Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

জাতিসংঘের বিকল্প ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জাতিসংঘের বিকল্প ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’

Advertisement

দেড় বছরের বেশি সময় ধরে অব্যাহত ইসরাইলি হামলায় গাজা উপত্যকার ১০ শতাংশ অধিবাসী হতাহত এবং প্রায় সব অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার পর সেই ধ্বংসপুরীকে পুনর্গঠনসহ বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘বোর্ড অব পিসের’ প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে ১৯ ফেব্রুয়ারি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেদিন ইরানের ওপর ১০ দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন, ঠিক সেদিনই তিনি ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত ‘ইউএস ইনস্টিটিউট অব পিসে’ এই বোর্ডের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। উল্লেখ্য, গত বছরের সেপ্টেম্বরে সুইজারল্যান্ডের ডেভোসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বোর্ড অব পিস’ গঠন করা হয়। ৪৯টি দেশের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন, যাদের মধ্যে বোর্ডের আনুষ্ঠানিক সদস্যপদ গ্রহণ করেছে ২৬টি দেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অবশিষ্ট দেশগুলোর প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেছেন পর্যবেক্ষক হিসাবে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উদ্বোধনী ভাষণে ঘোষণা করেন, নবগঠিত এ আন্তর্জাতিক সংস্থায় যুক্তরাষ্ট্র ১০ বিলিয়ন ডলার প্রদান করবে। এছাড়া নয়টি সদস্যরাষ্ট্র ইতোমধ্যে যৌথভাবে ৭ বিলিয়ন ডলার প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে তিনি প্রস্তাব করেছেন, অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে যারা প্রথম বছরের মধ্যে এক বিলিয়ন ডলার ফি প্রদান করবে, তারা বোর্ডের স্থায়ী সদস্য হিসাবে গণ্য হবে। আমন্ত্রিত দেশগুলোর মধ্যে যারা ফি পরিশোধ করবে না, তারা বোর্ডে তিন বছর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারবে।

আহরিত অর্থ গাজা উপত্যকার অধিবাসীদের ত্রাণ ও পুনর্বাসন এবং গাজা পুনর্গঠন ও ‘ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স’ (আইএসএফ) নামে একটি শান্তিরক্ষী বাহিনীর অর্থায়নে ব্যয় করা হবে। ইতোমধ্যে পাঁচটি দেশ আইএসএফের জন্য সৈন্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছে : ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, কাজাখস্তান, কসোভো ও আলবেনিয়া। এ ছাড়া মিশর ও জর্দান গাজার পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণদানের দায়িত্ব পালনে সম্মত হয়েছে। আইএসএফের কমান্ডার হিসাবে নিয়োগ করা হয়েছে আমেরিকান সেনাবাহিনীর মেজর জেনারেল জেসপার জেফার্সকে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে আইএসএফ ২০ হাজার সৈন্যকে কাজে লাগাবে এবং ১২ হাজার পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (বর্তমানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী) খলিলুর রহমান যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তিনি ‘আইএসএফে’ বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহ ব্যক্ত করলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এ বিষয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে একযোগে কাজ করার আগ্রহের কথা বলা হয়। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে ‘বোর্ড অব পিসের’ বৈঠকে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ না জানানো সম্পর্কে ধারণা করা যেতে পারে, ইতোমধ্যে বহু দেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে গঠিত এ বোর্ডের কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে অবমূল্যায়ন করা হতে পারে। এ দ্বিধাগ্রস্ততার কারণে হয়তো অন্তর্বর্তী সরকার শেষ মুহূর্তে ‘বোর্ড অব পিসের’ বৈঠকে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে না পারায় বোর্ডের প্রথম বৈঠকে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। ফ্রান্স, জার্মানি ও গ্রিসের মতো দেশও ‘বোর্ড অব পিসের’ বিস্তৃত ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এ সংস্থার প্রভাব ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একচ্ছত্র আমেরিকান আধিপত্য সম্পর্কে আপত্তি প্রকাশ করেছে।

ইতোমধ্যে যে দেশগুলো ‘বোর্ড অব পিসের’ সদস্যপদ গ্রহণ করেছে, সেগুলো হচ্ছে-আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, বাহরাইন, বুলগেরিয়া, কম্বোডিয়া, মিশর, এল সালভাদর, হাঙ্গেরি, ইন্দোনেশিয়া, ইসরাইল, জর্ডান, কাজাখস্তান, কসোভো, কুয়েত, মঙ্গোলিয়া, মরক্কো, পাকিস্তান, প্যারাগুয়ে, কাতার, সৌদি আরব, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, উজবেকিস্তান ও ভিয়েতনাম। এ ছাড়া পর্যবেক্ষক হিসাবে ওয়াশিংটনের বৈঠকে যোগ দিয়েছেন আরও ২২টি দেশের প্রতিনিধিরা। পর্যবেক্ষক দেশগুলোর মধ্যে ছিল-অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া, সাইপ্রাস, চেক প্রজাতন্ত্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস, ভারত, ইতালি, জাপান, মেক্সিকো, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, ওমান, পোল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, রোমানিয়া, স্লোভাকিয়া, সুইজারল্যান্ড, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য।

‘বোর্ড অব পিসে’ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান এবং এ সংস্থার তহবিলে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক অবদানের পরিমাণ থেকেই এটা স্পষ্ট যে, সংস্থাটি সম্পূর্ণভাবে আমেরিকা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হবে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এ সংস্থার জন্য আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী কংগ্রেস যদি কোনো আর্থিক বরাদ্দ অনুমোদন না করে, তাহলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে কোনো ব্যয় এককভাবে বরাদ্দ করা বা কোনো বরাদ্দ আটকে রাখা সম্ভব নয়। সংবিধান কংগ্রেসকে অর্থ ব্যয়ের ক্ষমতা প্রদান করেছে, অর্থাৎ কংগ্রেস কোনো খাতে তহবিল বরাদ্দ অনুমোদন করলেই তা প্রেসিডেন্ট ব্যয় করতে পারেন। অতএব, ‘বোর্ড অব পিসের’ জন্য আর্থিক বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অবশ্যই কংগ্রেসের কাছে ধরনা দিতে হবে। এর ব্যতিক্রম করার কোনো সুযোগ প্রেসিডেন্টের নেই। এখন পর্যন্ত কংগ্রেস নতুন এ সংস্থার শান্তি প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্বের প্রশ্নে কোনো ভূমিকা রাখেনি।

গাজা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মূল লক্ষ্যের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে হামাসকে নিরস্ত্র ও নির্মূল করা, অর্থাৎ ইসরাইলের দাবি বাস্তবায়ন করা। ইসরাইল বিশ্বাস করে, হামাসকে ধ্বংস করতে পারলেই তাদের পক্ষে গাজা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা হবে না এবং ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে ইসরাইলের জন্য হুমকি চিরতরে দূর হবে। ট্রাম্পের উদ্যোগের প্রাথমিক কাজ গাজাকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও তার সংস্থায় ফিলিস্তিনিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। কিন্তু ইসরাইলকে বোর্ডের সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে। গাজা পরিস্থিতি সামলানোর পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বের অন্যান্য স্থানে চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসনে তার উদ্যোগকে সম্প্রসারণ করার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেছেন। এমনকি গাজায় জাতিসংঘের দুই বিলিয়ন ডলারের ত্রাণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনাও ট্রাম্পের নতুন সংস্থার আওতায় চলে আসতে পারে-এমন আভাসও দিয়েছেন। ট্রাম্প যখন সেপ্টেম্বরে ডেভোসে তার ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের পরিকল্পনা প্রকাশ করেন, তখন জাতিসংঘ গাজা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসাবে নতুন সংস্থার প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করলেও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের খুব কমসংখ্যক এটিকে সমর্থন করেছিল। এখন বোর্ডের শান্তি কর্মসূচির আওতা বিবেচনা করে বিশ্বব্যাপী ট্রাম্পবিরোধীরা ট্রাম্পকে অভিযুক্ত করতে শুরু করেছেন যে, নবগঠিত সংস্থার মাধ্যমে তিনি নিজেকে জাতিসংঘের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন; যার ফলে বৈশ্বিক কূটনীতি ও দ্বন্দ্ব নিরসনের একমাত্র ভরসাস্থল জাতিসংঘের একক ভূমিকা পালনের সুযোগ থাকবে না। যদিও ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা জাতিসংঘকে আরও শক্তিশালী করতে যাচ্ছি,’ কিন্তু তার অভিপ্রায় এর সম্পূর্ণ বিপরীত বলে সংশয় ব্যক্ত করছেন সমালোচকরা।

শুধু তাই নয়, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ মিত্র দেশ অথবা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘বোর্ড অব পিসে’ অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বোর্ডের স্থায়ী সদস্যপদের জন্য বিপুল অঙ্কের ফি নিয়ে কানাডা আপত্তি উত্থাপন করায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কানাডাকে বোর্ডের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও কানাডা সংশয় ব্যক্ত করেছে, ‘বোর্ড অব পিসের’ পক্ষে হামাসকে আদৌ নিরস্ত্র করা সম্ভব হবে কিনা। অতীতে গাজাবাসীর ওপর বারবার ইসরাইলি হামলা ও ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা পরিচালনা এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি নস্যাৎ করার চেষ্টার দৃষ্টান্ত থেকে হামাস নিশ্চিত যে, বোর্ডের পরিকল্পনা অনুযায়ী তাদের নিরস্ত্র করা হলে ইসরাইল তাদের ওপর প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ করতে পিছপা হবে না এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন কোনোদিন বাস্তবায়িত হবে না।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক ও অনুবাদক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম