সাক্ষাৎকার
যুদ্ধের স্থায়িত্ব নির্ভর করছে ইরানিদের প্রতিক্রিয়ার ওপর: ড. ইমতিয়াজ আহমেদ
খালিদ বিন আনিস
প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ছাপিয়ে ইরান ও ইসরাইল এখন সরাসরি সম্মুখসমরে। অতি সম্প্রতি ইরানের মাটিতে ইসরাইলি হামলা এবং তার প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পালটা আক্রমণ বিশ্বজুড়ে এক চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এ সংকট কি কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ, নাকি এটি বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাভাস? বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শ্রমবাজারে এর প্রভাব কতটুকু? এসব সমসাময়িক ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে বিস্তারিত কথা বলেছেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খালিদ বিন আনিস।
যুগান্তর : ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের ‘ছায়াযুদ্ধ’ সম্প্রতি প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিয়েছে। এমনকি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে এ অভাবনীয় সামরিক উত্তেজনাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এ সংঘাত কি নতুন কোনো বিশ্বযুদ্ধের ইঙ্গিত দিচ্ছে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। তবে আপাতদৃষ্টিতে এটি সরাসরি একটি ‘বিশ্বযুদ্ধের’ দিকে যাবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ, বিশ্বযুদ্ধ করার যে কাঠামো, বিশেষ করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে যা আমরা দেখেছি-সেই বৈশ্বিক কাঠামো এখন আর নেই। এর মধ্যে মৌলিক পরিবর্তন হয়ে গেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন হয়েছিল, তখন বিশ্ব বড় আকারে একটি ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার মধ্যে ছিল। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের পক্ষে যারা লড়াই করেছিল, তাদের বড় অংশই ছিল এশিয়া ও আফ্রিকার মানুষ। এমনকি আমাদের এ বাংলা অঞ্চল থেকেও বিপুলসংখ্যক সৈন্য সেখানে প্রাণ হারিয়েছেন। বর্তমান বিশ্বে সেই ঔপনিবেশিক সৈন্য কাঠামো নেই। এ ছাড়া আধুনিক বিশ্বে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার যে প্রস্তুতি বা অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা অনেক দেশেরই সীমিত।
তবে এর অর্থ এই নয়, যুদ্ধটি কালকেই থেমে যাবে। আমার মনে হয়, এ যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি অনেকটা নির্ভর করবে ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির ওপর। প্রশ্ন হচ্ছে-ইরানের সাধারণ জনগণ এ মুহূর্তে কোন দিকে যাবে? তারা কি আমেরিকার এ সরাসরি হস্তক্ষেপকে সমর্থন করবে? অতীতে আমরা দেখেছি, ইসরাইল যখন বড় ভূমিকা রেখেছিল, তখন আমেরিকা কেবল পেছন থেকে সাপোর্ট দিয়েছিল; কিন্তু এবার আমেরিকা নিজেই ফ্রন্টলাইনে থেকে আক্রমণ শুরু করেছে। আমেরিকার এ কৌশলের পেছনে মূল লক্ষ্য হতে পারে ইরানের সাধারণ জনগণকে নিজেদের পক্ষে টানা। কারণ তারা বুঝতে পেরেছে, ইসরাইলের মাধ্যমে ইরানিদের মন জয় করা অসম্ভব। এখন দেখার বিষয়, ইরানের ভেতরে যে অসন্তোষের কথা শোনা যায়, তা এ যুদ্ধের সময় কোন দিকে মোড় নেয়। ইরানের জনগণ যদি ইসলামিক রিপাবলিকের পরিবর্তে পরিবর্তনের আশা করে আমেরিকার এ আক্রমণকে সমর্থন দেয়, তবে যুদ্ধের চিত্র বদলে যেতে পারে। এটি কয়েক সপ্তাহ থাকবে, নাকি দীর্ঘায়িত হবে, তা ইরানের জনগণের প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে।
যুগান্তর : ইরান-ইসরাইল উত্তেজনার পারদে বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন) ভূমিকা আপনি কীভাবে দেখছেন? তারা কি সংঘাত প্রশমিত করতে চাইবে, নাকি নিজেদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগাবে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : পরাশক্তিগুলো এখানে মূলত দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করবে। প্রথমত, রাশিয়া এবং চীন ইরানকে লজিস্টিকস, ম্যাটেরিয়ালস এবং উন্নত প্রযুক্তি দিয়ে সহায়তা করবে। এর মাধ্যমে তারা আমেরিকাকে একটি বার্তা দিতে চাইবে যে, ইরানের রেভ্যুলেশনারি গার্ডস যদি জনগণের সমর্থন পায়, তবে এ যুদ্ধ জেতা আমেরিকার জন্য সহজ হবে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে আমেরিকার বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হবে। রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা ইতোমধ্যেই ইরান পাচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, পর্দার আড়ালে তারা ডিপ্লোমেসি বা কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাবে। কোনো একটি নেগোসিয়েশন বা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধটি দ্রুত থামানো যায় কিনা, সেই চেষ্টাও তারা করবে। আমার মনে হয় না রাশিয়া বা চীন সরাসরি এ যুদ্ধে সশরীরে জড়িয়ে পড়বে। তারাও আসলে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং দেখছে ইরানের অভ্যন্তরে কী ধরনের পরিবর্তন আসে। অর্থাৎ পরাশক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থরক্ষা করেই এখানে তাদের ঘুঁটি চালবে।
যুগান্তর : এ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ব অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজার ও বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার (সাপ্লাই চেইন) ওপর কেমন প্রভাব ফেলতে পারে? আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে পড়বে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : এর প্রভাব পুরোটাই নির্ভর করবে যুদ্ধের স্থায়িত্বের ওপর। অধিকাংশ দেশ সাধারণত তিন থেকে ছয় মাসের জ্বালানি তেলের রিজার্ভ বা প্রস্তুতি নিয়ে রাখে। যদি সংঘাত দুই সপ্তাহের মধ্যে থিতু হয়ে যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় কোনো ধাক্কা লাগবে না। কিন্তু যুদ্ধ যদি তিন মাস বা ছয় মাস ছাড়িয়ে যায়, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে পারে। তেলের দাম আকাশচুম্বী হবে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।
ইতোমধ্যেই আমরা দেখছি মধ্যপ্রাচ্যের অনেক আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়ে গেছে। আকাশপথ বা নৌপথ যদি দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ থাকে, তবে তার প্রভাব পণ্যমূল্যের ওপর পড়বেই। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ মূল্যস্ফীতি সহ্য করা কঠিন হবে। আমাদের এখন থেকেই নজর রাখা দরকার, এটি কি মাসের পর মাস চলার মতো কোনো পথে যাচ্ছে কিনা। যদি তাই হয়, তবে বিশ্বব্যাপী একটি বড় অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুগান্তর : মধ্যপ্রাচ্যে একটি সর্বাত্মক আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবিলম্বে কী কী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত বলে আপনি মনে করেন?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : স্পষ্ট করে বললে, আমি মনে করি না যে, বর্তমানে জাতিসংঘ এখানে কার্যকর কিছু করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি জাতিসংঘের মহাসচিবের কোনো বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরও আমরা শুনতে পাচ্ছি না। এ সংকটে জাতিসংঘ কার্যত অকার্যকর। এখানে বড় ভূমিকা রাখতে পারে আঞ্চলিক শক্তিগুলো; যেমন- সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত।
কাতার ও আরব আমিরাত ইতোমধ্যেই এ সংঘাতের আঁচ পেয়েছে, কারণ সেখানে আমেরিকার সামরিক সম্পদ বা অ্যাসেট রয়েছে। অথচ ইরানের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা নেই। কাতার এর আগে অনেক জটিল নেগোসিয়েশনে বড় সাফল্য দেখিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, আক্রান্ত দেশগুলো এবং এ আঞ্চলিক শক্তিগুলো সম্মিলিতভাবে কোনো চাপ তৈরি করতে পারে কিনা। তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো দেশগুলো যদি শক্ত অবস্থান নেয় এবং কূটনৈতিকভাবে মধ্যস্থতা করে, তবেই সংঘাত প্রশমন সম্ভব। জাতিসংঘের ওপর ভরসা করে বসে থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাবে।
যুগান্তর : বিশ্বায়নের এ যুগে বৈশ্বিক সংকটের আঁচ বাংলাদেশের অর্থনীতি (যেমন-রেমিট্যান্স, আমদানি ব্যয়) ও কূটনীতিতে কতটা লাগতে পারে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : বাংলাদেশের জন্য এটি একটি বড় চিন্তার বিষয়। আমাদের এখন থেকেই হোমওয়ার্ক শুরু করা উচিত। সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি কথা মাথায় রেখে আমাদের পরিকল্পনা করা দরকার। যদি যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করে, তবে আমাদের সাপ্লাই চেইন নিশ্চিতভাবেই ব্যাহত হবে। আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার ওই অঞ্চলে। যুদ্ধের দামামা বাজলে সেখানে কর্মরত আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জানমালের নিরাপত্তা বড় সংকটে পড়বে।
যদি অনেক মানুষ কাজ হারিয়ে একযোগে দেশে ফিরে আসতে চায়, সেই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার প্রস্তুতি আমাদের আছে কিনা, তা ভাবতে হবে। একইভাবে আমাদের আমদানিকৃত পণ্যের বিকল্প উৎস খুঁজে বের করতে হবে। যেখানে ঘাটতি হতে পারে, সেগুলো অন্য কোনো দেশ থেকে আনা যায় কিনা, তার আগাম পরিকল্পনা করতে হবে। যদি আমরা আগে থেকে হোমওয়ার্ক করে রাখি, তবে বড় কোনো আঘাত এলেও আমরা তা সামলে নিতে পারব। কিন্তু পরিস্থিতি যদি নয় মাস বা তার বেশি সময় চলে, তবে ইমপ্যাক্ট মোকাবিলা করা আমাদের জন্য কঠিন হবে।
যুগান্তর : ইসরাইল-ইরান যুদ্ধের সঙ্গে কি আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের বর্তমান উত্তেজনার কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক আছে?
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : অনেক বিশ্লেষকই মনে করছেন, এর পেছনে একটি পরোক্ষ সম্পর্ক থাকলেও থাকতে পারে। গুঞ্জন আছে, পাকিস্তান যাতে কোনোভাবেই ইরানের পক্ষে সমর্থন দিতে না পারে, সেজন্য আমেরিকার ইঙ্গিতেই আফগানিস্তান সীমান্তে উত্তেজনা জিইয়ে রাখা হচ্ছে। এতে পাকিস্তান সরকার তার জনগণকে বলতে পারবে যে, তারা আফগান সীমান্তে লড়াই নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ইরানের বিষয়ে কোনো জোরালো ভূমিকা নিতে পারছে না।
অবশ্য পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ‘ডুরান্ড লাইন’সংক্রান্ত বিবাদটি অনেক পুরোনো। আফগানরা এ সীমানা কখনোই মেনে নেয়নি। তবে বর্তমান সময়ে এ পুরোনো বিবাদটি নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার টাইমিং নিয়ে সন্দেহ আছে। পাকিস্তানে একটি বিশাল শিয়া জনগোষ্ঠী আছে, যারা স্বভাবতই ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল। পাকিস্তান সরকারকে সেই অভ্যন্তরীণ চাপও সামলাতে হচ্ছে। এ উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে কোনো তৃতীয় পক্ষ ফায়দা লুটছে কিনা, তার নিশ্চিত প্রমাণ দরকার। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন নয়, তাই এ দুই সংঘাতের মধ্যে পরোক্ষ সম্পর্ক থাকার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যুগান্তর : আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদ : আপনাকেও ধন্যবাদ।
