অন্যমত
একটু ভেবে চিন্তেই পা ফেলতে হবে
Advertisement
আবু আহমেদ
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিদ্যমান যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কৌশল নির্ধারণে দেশের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে ৭ মার্চ বৈঠক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যে কোনো পরিস্থিতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখাসহ নীতি-সুদহার আপাতত না কমানোর পরামর্শ দিয়েছেন বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অর্থনীতিবিদরা। এর পাশাপাশি বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির পথ খোঁজার পরামর্শও দিয়েছেন তারা। সুদহার না কমানো নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে দ্বিমত আছে, থাকতেই পারে। তারা যেটা বলেছেন, সেটা আমিও বলছি, বর্তমান পরিস্থিতিতে আপাতত সুদহার না কমানো। কারণ এ মাস থেকে বা আগামী মাস থেকে রেপো রেট (পলিসি রেট) কমার কথা রয়েছে। যেটা উচিত ছিল; কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, দেখেশুনে এ কাজটি করার জন্য অর্থনীতিবিদরা একেবারে কমানোর বিপক্ষে পদক্ষেপ নেননি। তারা সময় নেওয়ার কথা বলেছেন; যাতে করে আমাদের বৈদেশিক এক্সচেঞ্জ রেট ঠিক থাকে এবং রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে। এতে বিনিয়োগ পিকআপ করতে হয়তো একটু সময় নেবে। যেহেতু যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়েই একটা ক্রান্তিকাল যাচ্ছে এবং তার প্রভাব এসে আমাদের ওপরও পড়ছে, সেজন্য যে কোনো ব্যাপারেই একটু সময় নেওয়া উচিত। বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে তো আর জাদুরকাঠি নেই যে, বললেই সবকিছু হয়ে যাবে।
এখন সবকিছুই নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের আত্মবিশ্বাস, অর্থনীতির ওপর মানুষের বিশ্বাস এবং পলিসির ওপর মানুষের বিশ্বাসের ওপর। এর সঙ্গে রয়েছে সরকারের ঘাটতি বাজেট মোকাবিলা ও পরিচালনাগত ব্যয়ের লাগাম টানার বিষয়টি। কারণ হচ্ছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে হায়েস্ট ট্যাক্স প্রয়োগকারী দেশ। এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশ-কম্বোডিয়া, শ্রীলংকা এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের ইকোনমিতে ট্যাক্স রেট আমাদের থেকে তুলনামূলক কম। সুতরাং, এখানে ট্যাক্স রেট বাড়ানোরও আর কোনো সুযোগ আমি দেখি না। আমাদের অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি যদি হতো, তাহলে জেলা-উপজেলাগুলোতে যারা ট্যাক্সের আওতায় আসছে না, তাদের নতুন করে ট্যাক্সের আওতায় আনা যেত। এতে ট্যাক্স কালেকশন হয়তো বাড়ত। আমাদের সবাইকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে যে, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিদ্যমান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে; ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিশ্বজুড়েই ইনফ্লেশানের একটা প্রভাব পড়বে; যার রেশ বাংলাদেশেও পড়বে। সুতরাং, আমাদের একটু বুঝেশুনেই পা ফেলতে হবে।
বাংলাদেশের ফরেন এক্সচেঞ্জ রেট একটা ভালো অবস্থানে আছে; এটি যাতে ডিফ্রেইড না হয়, এটা অর্থনীতিবিদরা বলেছেন। তাদের সঙ্গে আমিও একমত। হয়তো আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংক ওপেন মার্কেট থেকে ডলার কিনছে না। ঠিক আছে, নাই বা কিনুক। এতে করে মার্কেটে এভেইলেভেল হবে ডলার। মুদ্রা বাজারে ডলার এভেইলেভেল হওয়া উচিত। তাতে ডলার এক্সচেঞ্জ রেট হয়তো আমাদের পক্ষেই থাকবে। ওটা ঠিক আছে, সারপ্লাস ডলার বেশি হলে তখন দেখা যাবে কী হয়। ঈদের সময় দেশে হয়তো বেশি রেমিট্যান্স আসবে। আমাদের রিজার্ভ বাড়বে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব-নিকাশ করে দেখতে পারে, কিছু কিনবে কী কিনবে না। আমি ডলারের রেট বাড়ানোর পক্ষে নই। প্রতি ডলারে মূল্য ১২২ টাকা, এর মধ্যে থাকাই ভালো হবে।
আপাতদৃষ্টিতে দেখা যাচ্ছে, সবকিছু মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতির ওপর একটি ঝড় আসার আশঙ্কা রয়েছে। সামনে বড় ধরনের একটা ধাক্কা সামাল দিতে হতে পারে; তাই আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। সুদ-আসলে বিদেশি ঋণের পেমেন্ট ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বিদেশি এ ঋণের সুদ-আসল আমাদের রিজার্ভ থেকে ডলারেই পরিশোধ করতে হবে। তার ওপর উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামো যা কিছু আছে, সেগুলোর মেইনটেন্যান্সেরও ব্যাপার আছে। এগুলোতে ডিপ্রিসিয়েশন কস্ট আছে। এসব জোগান দিতে হবে। এগুলো তো দিতেই হবে, তা না হলে উন্নয়ন প্রকল্পের অবকাঠামোগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সুতরাং, যে কোনো উপায়েই হোক, উন্নয়ন প্রকল্পের চলমান কাজগুলোকে চালু রাখতেই হবে; তা না হলে প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যাবে না; ফলে প্রকল্পের সময় বেড়ে যাবে। আর সময় বেড়ে গেলে প্রকল্পের খরচও বেড়ে যাবে, যেটি অর্থনীতির ওপর একটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আমাদের যে যে প্রকল্পগুলো প্রায় হয়ে গেছে, সেগুলো দ্রুত ব্যবহারের আওতায় আনা উচিত। সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সমন্বয়হীনতার কারণে সেগুলো যেন পড়ে না থাকে, কেননা প্রকল্পগুলো চালু হলে সরকারের আয়ের পাল্লা ভারী হবে। বড় বড় পাবলিক সেক্টর রেখে দিয়েছে, পোর্ট রেখে দিয়েছে। এগুলো ইনইফিশিয়েন্ট অবস্থায় থাকলে সেটা আমাদের অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। থার্ড টার্মিনাল অবিলম্বে চালু করে দেওয়া উচিত। চিটাগাং পোর্টের ব্যাপারে সরকারকে একটা সিদ্ধান্তে আসা উচিত। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, বিদেশি ডিপ্লোয়ার যারা রয়েছেন, তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলা উচিত। কারণ দেশে একটা ইফিশিয়েন্ট ইকোনমি দাঁড় করানো উচিত। সেটা করতে না পারলে আমাদের কপালে দুর্গতি আরও বাড়বে। সামনে আমাদের কৌশলে এগোতে হবে, যাতে করে অর্থনীতির ক্ষেত্রে দুর্গতি যেন আর না আসে। ন্যাচারাল কিছু দুর্গতি আছে, সেটা আমরা রোধ করতে পারব না। যেমন-জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ছে। সেটা তো আমরা রোধ করতে পারব না; কিন্তু আমাদের অদক্ষতার কারণে, দুর্নীতির কারণে যদি অর্থনীতি আরও বেশি চাপের মুখে পড়ে এবং এর জন্য ইনভেস্টর্স, যারা বিজনেস করছেন, তাদের মধ্যে বিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দেয়, তাহলে সেটা আমাদেরই দোষ। সেটা আমাদের পলিসিতে দোষের কারণেই হচ্ছে। এ বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হবে। আশা করি, সবাইকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করে, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আমাদের অর্থনীতির গতি নির্ধারিত হবে। অর্থনীতিবিদদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই যে বৈঠক হলো, এটা অবশ্যই একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। এটা একটা গুড ওয়ার্ক। অবশ্য এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। এ বৈঠক অতীতেও হয়েছে, কোনো কারণে মধ্যখানে হয়তো করা হয়নি।
যাই হোক, সরকারের বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোর ব্যাপারে আসি। সরকারের অগ্রাধিকারভুক্ত চ্যালেঞ্জগুলো হলো, ঘাটতি বাজেটকে ম্যানেজ করা, পরিচালনাগত ব্যয়কে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা, সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেটে পরিবর্তন আনা। এনার্জি ম্যানেজমেন্টের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এটা আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তির ওপর নির্ভরশীল। কারণ, পেট্রোলিয়াম প্রডাক্টের ওপর আমাদের অনেক কিছুই নির্ভরশীল। তবে পেট্রোলিয়াম প্রডাক্ট বা জ্বালানি বিশ্ববাজার থেকে আমাদের কম্পেটেটিভ প্রাইসে কিনতে হবে। বিশ্বের যেখান থেকে সস্তায় এবং নিরাপদে জ্বালানি তেল পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই কিনতে হবে। কোনো একক সোর্সের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। জ্বালানি মজুতের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ আছে ৩ মাসের জন্য, পক্ষান্তরে আমাদের দেশে জ্বালানি তেলের রিজার্ভ রয়েছে মাত্র ১ মাসের। এমনটি হলে তো আকস্মিক বিপদ মোকাবিলা করা যাবে না। তাই জ্বালানি তেলের মজুত বাড়াতে হবে।
আমাদের ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টগুলো একবার দেখা উচিত। ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট একটাই হয়েছে বোধহয়, সেটা জাপানের সঙ্গে; চায়নার সঙ্গে সামান্যই হয়েছে। আমাদের আঞ্চলিক দেশগুলো নিয়ে যে ‘সার্ক’ রয়েছে, সেটাও তেমন কিছুই করতে পারেনি। ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিয়ে কথা চলছে। এটা সিরিয়াসলি দেখা উচিত। ভারত এরই মধ্যে বেশ কয়েকটি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করে ফেলেছে। ভিয়েতনামের মতো দেশে তো কয়েক ডজন আছে। শুধু বাংলাদেশে নেই। এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে আইসোলেটেড হয়ে বসে থাকলে তো হবে না। এ বিষয়গুলো ম্যাক্রো ইকোনমিতে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। দেশের কলকারখানা যেগুলো চালুর মতো অবস্থায় রয়েছে, সেগুলো অবশ্যই খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। শুধু ব্যাংকিং সমস্যার কারণে যদি কোনোটি বন্ধ হয়ে থাকে, তবে সেটাকে চিহ্নিত করা উচিত। ওগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি সাসটেইনেবল করা সম্ভব নয়। কারণ, এসব বন্ধ কারখানার মধ্যে আবার দু-তিন রকমের প্রকারভেদ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে কোনোটির লাইসেন্স ফেরত আসবে না। লাইসেন্স ফেরত না এলে সেখানে টাকা দিয়ে লাভ হবে না। ব্যাংক টু ক্লায়েন্ট রিস্যাংশনের ভিত্তিতে সেটেল হতে পারে। সেটাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি মেনেই করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অবজারভেশনে থাকতে হবে। তবে যেসব কারখানা চলবে না, সেগুলোকে জোর করে চালানোর অর্থ হয় না। যাই হোক, যুদ্ধের কারণে যেহেতু একটি ক্রান্তিকাল পার করছে বিশ্ব, সেহেতু আমাদের একটু ভেবেচিন্তেই পা ফেলতে হবে। (অনুলিখন : জাকির হোসেন সরকার)
অধ্যাপক আবু আহমেদ : চেয়ারম্যান, ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)
