ইরানের পরবর্তী রণকৌশল কী
ড. বদরুল আলম খান
প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
দশ দিন ধরে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ চলছে। দুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ইতোমধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। যুদ্ধের এ পর্যায়ে আমরা প্রশ্ন করতে পারি, উভয়পক্ষের যুদ্ধ কৌশল কী। সেটি অর্জনে কে কতটুকু এগিয়ে আছে।
আমেরিকা-ইসরাইলের কৌশল মোটামুটি স্বচ্ছ, যদিও প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প নানা সময়ে নানা কথা বলছেন এবং নতুন নতুন দাবি তুলছেন। ফলে এক ধরনের অস্বচ্ছতা যে সেখানে নেই, তা নয়। তবে এটা ঠিক, আমেরিকা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় না। সে মনে করে না দীর্ঘ যুদ্ধে সে জয়ী হতে পারবে। ইরানে সৈন্য পাঠিয়ে রেজিম চেঞ্জ করার চেষ্টা সফল হয়নি। বস্তুত সেটি যে সফল হবে না, সে ধরনের সতর্কবাণী মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে যুদ্ধ শুরুর এক সপ্তাহ আগে জানানো হয়েছিল। কিন্তু তা উপেক্ষা করে আমেরিকা ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ শুরু করে। মাঝেমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প এও বলছেন, যুদ্ধ চলবে অনেক দিন ধরে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ আছে। তেলের দামে ঊর্ধ্বগতি। প্রতি ব্যারেল অশোধিত তেলের দাম ১২০ ডলারের উপরে। এর নেতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে লক্ষণীয়।
ইরানের বিভিন্ন শহরে হামলা থেমে যায়নি, বরং তীব্র হয়েছে। তেহরানের নিকটবর্তী একটি তেল ডিপোতে ইসরাইল বোমা হামলা চালিয়েছে। বোমাবর্ষণ করা হচ্ছে বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে, তার অবকাঠামোতে। প্রত্যুত্তরে ইরান ইসরাইলের হাইফা বন্দরের তেল ডিপোতে আঘাত হেনেছে। অর্থাৎ আক্রমণ এখন জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে। ফলে যুদ্ধ যতই তীব্র আকার ধারণ করবে, বিশ্ব অর্থনীতি ততই এগিয়ে যাবে মন্দার দিকে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে কৌশল হিসাবে তিনটি আক্রমণ সম্ভাবনার কথা ভাবা হচ্ছে। এর একটি হলো, বিশেষ বাহিনী পাঠিয়ে গুপ্তস্থানে লুকিয়ে রাখা ইরানের ৪৭০ কেজি উচ্চমানের ইউরেনিয়াম উদ্ধার করা। দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালির অদূরে কারগ দ্বীপে কমান্ডো হামলা চালানো। ইরান তার ৯০ শতাংশ তেল ওই দ্বীপ থেকে রপ্তানি করে। সেটি দখলে এনে ইরানের পেট্রোলিয়াম শিল্পকে নিয়ন্ত্রণ করা আমেরিকার উদ্দেশ্য। তৃতীয়ত, হরমুজ প্রণালি চালু রাখার পথ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে চায়। লক্ষণীয়, আমেরিকার উদ্দেশ্য পৃথিবীর বাণিজ্য পথে থাকা ‘চেক পয়েন্টগুলো’ দখলে নেওয়া। আমেরিকা পানামা খাল ইতোমধ্যে তার নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বাকি আছে হরমুজ প্রণালি, সুয়েজ খাল এবং মালাক্কা প্রণালি। যা হোক, আগে উল্লিখিত তিনটি অভিযান পরিকল্পনা যদি সফল হয়, তাহলে আমেরিকা যুদ্ধ শেষ করার কথা ভাবতে পারে। অর্থাৎ এ পর্যায়ে সবকিছু আপেক্ষিক। আমেরিকার নীতিনির্ধারকরা কোনো কিছু চূড়ান্ত করেনি। সবই হাওয়ায় ভাসমান।
তবে একথা বলতে পারি, এ সবই কুসুম কল্পনা। এর কোনোটাই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। যদি থাকেও, তাহলে তার পরিণতি কী হবে, আমেরিকা জানে না। এ যুদ্ধ শুরুর আগে যুদ্ধের গতি কোনদিকে যাবে, সে ব্যাপারে আমেরিকা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করেনি বলে ধারণা করি। ফলে এ মুহূর্তে আমেরিকা যে বিপদে পড়েছে, সেটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ট্রাম্প বাধ্য হয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সোমবার ফোন করেছেন। আলোচনার ফলাফল কী, সেটি এখনো অজানা। তবে রাশিয়া তাকে যে প্রস্তাবটি দিতে পারে, সেটি হচ্ছে, জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্য দেশের নেতাদের নিয়ে একটি শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজন করা। ইসরাইল ইরানের তেল স্থাপনার ওপর সাম্প্রতিক যে হামলা চালায়, তাতে আমেরিকা খুশি হয়নি। ইসরাইলকে সমালোচনা করে আমেরিকা জানিয়েছে, এতে করে জ্বালানি সংকট বাড়ছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থ বাজারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। এ বার্তা ইসরাইলকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমেরিকা স্টিভ উইটকফ এবং জারেড কুশনারকে ইসরাইলে পাঠানোর কথা ভেবেছিল। কিন্তু সেখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় সেটি বাতিল করতে হয়েছে। তবে এটি বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে, ইসরাইলের ওই হামলা সম্পর্কে আমেরিকা অজ্ঞ ছিল। বিশ্ব মতামতকে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে এটি এক ধরনের মার্কিন প্রতারণা হতে পারে।
ইরানের কৌশল সে তুলনায় ভিন্ন। ইরান দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছে। সেক্ষেত্রে আমেরিকার ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডার ফুরিয়ে আসবে। তাতে আমেরিকা বিপদে পড়বে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ইরান তার কৌশল নির্দিষ্ট করেছে। সেটি তিন ধাপে সম্পন্ন হওয়ার কথা। এর প্রথম দুই ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পথে। প্রথম ধাপের লক্ষ্য ছিল অতি পুরোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে শত্রুপক্ষের রাডার, সামরিক ঘাঁটি এবং ইন্টেলিজেন্স সংস্থাপনা হয় সম্পূর্ণ, না হয় আংশিক ধ্বংস করা। ইরান সেক্ষেত্রে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছে। ইরানকে ঘিরে যে ১৭টি ছোট-বড় মার্কিন ঘাঁটি এ অঞ্চলে আছে, সেগুলো হয় ধ্বংস হয়েছে অথবা বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযুক্ত। আক্রমণের প্রথম ঘণ্টার মধ্যে ইরান কাতারে অবস্থিত সবচেয়ে বড় মার্কিন ঘাঁটি আল উদেদে হামলা চালায়। সেখানে ১ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাডার ধ্বংস করে দেয়। এ রাডার ইসরাইলকে মধ্যপ্রাচ্যসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করত। এরপর ইরান বাহরাইনে আক্রমণ চালায়। সেখানে বিন সালমান নৌবন্দরে আমেরিকার পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর ইরান কুয়েত আক্রমণ করে। সেখানে আমেরিকার গোয়েন্দা ঘাঁটি এবং অন্যান্য প্রতিস্থাপনা আছে। ইরান ‘আল সালেম’ বিমান ঘাঁটি এবং ‘ক্যাম্প আরিফজান’ আক্রমণ করে। আরব আমিরাতের দুই নগরী দুবাই ও আবুধাবিতে আক্রমণ চালিয়ে সিআইএর ঘাঁটি এবং মার্কিন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে আগুন জ্বালায়। সেখানকার ‘আল ডাফরা’ বিমান ঘাঁটি এবং ‘ফুজাইরা’ নৌঘাঁটি আক্রমণের আওতায় পড়ে। ইরান এরপর জর্ডানের ‘শালটি বিমান ঘাঁটি’ আক্রমণ করে এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেয়। এভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। সামরিক দিক থেকে ভাবলে আমেরিকার ক্ষতি ব্যাপক। এভাবে ইরান তার প্রথম ধাপের লক্ষ্য বাস্তবায়ন করেছে।
দ্বিতীয় ধাপে ইরানের লক্ষ্য ছিল আকাশ প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ও থাড ব্যাটারি ব্যবস্থা অকার্যকর করে দেওয়া। প্যাট্রিয়ট ব্যাটারি থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র আমেরিকার হাতে সীমিত পরিমাণে আছে। হিসাব মতে, ওই ভান্ডার ফুরিয়ে যাওয়ার কথা ২৩ মার্চের মধ্যে। অন্যদিকে, থাড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং পৃথিবীতে এর সংখ্যা মাত্র ১১। এর ছয়টি মধ্যপ্রাচ্যে। দুটি সৌদি আরবে ছিল। ইরান সেগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। জর্ডানের ব্যবস্থাটিও ইরান ধ্বংস করে দেয়। আরব আমিরাতে যেটি ছিল, সেটি এখন অকেজো। বাকি আছে দুটি। সেগুলো ইসরাইলে। ফলে আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে মার্কিন-ইসরাইলি বাহিনী যথেষ্ট নাজুক অবস্থায় আছে। আগামী দিনগুলোতে তাদের এ সংকট আরও তীব্র হবে।
তৃতীয় ধাপের লক্ষ্য ইসরাইলের বিরুদ্ধে আক্রমণ তীব্রতর করা। ইরান সেটি সম্পন্ন করতে চায় অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে। খোরামশাহ ক্ষেপণাস্ত্র এর একটি। সেটি ইরান ইতোমধ্যে ইসরাইলের বিরুদ্ধে কয়েকবার ব্যবহার করেছে। এ ক্ষেপণাস্ত্র ভিন্ন ধাঁচের। এটি ৮০টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মিসাইল বহন করে। প্রতিটি ২০ কিলোগ্রাম টিএনটি বহনে সক্ষম। অর্থাৎ একটি খোরামশাহ ক্ষেপণাস্ত্র ১৬০০ ক্ষেপণাস্ত্রের সমান। ফাতাহ-২ আরেক ধরনের বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। ইরান সেটি ইতোমধ্যে ব্যবহার করেছে। এরপর আছে খাইবার শেকান ক্ষেপণাস্ত্র। আশা করা যায়, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অতি শিগ্গির ইরান ইসরাইলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করবে।
পশ্চিমা মিডিয়া বলছে, ইরানের আকাশ মার্কিন-ইসরাইলের দখলে। সেটি সঠিক নয়। এ পর্যন্ত ইসরাইল ইরানকে আক্রমণ করেছে ইরানের পশ্চিম সীমান্ত ব্যবহার করে। ইরান আমেরিকার অনেক MQ9S ও HERMES ড্রোন ভূপাতিত করেছে। অন্তত ৫টি এফ-১৫ বিমান ইরানের বিমানবাহিনীর আঘাতে ভূপাতিত। যেসব অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান ইরানের আছে, সেগুলো পূর্ব ও মধ্য ইরানের জাগ্রস পর্বতমালার অতি গভীরে সংরক্ষিত। সে ধরনের একটি বিমান ঘাঁটির নাম EAGLE 44। এ ঘাঁটিটি ২০২৩ সালে নির্মাণ করা হয়। ইরানের আকাশে মিগ-২৯ এবং সু-২৪ এখনো উড়ছে। ইরান তার আলাবুগা ফ্যাক্টরিতে অত্যাধুনিক ড্রোন নির্মাণ করছে। এ ড্রোনগুলো ইরান আরও আধুনিক করেছে রাশিয়ার চিপ ব্যবহার করে।
সব মিলিয়ে এটুকু বোধগম্য যে, ইরান তার দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে যাবে। এই যুদ্ধে তারা কোনো বিরতি আনবে না, যতক্ষণ না তাদের মূল লক্ষ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে। সেই লক্ষ্যগুলো হতে পারে গালফ দেশগুলো থেকে আমেরিকার উপস্থিতির সমাপ্তি। এর সঙ্গে আরও যোগ হবে ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ইরানের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো আক্রমণ হবে না এ ধরনের শক্ত চুক্তি ইরান বাড়তি হিসাবে আশা করবে। যুদ্ধ পরিস্থিতি যে কোনো দিকে মোড় নিতে পারে। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, উপরে যে চিত্রটি আঁকা হলো, সেটি সঠিক।
ড. বদরুল আলম খান : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক
