Logo
Logo
×

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

রাজনীতিতেও রহমত নাজিল হোক

Advertisement

Icon

এম এ হামিদ

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতিতেও রহমত নাজিল হোক

Advertisement

রমজান মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, আত্মশুদ্ধি ও সংযমের মাস। এ মাসে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন যেমন পরিবর্তনের আহ্বান পায়, তেমনি রাষ্ট্র ও সমাজের ক্ষেত্রেও নৈতিকতার নতুন মানদণ্ড স্থাপনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। রমজান মাসে বাজারদর বৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের সংকট বা কৃত্রিম মজুতদারি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে ধর্মীয় আবহ যতই পবিত্র হোক, সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘব হয় না। তাই সরকার যদি এ মাসেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়, নিুআয়ের মানুষের জন্য বিশেষ সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করে এবং বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান অভিযান চালায়, তাহলেই জনগণ সেটিকে বাস্তব রহমত হিসাবে অনুভব করবে। নচেৎ ‘রহমত’ শুধু রাজনৈতিক ভাষণের অলংকার হয়ে থাকবে।

প্রত্যাশার রাজনীতি বনাম প্রশাসনিক বাস্তবতা : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিশোধের সংস্কৃতি একটি বড় বাস্তবতা। ক্ষমতার পালাবদল মানেই প্রশাসনিক রদবদল, মামলা ও দমননীতি, এমন ধারণা বহুবার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নতুন সরকার যদি এ চক্র ভেঙে রাজনৈতিক সহনশীলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে, বিরোধী দলের প্রতি সংলাপ ও সহাবস্থানের মনোভাব দেখায়, তাহলে সেটি হবে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক বার্তা। কারণ রহমতের সরকার কখনো প্রতিহিংসার সরকার হতে পারে না। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি শক্তিশালী বিরোধী দলও অপরিহার্য। সংসদকে কার্যকর করা, বিরোধী মতকে সম্মান করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, এসবই রাজনৈতিক সংস্কৃতির মানদণ্ড। যদি নতুন নেতৃত্ব এসব ক্ষেত্রে উদারতা দেখায়, তাহলে সেটিই হবে একটি বড় রাজনৈতিক সংস্কার।

অর্থনীতির কঠিন সমীকরণ : অর্থনৈতিক বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে মুদ্রাস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপ, কর্মসংস্থানের সংকট, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করাই হবে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। জনগণ রাজনৈতিক বক্তৃতার চেয়ে বাজারের দামের স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। নতুন সরকারকে তাই স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি, দুধরনের পরিকল্পনা নিতে হবে। স্বল্পমেয়াদে বাজার তদারকি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং কৃষি ও আমদানি ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা জরুরি। দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজন শিল্পায়নের গতি বাড়ানো, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি। প্রবাসী আয়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণও অপরিহার্য।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ও পরীক্ষা : তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় প্রবাসে অবস্থান, নানা রাজনৈতিক বিতর্ক, আইনি জটিলতা এবং দলীয় শৃঙ্খলা, সবকিছুর মধ্য দিয়ে তাকে পথ চলতে হয়েছে। সমর্থকদের মতে, এ প্রতিকূলতার মধ্যেই তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন এবং তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন করেছেন। সমালোচকদের মতে, তার অতীতই তার সবচেয়ে বড় বোঝা। এ দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই তার নেতৃত্বের মূল্যায়ন করতে হবে। আর এখন প্রধানমন্ত্রীর জন্য এটি শুধু রাজনৈতিক সাফল্যের মুহূর্ত নয়; এটি তার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের বিতর্ক ও সমালোচনার পর রাষ্ট্রনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় তাকে দলীয় রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে। সমর্থকরা তাকে পরিবর্তনের প্রতীক হিসাবে দেখেন; সমালোচকরা তার অতীত নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এ দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যে তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি শুধু দলীয় নেতা নন, রাষ্ট্রনায়ক।

জনগণের মনে আশার সঞ্চার তৈরি হয়েছে-দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে। এখন প্রশাসনে পেশাদারত্ব নিশ্চিত করা এবং দলীয় প্রভাব কমিয়ে নীতিনির্ধারণ করা, এই সব ক্ষেত্রেই তার নেতৃত্বের মান নির্ধারিত হবে। রাষ্ট্র পরিচালনা আবেগ নয়, কৌশল ও প্রজ্ঞার বিষয়। রাজনৈতিক বক্তৃতা দিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করা যায়, কিন্তু অর্থনীতি ও প্রশাসন চালাতে প্রয়োজন দক্ষতা ও সংযম।

কূটনীতি ও ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য : বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত সংবেদনশীল। আঞ্চলিক শক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা যে কোনো সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। পররাষ্ট্রনীতিতে আবেগতাড়িত অবস্থান নয়; প্রয়োজন বাস্তববাদী কৌশল। বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একজন রাষ্ট্রনায়কের পরিচয় এখানেই-তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের স্বার্থ কতটা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করতে পারেন এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক সহযোগিতা কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারেন।

দল যদি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চা না করে, তাহলে গণতন্ত্রও শক্তিশালী হয় না। প্রার্থী মনোনয়ন, কমিটি গঠন ও নেতৃত্ব নির্বাচন-সব ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকতে হবে। এককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত বা তদবিরনির্ভর পদায়ন দীর্ঘমেয়াদে ক্ষোভ তৈরি করে। সাংগঠনিক কাঠামো এমন হতে হবে, যেখানে মতবিরোধ প্রকাশের সুযোগ থাকবে কিন্তু শৃঙ্খলা বজায় থাকবে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি দল থেকেই শুরু হতে হবে।

প্রতিটি সংসদীয় আসনে যারা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে দলকে সমস্যায় ফেলেছে, তাদের বিষয়ে আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত নয়-কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। সরাসরি বহিষ্কার বা স্থায়ী দূরত্ব তৈরির পরিবর্তে তাদের কঠিন ও দায়িত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজে যুক্ত করা যেতে পারে, যাতে তারা নিজেদের যোগ্য প্রমাণের সুযোগ পায়। তবে যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে দলবিরোধী অবস্থান নেয়, সেক্ষেত্রে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। কারণ ভোটের রাজনীতিতে প্রতিটি সমর্থন, প্রতিটি অঙ্ক হিসাব করে মেলাতে হয়।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি কেমন হবে। লাফাঙ্গা, বিশৃঙ্খল বা ক্ষমতানির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষিত, মার্জিত ও আদর্শনিষ্ঠ কর্মী তৈরির ওপর জোর দিতে হবে। রাজনৈতিক কর্মী মানে শুধু স্লোগানদাতা নয়; তিনি দলের ভাবমূর্তি বহনকারী প্রতিনিধি। বর্তমান প্রজন্ম শিক্ষিত ও সচেতন; তারা শালীন, যুক্তিনির্ভর ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতি দেখতে চায়। তাই রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ, নৈতিক চর্চা ও জনসেবামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে সংগঠনকে আধুনিক ও গ্রহণযোগ্য রূপ দিতে হবে।

জনগণের চূড়ান্ত রায় : সবশেষে বলা যায়, কোনো সরকারকে ‘রহমতের সরকার’ বলা যায় তখনই, যখন তার সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড সাধারণ মানুষের জীবনে স্বস্তি এনে দেয়। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতি দমন, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা-এ চারটি স্তম্ভের ওপরই সেই রহমতের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে। রমজানের পবিত্রতা একটি সুযোগ-নৈতিক ও প্রশাসনিক পুনর্গঠনের। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করে নেতৃত্বের সদিচ্ছা ও দক্ষতার ওপর।

বাংলাদেশের জনগণ এখন দেখবে এ নতুন অধ্যায় তাদের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনে। যদি পরিবর্তন ইতিবাচক হয়, তাহলে রমজানের এ সময়টি সত্যিই ইতিহাসে রহমতের সময় হিসাবে চিহ্নিত হবে। আর যদি না হয়, তাহলে ধর্মীয় আবেগ ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিতে পরিণত হবে। রাষ্ট্রের রাজনীতিতে রহমত শুধু উচ্চারণের বিষয় নয়; এটি কার্যকর দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়।

নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি যত বড়, পরীক্ষার মানদণ্ড তত কঠোর। সময়ই বলে দেবে-প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন আস্থা ও স্থিতির অধ্যায় রচনা করবে, নাকি আরেকটি অপূর্ণ প্রত্যাশার গল্প হয়ে থাকবে।

এম এ হামিদ : সাধারণ সম্পাদক, সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার (সিবিটি)

[email protected]

Advertisement

Advertisement

আরও পড়ুন

দৃষ্টিপাত এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

এ পদক্ষেপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে

সাইবার নিরাপত্তায় যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

সাইবার নিরাপত্তায় যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে এআই

প্রান্তিক মানুষের স্বার্থহানি অনাকাঙ্ক্ষিত হবে

প্রান্তিক মানুষের স্বার্থহানি অনাকাঙ্ক্ষিত হবে

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

জাতিসংঘের করিডর যেন এক নাট্যশালা

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম