ডিজিটাল আসক্তি : সমাধানের পথ পরিবারেই
ড. মোহম্মদ আবদুল বারী
প্রকাশ: ০৯ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অপ্রাপ্তবয়স্কদের (১৬ বছরের কম বয়সি শিশু) জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে অস্ট্রেলিয়ার কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটি সিদ্ধান্ত ডিজিটাল যুগে শিশু প্রতিপালনের পদ্ধতি নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্ককে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ব্রিটেন ও অন্যান্য রাষ্ট্রেও এ জাতীয় পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিশেষজ্ঞ মহলে নানামুখী বিশ্লেষণ লক্ষ করা যাচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের পুরো বিতর্কটাই এখন আটকে আছে শুধু কড়াকড়ি, বিপদ আর আইনের বেড়াজালে; এর গভীরে যাওয়ার কোনো চেষ্টা দেখা যাচ্ছে না। আইনি কড়াকড়ির ওপর জোর দেওয়াটা হয়তো যৌক্তিক; কিন্তু শুধু এটুকুই শেষ কথা হতে পারে না।
বিগত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক বিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকত্বসংক্রান্ত গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, সন্তান লালন-পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজটিকে সরকার, যান্ত্রিক অ্যালগরিদম কিংবা কেবল বয়স নির্ধারণী আইনের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। কারণ ডিজিটাল জগতের প্রভাব কোনো একক সমস্যা নয়। আর নিষেধাজ্ঞা? তা কখনোই একমাত্র সমাধান হতে পারে না, সেটি যত ভালো উদ্দেশ্যেই হোক না কেন।
ঘরই হোক ডিজিটাল নাগরিকত্ব শেখার প্রথম স্কুল
একটা চরম সত্য আমরা ভুলে যাই-ডিজিটাল অভ্যাসের হাতেখড়ি হয় নিজেদের ঘরে। এর জন্য প্রয়োজন মা-বাবার সক্রিয় অংশগ্রহণ, আর সন্তানদের আবেগীয় সান্নিধ্য। নিজেদের আচরণের ব্যাপারে নির্মোহ বিশ্লেষণ না করে কেবল শিশুদের ‘ডিজিটাল আসক্তি’ নিয়ে কথা বলাটা হবে একপাক্ষিক। আমরা নিজেরাই তো সারাক্ষণ ফোন বা ট্যাবে মুখ গুঁজে পড়ে থাকি, এমনকি বাচ্চাদের সামনেও। আমরা তাদের ওপর কতটা কড়া নজর রাখছি, তার চেয়ে আমরা নিজেরা তাদের সামনে কী উদাহরণ তৈরি করছি-সেটাই তাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে। ঘর হলো এমন একটি জায়গা, যেখানে মূল্যবোধ চর্চা করা হয়, মনোযোগ দেওয়ার অভ্যাস করা হয় এবং কঠিন বিষয়ে আলোচনা করা হয়। আমরা যদি অর্থবহ এবং টেকসই সমাধান চাই, তবে পরিবারকেই আবার কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে হবে। যেমন- আহার, ভ্রমণ, ক্রীড়া কিংবা পারস্পরিক আলাপচারিতার সময়ে পরিকল্পিতভাবে সব ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস বর্জন করা। বাচ্চারা ইন্টারনেটে কী দেখছে, তা নিয়ে মা-বাবাকে তাদের সঙ্গে বসতে হবে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে কোনো ব্যাখ্যা ছাড়া নিয়ম চাপিয়ে না দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবহারের নিয়ম ঠিক করা। সন্তানদের শেখানোর আগে নিজেদের কাজে প্রমাণ করতে হবে যে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জীবনের একটা ছোট অংশ মাত্র-পুরো জীবনটা এর ভেতরে আটকে নেই।
স্নেহশীল ও মনোযোগী অভিভাবক বা অভিভাবকদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি ঘরই হলো শিশুর জীবনের প্রথম নৈতিক এবং নাগরিক শিক্ষালয়। শিশুর নৈতিক কম্পাস, মানসিক দৃঢ়তা এবং একাত্মবোধ তৈরির ক্ষেত্রে এটি এখনো সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক।
গবেষণা বলছে, মানসিক উদ্বেগ, নিম্ন আত্মমর্যাদাবোধ এবং নেতিবাচক অনলাইন কার্যক্রমের মূলে প্রায়ই বাস্তব জীবনের নানাবিধ প্রতিকূলতা কাজ করে; যার মধ্যে দারিদ্র্য, পড়াশোনার চাপ, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কিংবা অস্থিতিশীল পারিবারিক পরিবেশ অন্যতম। পারিবারিক অনুশাসন, সুসংগঠিত কাঠামো এবং অভিভাবকীয় সংবেদনশীলতার অভাব দেখা দিলে ডিজিটাল মাধ্যমগুলো সেই শূন্যতা দখল করে নেয়। তাই পরিবার ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় না করে কেবল আইনি কড়াকড়ি আরোপ করলে সমস্যার মূল উপশম হওয়ার বদলে তা ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ এবং আত্মপরিচয়ের বোধের সামনে সত্যিকার অর্থেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে; কিন্তু কোনো জাতিই কেবল একটি আইন দিয়ে এ চ্যালেঞ্জ জয় করতে পারবে না, আর কোনো ডিজিটাল ফিল্টারই মানুষের উপস্থিতির বিকল্প হতে পারবে না। আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত অর্থবহ জীবন গঠন করা; সহানুভূতিশীল গৃহস্থালি, মননশীল জনগোষ্ঠী এবং এমন একটি ডিজিটাল পরিমণ্ডল বিনির্মাণ করা, যেখানে ব্যবসায়িক লভ্যাংশের চেয়ে মানবিক আদর্শ বেশি গুরুত্ব পাবে। এটি কেবল শিশুদের সুরক্ষার বিষয় নয়; বরং অভূতপূর্ব প্রযুক্তিগত বিপ্লবের এ যুগে উন্নততর মানুষ ও সুনাগরিক গড়ে তোলার একটি মহৎ প্রচেষ্টা। সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক সীমারেখা নির্বিশেষে প্রতিটি অভিভাবকের অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা হলো, তাদের সন্তানদের এমনভাবে গড়ে তোলা, যারা হবে বাস্তববাদী, মমতাময় এবং সমাজের জন্য অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম। এ লক্ষ্য অর্জনে দায়বদ্ধতার এক সামষ্টিক পুনর্গঠন প্রয়োজন। এটি কেবল বিধিনিষেধের ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এর ভিত্তি হতে হবে সক্রিয় অভিভাবকত্ব, নৈতিক মূল্যবোধের প্রতিফলন এবং এমন এক পারিবারিক পরিবেশ, যেখানে ডিজিটাল মাধ্যমের তুলনায় মানবিক সংযোগ অগ্রাধিকার পাবে।
ড. মোহম্মদ আবদুল বারী : ব্রিটিশ বাংলাদেশি শিক্ষাবিদ, গ্রন্থকার, সিভিক অ্যাডভোকেট ও প্যারেনটিং কনসালটেন্ট
