লাইলাতুল কদর : মহিমান্বিত রজনীর তাৎপর্য
Advertisement
মুহসিন আল জাবির
প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ইসলামি বর্ষপঞ্জির ১২ মাসের ভিড়ে রমজানুল মোবারক আসে এক পশলা বৃষ্টির মতো, যা মুমিনের হৃদয়ের তপ্ত মরুভূমিকে শীতল করে দেয়। এ রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে এমন এক রজনী, যার মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে স্বয়ং মহান আল্লাহ একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা নাজিল করেছেন। ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘কদরের রাত’ মানবজাতির জন্য আসমানি রহমতের এক মহোৎসব। ‘কদর’ শব্দের বহুবিধ অর্থ রয়েছে-সম্মান, মাহাত্ম্য, তাকদির বা ভাগ্য নির্ধারণ। এ এক রাতেই নির্ধারিত হয় আগামী এক বছরের বিশ্বজাহানের কর্মপরিকল্পনা, আর এ এক রাতের ইবাদতেই অর্জিত হয় আজীবনের সঞ্চয়।
লাইলাতুল কদর হচ্ছে একটি অতি সম্মানিত ও মহত্ত্বপূর্ণ রাত। এ রাতে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকেন। তাফসিরে এসেছে, হজরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের বিশাল এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং প্রতিটি মুমিনের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে রহমতের দোয়া করেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, সূর্যাস্তের পরপরই মহান আল্লাহ তাঁর আরশ থেকে প্রথম আকাশে নেমে আসেন। তাঁর অসীম মায়া ও দয়া নিয়ে তিনি পৃথিবীবাসীকে পরম মমতায় ডাকতে থাকেন।
মহান আল্লাহর সেই আহ্বানটি হলো-‘কে আছ পাপী! তুমি ক্ষমা চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব। কে আছ দুঃখী! আমি তোমার দুঃখমোচন করব। কে আছ রোগী! আমি তোমাকে সুস্থ করে দেব। কে আছ দায়গ্রস্ত! আমি তোমাকে দায়মুক্ত করে দেব। তোমাদের কার রিজিকের প্রয়োজন! আমার কাছে চাও, আমি তার রিজিক বৃদ্ধি করব।’ ফজর পর্যন্ত আল্লাহর এ করুণাময় ডাক অব্যাহত থাকে।
এ ডাক কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়, বরং ধনী-দরিদ্র, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সব গোনাহগার বান্দার জন্য এক উন্মুক্ত আমন্ত্রণ। যারা এ ডাক শুনে সিজদাবনত হয়, চোখের পানিতে বুক ভাসায়, তারাই প্রকৃত সৌভাগ্যবান ও কল্যাণকামী।
সুরা আল-কদরে মহান আল্লাহ এ রাতের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি এটি (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদরে। আপনি কি জানেন লাইলাতুল কদর কী? লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ এ আয়াতগুলোর গভীরে ডুব দিলে বোঝা যায়, এ রাতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রধান কারণ হলো আল-কুরআনের অবতরণ। মানবজাতির মুক্তির সনদ যে রাতে পৃথিবীতে এসেছে, সেই রাতের মর্যাদা যে কোনো জাগতিক হিসাবের ঊর্ধ্বে।
‘হাজার মাস’ শব্দবন্ধটি এখানে একটি রূপক এবং বিশেষ সংখ্যাতাত্ত্বিক অর্থ বহন করে। তিরাশি বছর চার মাস হলো হাজার মাসের সমান। অর্থাৎ, একজন মানুষ যদি দীর্ঘ ৮৩ বছর বেঁচে থাকে এবং প্রতিমুহূর্তে ইবাদত করে, তবে সে যতটুকু সওয়াব পাবে, লাইলাতুল কদরের মাত্র কয়েক ঘণ্টার ইবাদত তাকে তার চেয়েও বেশি সওয়াব এনে দেবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য এক বিশেষ উপহার।
নবীজি (সা.)-এর একটি গল্পে এ রাতের শ্রেষ্ঠত্বের উত্তর নিহিত আছে। একদিন রাসুল (সা.) সাহাবায়ে কেরামদের সামনে বনি ইসরাইলের জনৈক উপাসকের কথা বলছিলেন, যিনি এক হাজার মাস ধরে আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন এবং দিনের বেলা জিহাদ করতেন। এ অলৌকিক সাধনার কথা শুনে সাহাবায়ে কেরাম আক্ষেপে ফেটে পড়লেন। তারা চিন্তা করলেন, ‘আমাদের আয়ু তো ৬০-৭০ বছর, আমরা কীভাবে এত দীর্ঘ সময় ইবাদতকারী ব্যক্তির সমকক্ষ হব? আমরা তো সেই উপাসকের মতো উচ্চমর্যাদা অর্জন করতে পারব না।’
সাহাবিদের এ ব্যাকুলতা ও নেক কাজের প্রতি তৃষ্ণা দেখে মহান আল্লাহ জিবরাইল (আ.)-কে পাঠালেন। জিবরাইল (আ.) সুরা কদর নিয়ে হাজির হলেন এবং উম্মতে মুহাম্মদিকে সুসংবাদ দিলেন যে, তোমাদের আয়ু কম হলেও আমি তোমাদের এমন একটি রাত দিয়েছি, যা পূর্ববর্তী উম্মতদের হাজার মাসের সাধনার চেয়েও দামি। এটি এ উম্মতকে ‘সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত’ হিসাবে আবারও প্রমাণ করে দিল।
লাইলাতুল কদরকে নির্দিষ্ট কোনো তারিখে সীমাবদ্ধ না রেখে রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয় কেন গোপন রাখা হলো? ওলামায়ে কেরাম বলেন, এর পেছনে আল্লাহর এক নিগূঢ় রহস্য ও পরীক্ষা রয়েছে। মূল্যবান কোনো সম্পদ যেমন মাটির গভীরে বা ঝিনুকের ভেতরে লুকিয়ে থাকে, তেমনই পরম কাঙ্ক্ষিত এ রাতকেও আল্লাহ সাধনার আড়ালে রেখেছেন।
যদি এটি নির্দিষ্ট থাকত, তবে মানুষ কেবল ওই এক রাতেই ইবাদত করত এবং বাকি সময় অলসতায় কাটাত। আল্লাহ চান তাঁর বান্দারা অন্তত পাঁচটি রাত (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯) তাঁকে একনিষ্ঠভাবে খুঁজুক। নবীজি (সা.) বলেন, ‘তোমরা মাহে রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোয় লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো’ (বুখারি)। এ অনুসন্ধানের প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদত হিসাবে গণ্য হয়।
নবীজির আমলে অনেক সাহাবি রমজানের ২৭ তারিখকে লাইলাতুল কদর হিসাবে স্বপ্ন দেখেছিলেন। হজরত উবাই ইবনে কাব (রা.) শপথ করে বলতেন, ২৭তম রাতই হলো কদরের রাত। সহিহ মুসলিমের এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যদি দুর্বল অথবা কোনো কারণে অক্ষম হয়ে থাকে, সে যেন রমজানের ২৭ তারিখ রাতে ইবাদত মিস না করে।’ বিজ্ঞজনরা একটি চমৎকার গাণিতিক ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দটিতে ৯টি অক্ষর রয়েছে। সুরা কদরে এ শব্দটি মোট তিনবার এসেছে। সুতরাং, ৯ কে ৩ দিয়ে গুণ করলে ফলাফল হয় সাতাশ। তাই জমহুর ওলামাদের মতে, সাতাশ রমজানের দিবাগত রাতে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তবে সত্যিকারের আল্লাহপ্রেমীরা কোনো ঝুঁকি নিতে চান না, তারা প্রতিটি বিজোড় রাতেই সমান গুরুত্ব দিয়ে ইবাদত করেন।
লাইলাতুল কদরের রাতের কিছু প্রাকৃতিক ও আধ্যাত্মিক নিদর্শন রয়েছে, যা বিজ্ঞজনরা অনুভব করেছেন-
আলোকোজ্জ্বল আকাশ : এ রাতে অন্ধকার খুব বেশি গভীর হবে না; এক ধরনের স্নিগ্ধ আলো বা নূরানি আভা চারপাশ ছেয়ে থাকবে।
নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়া : অধিক গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না। বাতাস হবে মৃদু ও প্রশান্তিদায়ক।
ফেরেশতাদের উপস্থিতি : ফেরেশতাদের আধিক্যের কারণে পৃথিবী সংকীর্ণ হয়ে পড়ে, যা মুমিনদের হৃদয়ে একধরনের অপার্থিব আনন্দ ও কান্নার উদ্রেক করে।
সূর্যোদয় : কদর শেষে পরদিন সকালে সূর্য যখন উদিত হবে, তখন তা হবে পূর্ণিমার চাঁদের মতো ফিকে এবং এর তেজ হবে অত্যন্ত কম।
লাইলাতুল কদরের প্রধান লক্ষ্য হলো, ‘মাগফিরাত’ বা মুক্তি। এ রাতে মুমিন বান্দার কাজ হবে নফল ইবাদতের মাধ্যমে সময় কাটানো। ধীরস্থিরভাবে দীর্ঘ রুকু ও সিজদার মাধ্যমে নফল নামাজ আদায় করা। সিজদায় তসবি পড়ার পর আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় ক্ষমা চাওয়া যেতে পারে। জীবনের পেছনের ভুলগুলো স্মরণ করে আন্তরিকভাবে অনুতপ্ত হওয়া। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন, কদরের রাতে যে তওবা করবে, তাকে তিনি নিষ্পাপ শিশুর মতো পবিত্র করে দেবেন।
যেহেতু এটি কুরআন নাজিলের রাত, তাই অর্থসহ কুরআন পাঠ করা এবং এর বিধান জীবনে বাস্তবায়নের শপথ নেওয়া। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য এবং সারা বিশ্বের মুসলিম উম্মতের জন্য চোখের পানি ফেলে দোয়া করা।
হজরত আয়েশা (রা.) একবার রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানতে পারি, তবে আমি কী দোয়া করব?’ নবীজি (সা.) তাকে একটি ছোট, কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী দোয়া শিখিয়ে দিলেন-
‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন; তুহিব্বুল আফওয়া, ফা’ফু আন্নি’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! তুমি তো ক্ষমাশীল! ক্ষমাকে তুমি ভালোবাসো। অতএব আমাকে তুমি ক্ষমা করো।’ এ দোয়াটি বারবার পাঠ করা উচিত, কারণ আল্লাহর কাছে ক্ষমার চেয়ে বড় কোনো সম্পদ নেই; যার ক্ষমা অর্জিত হলো, তার পুরো জীবনই সার্থক হলো।
পরিশেষে বলা যায়, লাইলাতুল কদর আমাদের জন্য আত্মশুদ্ধি ও মহান রবের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক স্থাপনের এক অনন্য সুযোগ। এ রাতে যারা ক্ষমা পেল না, তারা আসলেই হতভাগা। জীবনের প্রতিটি বাঁকে আমরা গোনাহ করেছি, মানুষের অধিকার নষ্ট করেছি-আজকের এ মহিমান্বিত রাতই সেসব মলিনতা ধুয়ে ফেলার শ্রেষ্ঠ সময়।
আসুন, আমরা এ পবিত্র রাতে মোবাইল ফোন, অনর্থক গল্প-গুজব এবং ঘুমে সময় নষ্ট না করে আল্লাহর সিজদায় অবনত হই। আমাদের চোখের পানি যেন জাহান্নামের আগুনকে নিভিয়ে দেয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে লাইলাতুল কদরের পূর্ণ ফয়েজ ও বরকত নসিব করুন। আমিন।
মুহসিন আল জাবির : ইসলামি গবেষক ও বিশ্লেষক
