বাংলাদেশ-ভারত অভিন্ন নদী : সমস্যা ও সমঝোতার পথ
Advertisement
মাহবুব সিদ্দিকী
প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অভিন্ন নদী বলতে এমন নদ-নদীকে বোঝায়, যেগুলোতে একাধিক রাষ্ট্রের মালিকানা বা অংশীদারত্ব রয়েছে। সাধারণভাবে অভিন্ন নদীর সংজ্ঞা হলো, যে নদী উৎস থেকে এর প্রবাহপথে একাধিক রাষ্ট্রের ভূখণ্ড অতিক্রম করে সমুদ্র, হ্রদ, জলাভূমি বা অন্য কোনো নদীতে পতিত হয়। জাতিসংঘের ভাষায় এটি আন্তঃসীমান্ত নদী (Trans-Boundary Rivers)। এগুলো সীমান্ত নদী বা আন্তর্জাতিক নদী হিসাবেও অভিহিত হয়। International Law Association (ILA) আন্তর্জাতিক নদীর যে সংজ্ঞা দিয়েছে সেটি হলো-যেসব নদ-নদী একাধিক রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়, সেগুলোই আন্তর্জাতিক বা বহুজাতিক নদী। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, নীল, রিওগ্রান্ডি, দানিয়ুব, মেকং, নাইজার-এগুলো আন্তর্জাতিক নদী। বিশ্বের প্রায় ২৬১টি নদ-নদী এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত। দুই রাষ্ট্রের সীমানা চিহ্নিত করে প্রবাহিত হওয়া নদীকে সীমান্ত নদী বলা হয়। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সীমান্ত চিহ্নিত করে প্রবাহিত হচ্ছে নাফ নদ। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমানা চিহ্নিত করে প্রবাহিত হচ্ছে পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলার নাগর নদ, ইছামতি সাতক্ষীরা, গঙ্গার রাজশাহী অংশ। আন্তঃসীমান্ত নদী সম্পর্কে হেলসিঙ্কি কনভেনশনে (১৯৯২) যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে তা হলো-দুই বা ততোধিক দেশের সীমান্ত অতিক্রমকারী ভূ-উপরস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানিপ্রবাহভিত্তিক যেসব নদী, সেগুলোই আন্তঃসীমান্ত নদী।
স্বাধীনতা লাভের পর থেকে এখন অবধি আমরা জেনে এসেছি, বাংলাদেশে আন্তঃসীমান্ত বা অভিন্ন নদী রয়েছে মোট ৫৭টি। এর মধ্যে ৫৪টি নদী বাংলাদেশ ও ভারতের সঙ্গে এবং অবশিষ্ট ৩টি নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে রয়েছে। আসলে এ সংখ্যাগুলো নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ নদী কমিশন গঠিত হওয়ার পর। উল্লিখিত কমিশনের সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করেই সংখ্যাগুলো নির্ধারিত হয়েছিল বলে জানা যায়। সংখ্যাগুলো উল্লিখিত তিনটি দেশের যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক স্বীকৃত।
বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা ব্যক্তিগত ও বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ করে জানা গেছে, ১৯৭২-৭৩ সালে যৌথ নদী কমিশন কর্তৃক প্রদত্ত উল্লিখিত অভিন্ন নদীর সংখ্যা (ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে) যে ৫৭ বলা হয়েছে, তা মোটেই নির্ভুল নয়। এখন পর্যন্ত পাওয়া নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, বাংলাদেশ-ভারত এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে অভিন্ন নদ-নদীর সংখ্যা সর্বমোট ২২২। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত অতিক্রম করে উভয় দেশের মধ্যে প্রবেশ করেছে মোট ২১৯টি নদী। অবশিষ্ট তিনটি অভিন্ন নদী বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে।
আমাদের আজকের আলোচনায় শুধু বাংলাদেশ ও ভারতের ২১৯টি অভিন্ন নদীর মধ্যে ৪২টির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করা হবে। এ ৪২টি নদীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এগুলোর অধিকাংশেরই উৎপত্তি হয়েছে বাংলাদেশে এবং শেষ পর্যন্ত ভারতের বিভিন্ন নদীতে পতিত হয়ে সেখানকার প্রবহমান ধারাগুলোকে সমৃদ্ধ করেছে। এই ৪২টি নদ-নদীকে মোট ৫টি শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো-ক) বাংলাদেশে উৎপত্তি-ভারতে পতিত, খ) বাংলাদেশে উৎপত্তি ভারত হয়ে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ, গ) ভারতে উৎপত্তি-বাংলাদেশ হয়ে পুনরায় ভারতে প্রবেশ, ঘ) ভারতে উৎপত্তি বাংলাদেশ হয়ে পুনরায় ভারতে প্রবেশ এবং শেষে বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ, ঙ) উভয় দেশের সীমান্তরেখায় প্রবাহিত অভিন্ন নদীতে পতিত।
শুরুতে বলে রাখা জরুরি, যৌথ নদী কমিশনের প্রদত্ত তালিকার ৫৪টি নদীর মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের একমাত্র কুলিক নদকে দেখানো হয়েছে বাংলাদেশে উৎপত্তি হয়ে ভারতে প্রবেশ করেছে। অথচ সীমান্ত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনসহ আধুনিক মানচিত্র বিশ্লেষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে এ শ্রেণির নদ-নদী পাওয়া গেছে মোট ১৬টি (কুলিকসহ)। এগুলো হলো-ক) ১. গোবরা, ২. বেরং, ৩. ভাতা, ৪. ভেরসা, ৫. নাগর, ৬. নোনা, ৭. তাররা, ৮. কুলিক, ৯. কাহলাই, ১০. মরাটাঙ্গন, ১১. নাল, ১২. বিজরা, ১৩. কাশিয়ানী, ১৪. তুল্লাই/তুলাই বা রাক্ষসিনী-তেঁতুলিয়া, ১৫. ইছামতি (দিনাজপুর) ও ১৬. কোদলা।
উল্লিখিত অভিন্ন নদ-নদীর সবকটির উৎপত্তি বাংলাদেশে এবং সরাসরি ভারতে বিভিন্ন নদীর সঙ্গে মিশেছে। ক্রমিক ১ থেকে ৫ পঞ্চগড় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে উৎপত্তি। ক্রমিক ৬ থেকে ১০ ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্ম। ক্রমিক ১১ থেকে ১৫ দিনাজপুর জেলায় উৎপত্তি। ক্রমিক ১৬ ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় উৎপত্তি।
উল্লিখিত ১৬টি নদ-নদীর অধিকাংশেই সারাবছর পানির প্রবাহ কমবেশি রয়েছে। এগুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ডাহুক, নাগর, টাঙ্গন, আত্রাই ও ইছামতি নদীতে পতিত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া, ইসলামপুর, রায়গঞ্জ, হেমতাবাদ, কালিয়াগঞ্জ, ইটাহার-এসব এলাকা দিয়ে প্রবাহিত নদ-নদীগুলো সমৃদ্ধ করে চলেছে এখানকার বাস্তুতন্ত্র। উল্লিখিত থানাগুলোতে বসবাসকারী প্রায় ১০ লাখ মানুষ এর সরাসরি সুফল ভোগ করেছেন।
খ) ১৭. পুনর্ভবা, ১৮. টাঙ্গন, ১৯. আত্রাই, ২০. ছোট যমুনা, ২১. বেতনা, ২২. চিরি/পদ্মাবতী, ২৩. ঘাঘরা ও ২৪. গুকশী/খুকশী/ছোট যমুনার শাখা। এই শ্রেণির কয়েকটি নদী বাংলার প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত; বিশেষ করে পুনর্ভবা, টাঙ্গন ও আত্রাই। এ আটটি নদীতে সারা বছর কমবেশি পানির প্রবাহ রয়েছে। এগুলো ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার কালিয়াগঞ্জ, দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর, কুশমণ্ডি, বংশীহারি, গঙ্গারামপুর, তপন, কুমারগঞ্জ ও বালুরঘাট থানা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ নদ-নদীগুলোতে প্রায় সারা বছর কমবেশি স্রোত থাকে। ফলে ভারতের উল্লিখিত থানায় বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষ সরাসরি এ নদীগুলোর দ্বারা উপকৃত হচ্ছেন। সেখানকার প্রকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় উল্লিখিত নদ-নদীর ভূমিকা অপরিসীম।
গ) অভিন্ন নদীর এ শ্রেণিতে আমরা পাই ডাহুক নামের একটি নদ। ডাহুক উৎপত্তি লাভ করেছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলাধীন রাজগঞ্জ ব্লকের অধীন যুগীভিটা নামক এলাকায় অবস্থিত একটি জলাভূমি থেকে। ওই জলাভূমি থেকে উৎপন্ন দুটি ধারা একত্রিত হয়ে ডাহুক নামে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।
পঞ্চগড় জেলাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলার শালবাহান নামক এলাকায় গড়ে ওঠা কাজী অ্যান্ড কাজী নামক বিশাল চা বাগানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ডাহুক। এরপর তেঁতুলিয়া উপজেলা এলাকা ত্যাগ করে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের উত্তর দিনাজপুর জেলার চোপড়া থানা এলাকায় প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলাধীন তেঁতুলিয়া উপজেলা এলাকায় উৎপন্ন হওয়া বেরং, ভাতা, গোবরা ও ভেরসা, নামের অভিন্ন নদীগুলো ভারতের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া থানা এলাকায় প্রবেশ করে ডাহুক নদে পতিত হয়েছে। চোপড়া থানা এলাকার একটি বৃহৎ অংশ ডাহুক এবং এর উপনদীগুলোর পানি শুষ্ক মৌসুমে সেচ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ডাহুকসহ এর উপনদীগুলোর বাংলাদেশ অংশে কোনো ধরনের স্থাপনা (বাঁধ, রাবার ড্যাম, স্লুইস গেট ইত্যাদি) নির্মিত হয়নি। ডাহুক নদ ভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অভিন্ন নদী মহানন্দায় পতিত হয়েছে। উল্লেখ্য, তিস্তার পানি গজলডোবায় নির্মিত বাঁধের মাধ্যমে আটকিয়ে খাল কেটে মহানন্দায় ফেলা হচ্ছে। খালের মাধ্যমে প্রথমে ফেলা হচ্ছে ডাহুক নদে, এরপর চলে যাচ্ছে মহানন্দায়। ডাহুক নদের ভারতীর অংশে একটি কপাটবাঁধ (Sluice gate) নির্মিত হয়েছে। (চলবে)
মাহবুব সিদ্দিকী : নদী গবেষক ও লেখক
