আবার ফিরছে দ্বিদলীয় রাজনীতি
মহিউদ্দিন আহমদ
প্রকাশ: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
গণতন্ত্র মানে ভিন্নমতের সহাবস্থান ও প্রতিযোগিতা। গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থার কেন্দ্রে আছে নানা মতামতের স্কুল। আমরা এগুলোকে বলি রাজনৈতিক দল। একাধিক রাজনৈতিক দল নিজ নিজ বিশ্বাস, আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে একে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। তারা জনগণের কাছে যায়। জনগণ বেছে নেয় তারা কোনটা গ্রহণ করবে আর কোনটা বর্জন করবে। এখানে নির্ণায়ক হলো জনগণ।
একাধিক দল থাকলে জনগণের সামনে বেছে নেওয়ার একটা সুযোগ থাকে। যেসব দেশ একদলীয় সরকারব্যবস্থায় আছে, সেসব দেশের মানুষ এ সুযোগটি পান না। যারা সেসব দেশ চালান, তারা তাদের এ ব্যবস্থার পক্ষে নানা যুক্তি দেন, ওই ব্যবস্থাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
শুরু থেকেই বাংলাদেশ বহুদলীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। মাঝেমধ্যে এটি সংকটে পড়েছে, হোঁচট খেয়েছে, আবার ওঠে দাঁড়িয়েছে। আমরা একদলীয় সরকারব্যাবস্থা চাই-এ কথাটি প্রকাশ্যে বলার মতো মুখ এখন আর কারও নেই। তবে তলে তলে কিংবা মনে মনে কে কী ভাবছেন, জানি না। রাজনীতির মাঠে বকধার্মিকরা সদা বিরাজমান।
শুরুর দিকে দেশে ছিল আওয়ামী লীগের একচেটিয়া উপস্থিতি। প্রকৃতপক্ষে, বহুদলীয় ব্যবস্থার আবরণে চলছিল একদলীয় অলিগার্ক। তারপর আন্দোলন, অভ্যুত্থান, সেনা হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনেক খানাখন্দ পেরিয়ে আমরা নব্বইয়ের দশকে এসে দেখা পাই দ্বিদলীয় রাজনীতির। মাঠে থাকে দুটো বড় দল-আওয়ামী লীগ আর বিএনপি। জনসমর্থনের পাল্লা কখনো এদিকে হেলে, তো কখনো ওদিকে। এভাবেই চলছিল।
দ্বিদলীয় রাজনীতির ক্লাসিক উদাহরণ দেখি যুক্তরাষ্ট্র আর যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারব্যবস্থা প্রধানত আবর্তিত হয় প্রেসিডেন্টকে কেন্দ্র করে। সেখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় দুটো বড় দলের মধ্যে-ডেমোক্রেটিক পার্টি আর রিপাবলিকান পার্টি। যুক্তরাজ্যে দেখি সংসদীয় সরকারব্যবস্থা, যার কেন্দ্রে আছে আইনসভা। সেখানেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে দ্বিদলীয় রাজনীতি। সেখানে লেবার পার্টি আর কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। তারা পালা করে দেশ পরিচালনা করে।
দুটি দেশেই দ্বিদলীয় ব্যবস্থা টেকসই গণতন্ত্রের ভিত তৈরি করে দিয়েছে। সেসব দেশে ছোটখাটো আরও দল থাকলেও তারা খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। কখনো-সখনো তাদের সমর্থকরা বড় দুটো দলের কোনো একটির পক্ষে চলে যায়। সংসদীয় ব্যবস্থায় অবশ্য ছোট দলগুলো কারও পক্ষে বা বিপক্ষে গিয়ে মাঝেমধ্যে সমীকরণ পালটে দিতে পারে।
আমাদের মতো উপনিবেশ-উত্তর সমাজে নানা ঝামেলা লেগেই আছে। কেউ একবার ক্ষমতা হাতে পেলে সেটি আর ছাড়তে চান না। তারপরও আমরা ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তিনটি সাধারণ নির্বাচনে দ্বিদলীয় রাজনীতির প্রবল প্রকাশ দেখেছি। এরপরই শুরু হয় সংকট। আমরা আবার বহুদলীয় ব্যবস্থার চাদরে ঢাকা একদলীয় শাসনের খপ্পরে পড়ি। জনগণের সামনে পছন্দের দল বেছে নেওয়ার যে অস্ত্রটি ছিল, সেটি কৌশলে কেড়ে নেওয়া হয়। তারপর আবার আন্দোলন, আবার অভ্যুত্থান। এখন আমরা নতুন করে বহুদলীয় ব্যবস্থার প্রতি অঙ্গীকার দেখছি।
একদা প্রবল প্রতাপে বিরাজমান আওয়ামী লীগ দৃশ্যপটে নেই। দল হিসাবে তারা আর নির্বাচন করতে পারবে না। ফলে দ্বিদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থাকা স্বাভাবিক। একটি বড় দল এত বছর ধরে চোখের সামনে নড়াচড়া করেছে, সেটি হঠাৎ উধাও হয়ে গেলে জনগণ বিকল্প খুঁজে পাবে কীভাবে? সেটির আপাত সমাধান হয়ে গেছে বলেই মনে হয়।
বিএনপি আছে আগের মতোই। দলটি রাজনীতির মাঠ দাবড়ে বেড়াচ্ছে। তবে মাঠ আওয়ামীবিহীন হলেও বিএনপি ওয়াকওভার পেয়ে যাবে বলে মনে হয় না। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা নানা সংবাদে দেখছি জামায়াতে ইসলামীর পুনরুত্থান ও জাগরণ। ফলে দ্বিদলীয় রাজনীতির দিকেই যাচ্ছি আমরা।
দেশে আরও অনেক দল আছে। তাদের মোটামুটি তিনটি বর্গে ফেলা যায়। কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে জোট বেঁধেছে। কয়েকটি গেছে জামায়াতে ইসলামীর বলয়ে। কয়েকটি দল কোনো বড় দলের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেনি বা তাদের কেউ নেয়নি। তারা নিজেদের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেছে। তবে তারা রাজনীতিতে বড়সড় ঢেউ তুলতে পারবে বলে মনে হয় না।
ফলে দুটি জোট পরস্পরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়েছে। তবে এগুলো কোনো আদর্শিক জোট নয়। জোটসঙ্গীদের মধ্যে আছে বেশকিছু বিপরীত মেরুর দল। দুদিকেই হয়েছে আসন সমঝোতা। বুঝতে অসুবিধা হয় না, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী-এ দুটো দল নিজেদের প্রভাববলয় বিস্তৃত করতে গিয়ে ছোটখাটো কিছু দলের সঙ্গে সমঝোতায় গেছে।
বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটের শরিকদের কিছু আসন ছেড়ে দিয়েছে। এ ছাড় দেওয়ার প্রক্রিয়াটি মসৃণ ছিল না। অনেকদিন ধরেই দলগুলোর মধ্যে দরকষাকষি হয়েছে। কে কোন জোটে যাবে, সেটি নির্ধারিত হয়েছে আসন সমঝোতার মাধ্যমে। ছোট দলগুলোর নিজস্ব শক্তিতে নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা কম। ভোটযুদ্ধে তারা নির্ভর করছে বড় দলের সমর্থকগোষ্ঠীর ওপর।
প্রতিশ্রুত আসন না পেয়ে কোনো কোনো দল জোট ছেড়ে দিয়েছে। দলের টিকিট না পেয়ে কেউ কেউ দলের কিংবা জোটের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন। তারা কেউ কেউ নির্ভর করছেন ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর। আবার কেউবা ‘ইগো’র তাড়নায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে লড়াইয়ের ময়দানে থেকে গেছেন। এটি তাদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। নির্বাচনে উতরে গেলে দলে ফেরার সম্ভাবনা আছে। অতীতে এমন হয়েছে অনেকবার। হেরে গেলে রাজনীতিতে অপাঙ্ক্তেয় হয়ে পড়ার ঝুঁকি আছে। কারণ, তখন আর দরকষাকষির শক্তিটা থাকবে না।
সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পর দেড় বছর পেরিয়ে গেছে। দুসপ্তাহ পর একটা নির্বাচন হবে। সে নির্বাচনে জনগণ তাদের পছন্দমতো দল বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে। তাদের আস্থাভাজন দলটিকে দেশ পরিচালনার সুযোগ করে দেবে। সাধারণ মানুষ শান্তিতে থাকতে চায়। একটা ভালো নির্বাচন জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে।
মাঠেঘাটে, চায়ের দোকানে, বাসে-ট্রেনে, অফিসপাড়ায় এখন সবচেয়ে বড় আলোচনা হচ্ছে কোন দল বা জোট জিততে যাচ্ছে। আমরা শুধু আন্দাজের ওপর ভর করে বাজি ধরতে পারি। এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার। এর আগে দুটো নির্বাচনে বিএনপি ভালো ফল করেছিল-১৯৯১ আর ২০০১ সালে। ওই দুটো নির্বাচনে বিএনপি আর জামায়াতের মধ্যে আসন সমঝোতা হয়েছিল। জামায়াতও লাভবান হয়েছিল। দ্বিতীয়বার তো তারা ছিল জোটসঙ্গী। তারা উভয়েই যতবার একক শক্তিতে নির্বাচন করেছে, ফল আশানুরূপ হয়নি। এবার তারা একটি আপাত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পরস্পরের বিরুদ্ধে শক্তি পরীক্ষায় নেমেছে। এ পরীক্ষা একদিকে যেমন দলীয় সক্ষমতার, অন্যদিকে তেমনই জনসমর্থনের।
২০০১ সালের পর আমরা আর কোনো ‘স্বাভাবিক’ নির্বাচন দেখিনি। অনেক বছর পর একটা প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে, যেখানে আওয়ামী লীগ নেই এবং বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। গত তিনটি নির্বাচনে ভোটাররা ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। বেশির ভাগ ভোটার তরুণ। প্রথমবার সুযোগ পেয়ে তারা বিপুল সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে হাজির হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ তরুণরাই নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করে দেবে।
ভোটের ফল যা-ই হোক, এটা নিশ্চিত যে দ্বিদলীয় রাজনীতি আবার ফিরে আসছে। সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
