঙ্গীকার কৌশল’ হিসাবে কাজ করবে। তাদের সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক সহিংসতা বর্জন করতে হবে। কারণ, সহিংসতা কেবল ‘গণতান্ত্রিক ক্ষয়’ ত্বরান্বিত করে এবং হিংসা, সংঘাত ও নিরাপত্তাহীনতার বিপদ বাড়িয়ে দেয়। তাই নিছক আবেগ বা বিরোধিতার সংঘাতময় পন্থার বদলে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিকল্প নীতি ও প্রস্তাব উপস্থাপনের কৌশলী পথ অবলম্বন করতে হবে দলগুলোকে।
জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তা রক্ষায় রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও তাত্ত্বিক কাঠামো অপরিহার্য, যা দলগুলোর জন্য কেবল নৈতিক নয়, বরং এটি একটি কৌশলগত বাধ্যবাধকতা। তাদের অবশ্যই জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থের সংজ্ঞায় ঐকমত্য পোষণ করতে হবে।
আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলগুলোর সবচেয়ে বড় দায়িত্বশীলতা হবে একটি অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহিংসতা বর্জন করা। রাজনৈতিক সহিংসতার মাধ্যমে রাষ্ট্রের ‘প্রথাগত নিরাপত্তা’র জন্য ঝুঁকি তৈরি না করা। দলীয় কর্মীদের সহিংস আন্দোলনের প্রশিক্ষণ ও উসকানি না দেওয়া এবং উসকানিমূলক বক্তব্য বন্ধ করার ক্ষেত্রে দলগুলোর অবস্থান স্বচ্ছ হতে হবে। ভুয়া খবর বা ‘ইনফরমেশন ম্যানিপুলেশন’ রোধে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব মনিটরিং সেল থাকতে হবে, যাতে সাইবার নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয় ও গুজবের কারণে সংঘাত ছড়িয়ে না পড়ে এবং গণতান্ত্রিক ধারা ব্যাহত না হয়।
জাতীয় স্বার্থ ও নিরাপত্তার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মূল ভিত্তি হতে পারে তিনটি স্তম্ভ : ১. স্বচ্ছতা : দলীয় অর্থায়ন ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখা, যাতে বিদেশি বা কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী জাতীয় নিরাপত্তায় হস্তক্ষেপ করতে না পারে। ২. অন্তর্ভুক্তিকরণ : সংখ্যালঘু, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করা, যাতে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অসন্তোষ সৃষ্টি না হয়। এবং ৩. পারস্পরিক জবাবদিহিতা : সব দলের মধ্যে এমন একটি সম্পর্ক থাকা, যেখানে সমালোচনা হবে হিংসামুক্ত, গঠনমূলক ও দেশপ্রেমের কাঠামোর ভেতরে।
রাজনৈতিক দলগুলো যদি বহুস্বরভিত্তিক গণতন্ত্র চর্চা করে, তবেই বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরীণ সংকট ও বাহ্যিক নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়ে জাতীয় স্বার্থ সুসংহত করতে পারবে।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ, বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
