বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ : বঞ্চিত মেধাবীদের কী হবে
Advertisement
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে সীমাহীন দুর্নীতি, নৈরাজ্য ও স্বেচ্ছাচারিতা লাগামহীন হয়ে উঠেছিল। দেশের স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো নজিরবিহীন দলীয়করণের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছিল। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি হয়তো কখনো পুষিয়ে নেওয়া যাবে; কিন্তু শিক্ষাক্ষেত্রে যে তুঘলকিকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, তার খেসারত জাতিকে দীর্ঘদিন ভোগ করতে হবে। বলা হয়, একটি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য অ্যাটম বোমার দরকার হয় না, সে জাতির শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস করলেই যথেষ্ট। হাসিনা সরকার দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে কয়েক স্তরে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ও গবেষণা ছাড়াই বারবার কারিকুলাম পরিবর্তন করে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ বিঘ্নিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ফ্যাসিবাদের করাল গ্রাসে ধ্বংসের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল বিগত পনেরো বছরে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। যেমন খুশি তেমন প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। পড়ুয়া, সৃজনশীল ও মেধাবীদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে প্রায় সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাদের প্রধান যোগ্যতা ছিল দলীয় আনুগত্য ও অর্থ লেনদেন। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগগুলো তখন অন্যতম আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছিল। দেশের প্রতিনিধিত্বশীল সব পত্রপত্রিকায় এ বিষয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু তীব্র সমালোচনার মধ্যেও এমন নিয়োগ অব্যাহত রাখা হয়েছিল।
বর্তমান সময়ের আলোচিত কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার (প্রাতিষ্ঠানিক নাম মোহাম্মদ আবুল বাসার) বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগবঞ্চিতদের অন্যতম উদাহরণ। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স উভয় পরীক্ষায় তিনি রেকর্ড মার্কস নিয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। এমফিল ডিগ্রিও সম্পন্ন করেছেন সফলভাবে। এ পর্যন্ত তার ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আছে একটি অনুবাদগ্রন্থ ও একটি সম্পাদিত গ্রন্থ। এ ছাড়া তিনি নিয়মিত সম্পাদনা করছেন শিল্প সাহিত্যের মাসিক পত্রিকা ‘সৃজন’ ও ‘অক্ষৌহিণী’ নামের একটি ছোটকাগজ। এমন একজন সৃজনশীল লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্রকে বাদ দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বহু অযোগ্য প্রার্থীকে। তাকে বাদ দেওয়ার অন্যতম কারণ ছিল ছাত্রলীগের রাজনীতি না করা। তৎকালীন প্রায় সব পত্রিকায় এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১০ সালের ৩ অক্টোবর যুগান্তরের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে স্বজনপ্রীতি-দলীয়করণ’। ওই প্রতিবেদনে আহমেদ বাসারকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাবীদের বাদ দেওয়ার চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল প্রতিবেদনটিতে।
২০১১ সালের ২২ জুলাই আমার দেশ পত্রিকার প্রধান শিরোনাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ : গোপালগঞ্জ কিশোরগঞ্জ ছাত্রলীগই মানদণ্ড।’ ওই প্রতিবেদনেও আহমেদ বাসারকে অবিশ্বাস্যভাবে বঞ্চিত করার সমালোচনা করা হয়। আরও যেসব পত্রপত্রিকা এমন অন্যায় নিয়োগের সমালোচনায় মুখর ছিল, সেগুলোর মধ্যে আছে ‘সাপ্তাহিক ২০০০’, ‘একপক্ষ’ ইত্যাদি। ২০১০ সালের ২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সাপ্তাহিক ২০০০ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল, যেটির শিরোনাম ছিল ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় : মেধার অবমূল্যায়ন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ।’ ওই প্রতিবেদনে আহমেদ বাসারকে বাদ দেওয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে। এত কিছুর পরও অন্যায় নিয়োগ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রশাসন সরে আসেনি। বরং একের পর এক স্বৈরাচারী কায়দায় অযোগ্যদের নিয়োগ দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করেছে। দেশের ছাত্রসমাজ বঞ্চিত হয়েছে মেধাবীদের সেবা থেকে। এর দায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না।
দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সারা দেশ থেকে তুমুল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা পড়ালেখার সুযোগ পান। তারা অবশ্যই সেরা শিক্ষকদের ক্লাস ও সাহচর্য প্রত্যাশা করেন। কিন্তু এসব অন্যায় নিয়োগ শিক্ষার্থীদের সে অধিকার ও সুযোগ থেকে বঞ্চিত করেছে। পুরো জাতি এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আহমেদ বাসারসহ এরকম অন্যায়ভাবে যাদের বঞ্চিত করা হয়েছে, অতি দ্রুত তাদের নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টদের নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান সরকার সততা ও ন্যায়নীতির আলোকে দেশ পরিচালনায় বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশকে যদি আমরা মেধাবীদের অভয়ারণ্য করে তুলতে চাই, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শিক্ষা ও গবেষণার সূতিকাগার করে গড়ে তুলতে হবে। বিগত দুঃশাসনের কালে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ক্ষমতার অপব্যবহার ও সন্ত্রাসের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিল। লেখাপড়া গিয়েছিল নির্বাসনে। ভালো ছাত্ররা হতাশ হয়ে পড়েছিল। ভালো শিক্ষক ও গবেষকরা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল। ফলে দেশ একরকম মেধাশূন্য হয়ে পড়েছিল।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল মূলত মেধার মূল্যায়নের দাবিতেই। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকারও মেধাবী ও যোগ্যদের মূল্যায়নের কথা জোরালোভাবে ঘোষণা করছে। এক্ষেত্রে আওয়ামী শাসনামলের নৈরাজ্যে যারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাদের বিষয়টি বিবেচনা করা অতি জরুরি। তাদের সঙ্গে যে অন্যায় করা হয়েছে, সেই ক্ষতি অপূরণীয়। কিন্তু দেরিতে হলেও তাদের যোগ্যতার মূল্যায়ন করা হলে দেশ ও জাতির জন্য তা অবশ্যই মঙ্গল বয়ে আনবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কিছুটা হলেও দায়মুক্ত হবে। বর্তমান সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে দেশের মৃতপ্রায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রাণসঞ্চার করবে-এ প্রত্যাশা আমাদের সবার।
জুননু রাইন : সহকারী সম্পাদক, যুগান্তর

