Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

দিলারা হাফিজ : এক নীরব আলোর নিভে যাওয়া

Advertisement

Icon

আমিরুল ইসলাম কাগজী

প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

দিলারা হাফিজ : এক নীরব আলোর নিভে যাওয়া

দিলারা হাফিজ। ফাইল ছবি

Advertisement

মানুষের জীবন কখনো কখনো এতটাই নিভৃত অথচ এতটাই দীপ্তিময় হয় যে, তার প্রস্থান কোনো ব্যক্তিগত শোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না-তা হয়ে ওঠে একটি সমাজের, একটি প্রজন্মের, এমনকি একটি জাতির নীরব বেদনা। অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন তেমনই এক আলোকিত নাম। তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল শিক্ষাবিদ, স্নেহময়ী মা, প্রজ্ঞাবান সহধর্মিণী এবং সর্বোপরি একটি মূল্যবোধনিষ্ঠ জীবনের প্রতীক। তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার শোকাহত হয়নি; শোকাহত হয়েছে শিক্ষা, শালীনতা, সংস্কার ও মানবিকতার এক পরম পরিসর।

আজ যখন তার মৃত্যুসংবাদ আমাদের কানে আসে, তখন হৃদয়ের ভেতর কোথাও এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়। কারণ, কিছু মানুষ আছেন যারা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে না থেকেও চারপাশকে আলোকিত করেন। তারা প্রচারের মানুষ নন, তারা প্রভাবের মানুষ। তারা মঞ্চের সামনে দাঁড়ান না, কিন্তু মঞ্চ নির্মাণের পেছনে তাদের নীরব শ্রম থাকে। দিলারা হাফিজ ছিলেন তেমনই এক অনাড়ম্বর দীপশিখা।

সংবাদমাধ্যম ও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সহধর্মিণী অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ইন্তেকাল করেছেন। কিন্তু তার পরিচয়ের মূলভিত্তি কখনো কেবল রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হওয়া ছিল না। বরং তিনি নিজস্ব যোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও কর্মনিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন স্বতন্ত্র মর্যাদা। একজন শিক্ষক যখন শুধু পাঠ্যবই পড়ান না, বরং মানুষ গড়েন, তখন তিনি সমাজের স্থপতি হয়ে ওঠেন। দিলারা হাফিজ ছিলেন সেই অর্থে একজন সত্যিকারের শিক্ষক; যিনি অসংখ্য ছাত্রছাত্রীর জীবনে শুধু জ্ঞানের আলোই দেননি, দিয়েছেন সাহস, শৃঙ্খলা, রুচি, বিবেক ও আত্মমর্যাদার শিক্ষা। এর পাশাপাশি তিনি ছিলেন শিক্ষাপ্রশাসক, নীতিনির্ধারক এবং নারী শিক্ষার অনুপ্রেরণাদায়ী পথিকৃৎ। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি শ্রেণিকক্ষ থেকে শিক্ষা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত নিজস্ব দক্ষতা, সততা, প্রজ্ঞা ও মানবিক নেতৃত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। দেশের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, নারীশিক্ষা বিস্তার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় তার অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

অধ্যাপক দিলারা হাফিজ এমন এক সময়ে বেড়ে ওঠেন, যখন বাঙালি সমাজে নারীদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত প্রতিষ্ঠা আজকের মতো সহজ ছিল না। সেই বাস্তবতায় তিনি শিক্ষাকে জীবনের প্রধান শক্তি হিসাবে গ্রহণ করেন। তিনি সাহিত্য, মানবিক মূল্যবোধ, শিক্ষাবিজ্ঞান এবং সমাজ-বাস্তবতার প্রতি গভীর অনুরাগ নিয়ে নিজের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করেন। শিক্ষা সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সুদূরপ্রসারী-তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার লক্ষ্য কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল নয়; বরং জাগ্রত বিবেক, যুক্তিবোধ, সৃজনশীলতা এবং মানবিক চরিত্র গঠন। শিক্ষাজীবনে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং সমাজ, রাষ্ট্র, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে নিজস্ব বোধ তৈরি করেন। এই বিস্তৃত চিন্তার জগৎ তাকে পরিণত করে একজন ‘শিক্ষক’ থেকে ‘শিক্ষানেতা’-তে।

শিক্ষকতা জীবনের সূচনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে দিলারা হাফিজ তার কর্মজীবন শুরু করেন সরকারি ইডেন কলেজে প্রভাষক হিসাবে। তরুণ শিক্ষক হিসাবে তিনি দ্রুতই শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা ও সহকর্মীদের আস্থা অর্জন করেন। তার ক্লাস ছিল প্রাঞ্জল, সুসংগঠিত এবং অনুপ্রেরণামূলক। তিনি শুধু পাঠদান করতেন না; বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ-চিন্তার বীজ বপন করতেন।

শুধু দক্ষ শিক্ষক হিসাবেই নয়, তিনি খুব দ্রুত একজন সফল প্রশাসক হিসাবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যার ফলে যেখানে তার কর্ম জীবন শুরু, সেই সরকারি ইডেন কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের অধ্যক্ষ হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। অধ্যাপক দিলারা হাফিজের কর্মজীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলোর একটি হলো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন। এ পদে থেকে তিনি দেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাক্রম, পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সংশোধন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। শিক্ষাকে সময়োপযোগী করা, জাতীয় চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া, নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া এবং শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি বিকাশে সহায়ক বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে তিনি বিশেষ মনোযোগী ছিলেন বলে শিক্ষা অঙ্গনে তার নাম সম্মানের সঙ্গে উচ্চারিত হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষকদের সর্বশেষ কিংবা বলা যায় সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান। অধ্যাপক দিলারা হাফিজ সেই মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এটি দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার প্রশাসনিক তদারকির অন্যতম শীর্ষ পদ। এ পদে থেকে তিনি নীতিমালা বাস্তবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ, মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখেন।

অধ্যাপক দিলারা হাফিজ ছিলেন দৃঢ়চেতা, মার্জিত, নীতিনিষ্ঠ এবং কর্মমুখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তার মধ্যে একসঙ্গে ছিল শৃঙ্খলা ও মানবিকতা, কঠোরতা ও মমত্ব, প্রজ্ঞা ও বাস্তববোধ। সহকর্মীদের কাছে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল প্রশাসক; শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন স্নেহময়ী কিন্তু নীতিতে অটল শিক্ষক।

জীবনের দীর্ঘ কর্মময় পথ অতিক্রম করে অধ্যাপক দিলারা হাফিজ শেষ সময় পর্যন্ত শিক্ষা অঙ্গনের মানুষের স্মৃতিতে সম্মানের আসনে ছিলেন। তার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও অবদান তাকে আলাদা মর্যাদা দিয়েছে। জীবনের শেষ অধ্যায়ে শারীরিক অসুস্থতা থাকলেও তার কর্মজীবনের দীপ্তি ম্লান হয়নি।

সব শেষে বলব মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, যিনি সদ্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন, তার দীর্ঘ কর্মজীবনের পেছনে একজন সহযোদ্ধা, একজন নীরব প্রেরণা, একজন অবিচল সঙ্গী হিসাবে অধ্যাপক দিলারা হাফিজ নিশ্চয়ই ছিলেন অপরিহার্য শক্তি। একজন সহধর্মিণী শুধু সংসারসঙ্গী নন; তিনি জীবনের কঠিনতম সময়ের সহযাত্রী। যখন একজন মানুষ রাষ্ট্রের দায়িত্বে থাকেন, তখন তার ব্যক্তিগত জীবনের শান্তি ও স্থিতি বহুলাংশে নির্ভর করে ঘরের মানুষের ওপর। দিলারা হাফিজ সেই স্থিতির প্রতীক। এমন মানুষদের অবদান ইতিহাসের শিরোনামে লেখা না থাকলেও, ইতিহাসের ভেতরের সত্যে তারা অমর হয়ে থাকেন।

আমিরুল ইসলাম কাগজী : সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম