Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সংবিধান ও সংবিধান সংস্কার আদেশ : নতুন জটিলতা

Advertisement

Icon

মোবায়েদুর রহমান

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সংবিধান ও সংবিধান সংস্কার আদেশ : নতুন জটিলতা

Advertisement

আজকের লেখাটি সত্যিই আমার জন্য ডিফিকাল্ট। কারণ দীর্ঘ ১৭ বছর পর সত্যিকার অর্থে একটি জাতীয় সংসদ তার উদ্বোধনী অধিবেশনে বসেছে গতকাল ১২ মার্চ। যখন ১৩ মার্চ এ পত্রিকাটি আপনার হাতে পৌঁছাবে তখন জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যবিবরণী আপনারা জেনে যাবেন। বস্তুত বৃহস্পতিবার রাতেই আপনারা সব জেনে যাবেন। অথচ আমাকে লিখতে হচ্ছে বুধবার রাতে। তাই বোধগম্য কারণে সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন নিয়ে কিছু লিখতে পারলাম না। তবে আগের দিন অর্থাৎ বুধবার কিছু ধারণা পেয়েছি। সে অনুযায়ী অন্তত এটুকু বলতে পারি, কয়েকটি প্রধান বিষয়ে কী কী ঘটেছে।

গত বুধবার বিএনপি পার্লামেন্টারি সদস্যদের সভায় স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার সিলেক্ট করার দায়িত্ব বিএনপির পার্লামেন্ট সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীকে দিয়েছেন। সে হিসাবে ধারণা করা যায় যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার পদে কাদের নিয়োগ দেবেন, সেসম্পর্কে তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন। ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিএনপি বিরোধী দলকে অফার করেছিল। প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী বলেছে, অফারটি মৌখিকভাবে দেওয়া হয়েছে। লিখিতভাবে আসুক, তখন দেখা যাবে। এ ছাড়া জুলাই সনদে দুজন ডেপুটি স্পিকারের প্রভিশন আছে। একই প্রভিশন বিএনপির ৩১ দফা ঘোষণাপত্রেও রয়েছে। এখন বিএনপি কি জুলাই সনদ অনুযায়ী এ অফার দিল, নাকি তাদের ৩১ দফা অনুযায়ী দিল, সেটিও বিবেচনা করতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে তারা সিদ্ধান্ত নেবেন।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে বলা আছে, মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে অথবা অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে গেলে পরবর্তী সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনের দিন পর্যন্ত পুরোনো সংসদের স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার স্বীয় পদে বহাল থাকবেন। তিনিই পরবর্তী সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করবেন। তার অনুপস্থিতিতে ডেপুটি স্পিকার সভাপতিত্ব করবেন। কিন্তু বিগত সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই আত্মগোপনে আছেন। আর ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে কারাগারে আছেন। তাই এবারের নতুন সংসদের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছেন বিএনপি সংসদীয় সদস্যদের মধ্যে যিনি প্রবীণতম তিনিই। অনুমিত হচ্ছে যে, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন উদ্বোধনী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেছেন। কারা স্পিকার এবং ডেপুটি স্পিকার হচ্ছেন, সে সম্পর্কে আমি একটি অথেনটিক খবর পেয়েছি।

২.

রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে সব শিক্ষিত সচেতন মানুষের মনে বিপুল কৌতূহল রয়েছে। কারণ ড. ইউনূসের বিগত ১৮ মাসের শাসনামলে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে বঙ্গভবনের বাইরে আসতে দেখা যায়নি। ড. ইউনূস এবং তার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যরাও বঙ্গভবনের অভ্যন্তরেই শপথগ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতি চুপ্পু ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে শেখ হাসিনার আমি ও ডামির নির্বাচনে যে জাতীয় সংসদ গঠিত হয়, সেই সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছেন। ২৪ সালের হাসিনার নির্বাচনকে দেশের রাজনৈতিক দল বর্জন করে এবং ওই সংসদকে অবৈধ বলে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ওই সংসদ গ্রহণযোগ্য হয়নি। যে সংসদ অবৈধ, সে সংসদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনও অবৈধ বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী এবং সংসদ বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, যিনি অতীতে শেখ হাসিনার সময় তার ভাষণ ‘জয় বাংলা’ বলে শেষ করতেন, তিনি এখন তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ভাষণ শেষ করছেন ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’ বলে।

সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশন মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবেই পার হয়ে গেছে। আগামী অধিবেশনগুলোও প্রাণবন্ত হবে বলে আমাদের ধারণা। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও ধারণা হচ্ছে যে, প্রাণবন্ত হলেও কতগুলো জ্বলন্ত পয়েন্টে সামনের দিনের অধিবেশনগুলো খুব উত্তপ্ত হবে। বলা বাহুল্য, যদি উত্তপ্ত হয়, তাহলে তার ফোকাল পয়েন্ট হবে জুলাই সনদ। ইতোমধ্যেই জুলাই সনদ নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। প্রায় ৯ মাস হলো ড. ইউনূসের সরকার আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইসড প্রফেসর ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বে গঠিত ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ নিয়ে ম্যারাথন সেশন করেছে। ৩০টি রাজনৈতিক দল ৯ মাস ধরে দেশের বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে সংবিধানের ওপর আলাপ আলোচনা এবং তর্কবিতর্ক করেছে। অবশেষে ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণীত হয়েছে এবং ওই ৩০টি দলই সেই সনদে স্বাক্ষর করেছে।

জুলাই সনদ তো প্রণীত হলো এবং সবাই স্বাক্ষরও করলেন; কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? জুলাই সনদে মোট ৮৪টি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আলোচনা শেষে ৩৩টি রাজনৈতিক দল ৭টি অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছেন। তারপরই প্রশ্ন ওঠে, এগুলো বাস্তবায়িত হবে কীভাবে? এ প্রশ্ন নিয়েও অনেক আলোচনা হয়। রাজনৈতিক দল ছাড়াও অন্তত পাঁচজন সংবিধান বিশেষজ্ঞের সঙ্গেও একাধিক বৈঠক হয়। আজ আমরা সেগুলোর বিস্তারিত আলোচনায় যাচ্ছি না। এসব আলোচনার ফল জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ প্রণীত হয়। এ আদেশে ৪৮টি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। এ ৪৮টি বিষয়ে শুধু রাজনৈতিক দলগুলো একমত হলেই চলবে না। এসব বিষয় যেন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় সেজন্য সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশে (এখন থেকে আমরা এটিকে শুধু আদেশ বলব) গণভোটের ব্যবস্থাও করা হয়। যেহেতু গণভোট হলো সমগ্র জনগোষ্ঠীর সার্বভৌম ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ, তাই এ গণভোটে যদি জনগণ হ্যাঁ সূচক ভোট দেন, তাহলে এ আদেশ বাস্তবায়নে ভবিষ্যৎ সংসদ এবং সরকার বাধ্য থাকবে।

৩.

এ আদেশে গণভোটের সময় নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। বিএনপি দাবি করে যে, জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট একই দিন অনুষ্ঠিত হবে। পক্ষান্তরে জামায়াত এবং অন্যান্য দল দাবি করে যে, এক দিনে নয়, আলাদা আলাদা দিনে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ইউনূস সরকার বিএনপির দাবি মেনে নেন। একই দিন দুটি ভোটই অনুষ্ঠিত হয়। সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। আর গণভোটে হ্যাঁ’র পক্ষে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ ভোট পড়ে। আর না’র পক্ষে ভোট পড়ে ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ ভোট। অর্থাৎ হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট পড়ে না’র ডাবলেরও বেশি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার বিভিন্ন নির্বাচনি জনসভায় হ্যাঁ’র পক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।

ওই আদেশে বলা হয়েছিল, নির্বাচিত জাতীয় সংসদ একইসঙ্গে দ্বৈত ভূমিকা পালন করবে। একদিকে তারা পার্লামেন্ট বা জাতীয় সংসদ হিসাবে কাজ করবে। তাই তাদের একটি শপথ নিতে হবে। আবার একই পার্লামেন্ট সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে। তখন তার নাম হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে তারা আরেকটি শপথগ্রহণ করবেন।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপিদলীয় সদস্যরা জাতীয় সংসদ-সদস্য হিসাবে অর্থাৎ এমপি হিসাবে শপথ নিয়েছেন। কিন্তু তারা সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে শপথগ্রহণ করেননি। পক্ষান্তরে জামায়াতসহ বিরোধীদলীয় ৭৭ জন সদস্য এমপি হিসাবে এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দুটি শপথগ্রহণ করেছেন। কাজেই শুরুর দিন থেকেই সরকার এবং বিরোধী দলের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

এর মধ্যে হাইকোর্টে দুটি রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। একটি হলো-সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশকে সংবিধানবিরোধী বলে। আর দ্বিতীয়টি অর্থাৎ গণভোট সংবিধানে নাই, তাই গণভোট অবৈধ বলে। এ দুটি রিট পিটিশনের ওপর হাইকোর্ট ঐকমত্য কমিশন এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর কাছে এক মাসের সময় দিয়ে রুল জারি করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আইনজীবীরা এ দুটি রিট পিটিশনের পেছনে বিএনপির কারসাজি রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন। তারা আরও বলেছেন, যেহেতু ৩০টি রাজনৈতিক দল মিলে এ আদেশ প্রণয়ন করেছে এবং ভোট দিয়েছে, তাই এ আদেশ আদালত বা কোর্ট-কাচারির এখতিয়ারভুক্ত নয়। রুল জারি করাও আদালতের আওতার বাইরে বলে তারা মতামত দিয়েছেন।

দেখা যাচ্ছে, জুলাই সনদ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মৌলিক পয়েন্টে বিরোধ শুরু হয়ে গেছে। বিএনপি সমগ্র ব্যাপারে তার অবস্থান নিয়েছে বর্তমানে বিরাজমান সংবিধানের ওপর। পক্ষান্তরে বিরোধী দল তাদের অবস্থান নিয়েছে জুলাই বিপ্লব তথা জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা ক্ষমতার ওপর। তাদের মতে, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বা অভিপ্রায়ের প্রকাশ ঘটেছে জুলাই সনদের মাধ্যমে।

সুতরাং ব্যাপারটা অনেকটা এরকম দাঁড়িয়েছে যে, বিরোধটি মূলত সংবিধান বনাম জুলাই সনদের। মানুষ গভীর আগ্রহের সঙ্গে তাকিয়ে আছেন এটি দেখার জন্য যে, এই আইনি বা সাংবিধানিক বিরোধ চূড়ান্ত পরিণামে কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।

মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক

[email protected]

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম