খাদ্যে ভেজাল : কোথায় যাচ্ছি আমরা
মাহবুব কবির
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
একটি রাষ্ট্রের সাফল্য বা ব্যর্থতার খতিয়ান যখন আমরা তৈরি করি, তখন আমাদের সামনে বড় বড় অঙ্ক আর পরিসংখ্যানের চাকচিক্য তুলে ধরা হয়। আমরা খুব গর্বের সঙ্গে বলি, আমাদের গড় আয়ু বেড়েছে; এখন আমরা ৭৩ বা ৭৫ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকি; কিন্তু এ দীর্ঘ জীবনের গুণগত মান নিয়ে যখন আমরা নির্মোহ বিশ্লেষণ করি, তখন এক ভয়াবহ এবং কুৎসিত চিত্র বেরিয়ে আসে। এ দীর্ঘায়ু আসলে এক ধরনের বিভ্রান্তি। আমরা কি সুস্থভাবে বেঁচে আছি, নাকি ডাক্তার, হাসপাতাল, প্যাথলজি সেন্টার আর ওষুধের দোকানের ওপর সওয়ার হয়ে ধুঁকে ধুঁকে টিকে আছি? যে জাতি তার বেঁচে থাকার জন্য প্রতি পদক্ষেপে ওষুধের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাকে আর যাই হোক, একটি সুস্থ বা কল্যাণকর জাতি হিসাবে চিহ্নিত করা যায় না। ২০ কোটি মানুষের এ বিশাল জনপদে আজ সুস্থতার চেয়ে অসুস্থতাই যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের প্রকৃত জনসংখ্যা যদি সঠিকভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গণনা করা হতো, তবে তা হয়তো ২০ কোটি ছাড়িয়ে যেত; কিন্তু আমরা ১৬-১৭ কোটির গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছি। এ বিপুল জনগোষ্ঠীর বিশাল একটি অংশ আজ রোগাক্রান্ত, যার মূলে রয়েছে আমাদের যাপিত জীবন ও খাদ্যাভ্যাস।
পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশের রেকর্ডে আমাদের মতো এমন ভয়াবহ চিত্র খুঁজে পাওয়া যাবে না। যদি সারা বিশ্বের মোট ওষুধের দোকান যোগ করা হয়, তবে বোধহয় বাংলাদেশের ধারেকাছেও আসবে না, এমনকি অর্ধেকও হবে না। এটি কোনো উন্নয়নের লক্ষণ নয়, বরং একটি জাতির চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রমাণ। বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা হচ্ছে ওষুধ উৎপাদন করা, হাসপাতাল চালানো আর প্যাথলজি সেন্টার খোলা। অর্থাৎ, মানুষের অসুস্থতাকে পুঁজি করে এখানে এক বিশাল বাণিজ্য সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে। অথচ উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এক সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখি। দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে বিশ-ত্রিশ তলার বিশাল হাসপাতাল ভবন আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে গেলে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। সেখানে কেবল জরুরি দুর্ঘটনা বা বিশেষ কোনো শারীরিক বিপর্যয়ে মানুষ হাসপাতালে যায়। আর আমাদের দেশে সন্ধ্যার পর যে কোনো ওষুধের দোকানের সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় মানুষের দীর্ঘ সারি। লাইন দিয়ে মানুষ বিষমুক্ত খাবারের বদলে বিষের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হওয়া অসুখের প্রতিকার হিসাবে ওষুধ কিনছে। এটি একটি সুস্থ বা কল্যাণকর রাষ্ট্রের পরিচয় হতে পারে না।
এই যে আমাদের পুরো জাতি আজ প্যাথলজি আর মেডিকেল নির্ভর হয়ে পড়েছে, এর নেপথ্যে রয়েছে আমাদের প্রতিদিনের খাদ্য। একটি কল্যাণকর সরকারের মূল দায়িত্ব হওয়ার কথা ছিল নাগরিকের ঘরে নির্ভেজাল এবং শতভাগ নিরাপদ খাবার পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু রূঢ় বাস্তবতা হলো, আমাদের প্রতিটি খাবারে, প্রতিটি আইটেমে মিশে আছে হরেক রকমের বিষ। আমরা প্রতিদিন যা খাচ্ছি, এর মধ্যে হয় ভারী ধাতু (Heavy Metal) আছে, না হয় কীটনাশক রেসিডিউ (Pesticide Residue) আছে। কৃত্রিম রং, ক্ষতিকর কেমিক্যাল কন্টামিনেশন কিংবা রেডিওঅ্যাক্টিভ এলিমেন্টের মতো ভয়াবহ উপাদান আমাদের অজান্তেই শরীরের ভেতরে প্রবেশ করছে। সকালের নাশতায় যে ডিমটি আমরা খাই, কিংবা দুপুরে যে মাছ-মাংস বা পটোল-সবজি দিয়ে পেট ভরে ভাত খাই, এর প্রতিটি উপাদানেই বিষাক্ত পদার্থের সংমিশ্রণ ঘটছে। আমি মনে করি, যদি প্রতিটি খাবারের ল্যাব টেস্ট করা হয় এবং সেই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়, তবে দেখা যাবে সেখানে রেডিয়াম, থোরিয়াম বা ইউরেনিয়ামের মতো তেজস্ক্রিয় উপাদানের অস্তিত্ব বিদ্যমান। প্রশাসন এটি স্বীকার করতে চাইবে না; কিন্তু বাস্তবতা হলো আমরা প্রতিটি লোক প্রতিবেলা খাবারের সঙ্গে তিল তিল করে বিষপান করছি।
খাদ্যে এ বিষক্রিয়ার প্রভাব আমাদের শরীরে কাজ করে ‘কিউমুলেটিভ’ বা ক্রমপুঞ্জিত পদ্ধতিতে। ধরা যাক, সকালের খাবারে ০.২ ইউনিট বিষ ঢুকল, দুপুরে ০.৪ এবং রাতে আরও কিছুটা। এভাবে সারা দিনে এবং দীর্ঘ কয়েক বছরে আমাদের শরীরে যে পরিমাণ বিষাক্ত উপাদান জমা হয়, তা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে বিকল করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। অনেকে যুক্তি দেন, বিদেশের খাবারেও তো ভারী ধাতু পাওয়া যায়। কিন্তু এ যুক্তির মধ্যে এক বিশাল ফাঁকি রয়েছে। বিদেশের মানুষ যে পরিমাণে ভাত খায়, আর একজন বাঙালি যে পরিমাণ ‘গামলা ভরা’ ভাত খায়, এর মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। আমাদের চালে যদি বিদেশের সমান বা তার চেয়েও কম ভারী ধাতু থাকে, তবুও আমাদের ক্ষতির পরিমাণ হবে শতগুণ বেশি; কারণ, আমাদের গ্রহণের পরিমাণ অনেক বেশি। আমরা সারা জীবন বিপুল পরিমাণে শস্যদানা গ্রহণ করি, ফলে আমাদের শরীরে বিষের মাত্রা খুব দ্রুত বিপৎসীমা ছাড়িয়ে যায়। এ সাধারণ সত্যটুকু আমাদের নীতিনির্ধারক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রায়ই এড়িয়ে যায় অথবা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করে।
এই যে সামগ্রিক এক ম্যাসাকার বা ধ্বংসাত্মক অবস্থা তৈরি হয়েছে, এর পেছনে রয়েছে শক্তিশালী মাফিয়া সিন্ডিকেট এবং কিছু অযোগ্য, অপদার্থ সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশ। যারা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তাদের চরম অবহেলা আর দুর্নীতির কারণেই আজ দেশজুড়ে খাদ্যে বিষের রাজত্ব চলছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে এমন কোনো রেকর্ড নেই, যা দিয়ে তারা দাবি করতে পারে, তারা পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন আনতে পেরেছে। বরং এ অসাধু চক্রগুলো ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে এবং দেশের জনস্বাস্থ্যকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তারা জানে, সাধারণ মানুষ তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নয় এবং প্রতিবাদ করার শক্তিও নেই। ফলে খাবারের নামে বিষ বিক্রি করা এখানে সহজতম ব্যবসায় পরিণত হয়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কোনো জোড়াতালি দেওয়া সংস্কারে কাজ হবে না। আমাদের প্রয়োজন আমূল কাঠামোগত পরিবর্তন। এ দেশে প্রতিটি মানুষের জীবনের মূল্য যদি আমরা বুঝতে না পারি, তবে দীর্ঘায়ুর এ পরিসংখ্যান হবে কেবলই এক মরণফাঁদ। আমাদের খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সরবরাহ চেইন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কঠোর মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে। ল্যাবরেটরি টেস্টের স্বচ্ছতা থাকতে হবে এবং জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে প্রতিটি ল্যাব রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। যারা খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে মুনাফা লুটছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। এছাড়া যারা দায়িত্বে অবহেলা করছেন, সেসব কর্মকর্তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিরাপদ খাদ্য কোনো দয়া বা করুণা নয়, এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
সুস্থ জাতি গঠন করতে হলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হবে কৃষিজমি আর রান্নাঘরের প্রতিটি উপকরণের বিশুদ্ধতার দিকে। কেবল হাসপাতাল আর ওষুধের দোকানের সংখ্যা বাড়িয়ে একটি সমৃদ্ধ জাতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, সুস্থ জীবনের জন্য প্রয়োজন বিষমুক্ত মাটি, বিষমুক্ত পানি আর বিষমুক্ত অন্ন। আমরা যদি এখনই সজাগ না হই এবং এ খাদ্যের মাফিয়া সিন্ডিকেটকে রুখে না দাঁড়াই, তবে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। সুস্থতা কেবল দীর্ঘজীবী হওয়ার মধ্যে নয়, বরং একটি রোগমুক্ত ও প্রাণবন্ত জীবনযাপনের মধ্যে নিহিত। সেই অধিকারটুকু আদায়ের জন্য সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সচেতনতা আর সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই।
মাহবুব কবির : সাবেক সদস্য ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ
