Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

ত্রিমুখী যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ১৬ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ত্রিমুখী যুদ্ধের প্রভাবে দেশের অর্থনীতি

Advertisement

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরানের ত্রিমুখী যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে। এ যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুমুখী সংকটের মুখে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশেই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের অর্থনীতিতে। মূল্যস্ফীতি, রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, আমদানি ব্যয় এবং ডলারের দামে প্রভাব পড়তে পারে। সুতরাং দেশের অর্থনীতি নিয়ে আমরা গভীরভাবে শঙ্কিত। এমনিতেই আমাদের অর্থনীতি নিম্নমুখী ছিল। এখন আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুদ্ধ।

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। এতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলো বড় ধরনের চাপে রয়েছে। কিন্তু চাপ যতই থাকুক না কেন, আমাদের অর্থনীতিকে চালু রাখতে হলে তেল তো আনতেই হবে। কারণ, জ্বালানি তেল ছাড়া আমাদের অর্থনীতির চাকা ঘোরানো সম্ভব নয়। অবশ্য হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে, এটা একটা ইতিবাচক দিক। বিশ্ববাজারে জ্বালনি তেল নিয়ে অস্থিরতার মধ্যেই হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইরান। এতে তেল সংকট কিছুটা হলেও কাটবে বলে আশা করা যায়। তবে কোনো কারণে যদি হরমুজ প্রণালি আবার বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো বাংলাদেশেরও তেলপ্রাপ্যতা অনেকটা সংকটের মুখে পড়বে। তাছাড়া বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত নিয়েও একটা শঙ্কা রয়েছে। কারণ বিপিসি ও পদ্মা, মেঘনা, যমুনার অদূরদর্শিতার কারণে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে তেলের মজুত সর্বনিম্নে রয়েছে। যেখানে আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলো ভারতে মজুত রয়েছে ৭৪ দিনের, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় রয়েছে ৩০ দিনের, আর বাংলাদেশে আছে মাত্র ১০ দিনের। বাংলাদেশে যদি তিন মাসের মজুত থাকত, তাহলে বিষয়টি এতটা কঠিন হতো না। জ্বালানি তেলের এ মজুতস্বল্পতার কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোয় গাড়ির লম্বা লাইন পড়তে দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যয় হয়ে যাচ্ছে তেল নিতে গিয়ে। বলতে গেলে দিনের অনেকটা সময় চলে যাচ্ছে শুধু রিফুয়েলিং করতে। নষ্ট হচ্ছে অনেক কর্মঘণ্টা। আসলে আমাদের অর্থনীতির চাকার সঙ্গে সম্পর্কিত জ্বালানি তেল নিয়ে এ ধরনের উদাসীনতা কখনো কাম্য হতে পারে না।

আরেকটি বিষয় না বললেই নয়, সেটা হলো কিছু সুযোগসন্ধানী মানুষ জাতীয় সংকটকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করে। নাটোরের সিংড়ায় পানির ট্যাংকে অবৈধভাবে দশ হাজার লিটার জ্বালানি তেল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপরাধে রুবেল হোসেন নামের এক ব্যবসায়ীকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ ব্যাপারে আমাদের প্রশাসনকে আরও কঠোর হওয়া উচিত। সর্বোপরি এ ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তা না হলে জাতীয় সংকট থেকে আমাদের মুক্তি নেই। আমাদের ইকোনমি তো স্লোডাউন ছিলই, তার ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান-ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ। সুতরাং অর্থনীতি নিয়ে খুবই শঙ্কিত আমরা। দেশের বর্তমান অর্থনীতির যে প্রচ্ছায়া দেখছি, সেখানে মূল্যস্ফীতি বাড়বে, কিছুতেই এটা রোধ করা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মানিটারি পলিসি রেট কমানো উচিত ছিল। কিন্তু অর্থনীতিবিদরা এ ব্যাপারে কিছুটা সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলেছেন। তাদের এ সতর্কতার বিষয়টি ঠিক আছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংক সময় নিতেই পারে। অবশ্য পলিসি রেট কমানোর বিষয়ে তারাহুড়ো করা ঠিকও নয়। আবার কমাতে গেলেও এখানে আরেকটা ব্যাপার সামনে এসে যায়, সেটা হলো ডলার ভার্সেস টাকার বিষয়টি। অর্থাৎ ডলারের বিপরীতে এক্সচেঞ্জ রেট। খেয়াল রাখতে হবে, এটা যেন অ্যাডভান্সলি এফেক্টেড না হয়। বর্তমানে ইউএস এক ডলার সমান ১২২ টাকা। এক্সচেঞ্জ রেটের ভেতরেই রাখার চেষ্টা করতে হবে। টাকার মূল্য হারানোর ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। অর্থাৎ বিষয়টি যেন ডলারের বিপরীতে আমাদের টাকার মূল্য হারানোর পথে নিয়ে না যায়। এ বিষয়টি নিয়েও আমরা চিন্তিত আছি। সুতরাং পলিসি রেটের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে খুব চিন্তাভাবনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্তত পলিসি রেট কমানোর ব্যাপারে তো বটেই। বাড়ানোর প্রশ্নই আসে না। আমরা যেভাবে চলছিলাম, সেভাবে চলতে থাকলে আমাদের ইকোনমি হয়তো পিক আপ করত, এমনটি আশা করা যাচ্ছিল। কিন্তু মাঝখানে সমস্যা হয়ে দেখা দিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান যুদ্ধ। এ যুদ্ধের কারণে আমাদের রপ্তানিতে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আমাদের এক্সপোর্ট কন্টিনিউয়াসলি সাত মাস তাড়া করেছে। যেটা গত ১৫-২০ বছরেও হয়নি। আমার জানা মতে, আমাদের এক্সপোর্ট সাধারণত ১০-১২ শতাংশ হারে গড়ে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু এখন ৭ মাস ডিক্লেইন করেছে। বিষয়টি আমাদের চিন্তার আওতায় আনা উচিত।

এটা গেল একদিক। আরেকটি বিষয়, সেটা হলো রেমিট্যান্স। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা কাজ করে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। আসন্ন ঈদকে উপলক্ষ্য করে দেশে প্রচুর রেমিট্যান্স আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে থাকলে তো চলবে না। কারণ, যুদ্ধের কারণে রেমিট্যান্সের ওপরও একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় কাজ করে। এই মধ্যপ্রাচ্যের গালফ কান্ট্রিগুলো যদি যুদ্ধের কারণে এফেক্টেড হয় বা তাদের অর্থনীতিতে যদি আঘাত আসে, তাহলে তারা কর্মী ছাঁটাই করবে। ফলে বহু বাংলাদেশি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসবে। এখন দেখার বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো আমাদের ওয়ার্ক ফোর্সকে কতটুকু কাজে লাগাবে। ওই দেশগুলোর তেল ইন্ডাস্ট্রিগুলো যদি এফেক্টেড হয়, তাদের তো ইনকাম বন্ধ হয়ে যাবে। তখন আমাদের এ শ্রমিকদের তারা কতটা ব্যবহার করবে, কতটা নেবে, কতটা রাখবে, এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তার বিষয় আছে। সুতরাং রেমিট্যান্সের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা উচিত হবে না।

বাংলাদেশ চাল এবং গমের নেট ইমপোর্টার। আমরা কথার কথা বলি যে, আমাদের ফসল ভালো হলে আর কিছু লাগে না। কথাটি ঠিক নয়। ফসল ভালো হলে আমাদের খাদ্য চাহিদার ব্যবধানটা কমে যায়, ব্যাস অতটুকুই। কিন্তু আদতে আমাদের নেট ঘাটতি থেকেই যায়। এসব ক্ষেত্রে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে এমন একটা অর্থনীতিকে যদি কিছুটা হলেও টেনে তুলতে চাই, তাহলে অর্থনীতির নীতির ক্ষেত্রে কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। অর্থনীতির নীতির সে কঠোরতাটা হচ্ছে সরকারের নিজের ব্যয় কমাতে হবে। পাবলিক এক্সপেন্ডিচার, মানে সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় কমাতে হবে। এখানে নতুন পে-স্কেলের ব্যাপারটিও আছে। ওটা কিছু হলেও বিলম্ব করতে হবে। আরেকটা হচ্ছে, সরকারের অপ্রয়োজনীয় যে ব্রাঞ্চেসগুলো আছে, মিনিস্ট্রি আছে, ডাইরেক্টরেট আছে, এগুলো এমালগোমিটেড করা উচিত। আমি অনেক আগে থেকেই বলছি সরকারের পরিচালনাগত ব্যয় কমানোর জন্য। সেটা যদি সরকার কমাতে না পারে, তাহলে ট্যাক্স কালেকশন যতই করুক না কেন, কোনো কিছুতেই কুলাবে না। তাছাড়া রেভিনিউ কালেকশন তো বাড়বে না সহজে। রেভিনিউ কালেকশন কোথা থেকেই বা বাড়বে। কারণ, ইনভেস্টমেন্ট হলেই তো ইকোনমিতে রেভিনিউ কালেকশন বাড়ত। তাছাড়া জিডিপি গ্রোথ যদি নিম্নমুখী হয়, তাহলে রেভিনিউ কালেকশন বাড়বে না। সরকারের পরিচালনাগত ব্যয়ে যদি লাগাম টানা না হয়, তাহলে বাজেটে এ গ্যাপটা থেকেই যাবে। আমাদের বৈদেশিক ঋণের সুদ বছরের পর বছর আরও বাড়ছে। অতীতের যে কালেক্টেড জমাকৃত সরকারি ঋণ ছিল, এগুলোকে সামাল দেওয়া অতটা সহজ হবে না। এখন দুশ্চিন্তার বিষয় হচ্ছে, সরকার দিশা না পেয়ে মানি প্রিন্টিংয়ের দিকে যেতে পারে। সেটা হবে একধরনের অপ্রকাশিত অপ্রেসিভ একটা ব্যাপার। এর ফলে ইনফ্লেশান আরও নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে। তাতে গরির লোকরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, ইনফ্লেশানের প্রথম ধাক্কা, সেকেন্ড ধাক্কাটা আসে গরিবদের ওপর। সেজন্য সরকারের ব্যয় কমানো উচিত। নিম্নশ্রেণির গরিব লোকদের জন্য রেশন বা কম মূল্যে ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) সেটা জোরদার করা দরকার। ফরেন এক্সচেঞ্জ ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাশ্রয়ী হতে পারে। এ বিষয়গুলো মাথায় না রাখলে সামনে সমূহ বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)

আবু আহমেদ : প্রফেসর; চেয়ারম্যান, আইসিবি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম