Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিষেধাজ্ঞা বনাম ইরান ও রাশিয়ার অর্থনীতি

Advertisement

Icon

সাইফুল খান

প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নিষেধাজ্ঞা বনাম ইরান ও রাশিয়ার অর্থনীতি

Advertisement

ওয়াশিংটন যখন মনে করেছিল, নিষেধাজ্ঞার শিকলে বেঁধে ফেলা হয়েছে তেহরান ও মস্কোকে; তখন এ দুই রাষ্ট্র পর্দার আড়ালে নির্মাণ করে চলেছিল এক ভিন্নতর অর্থনৈতিক স্থাপত্য। ক্রিপ্টোকারেন্সির ডিজিটাল গলিপথ থেকে হাজার বছরের পুরোনো হাওলা নেটওয়ার্ক। এ সমান্তরাল অর্থনীতি আজ শুধু বেঁচে থাকার কৌশল নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি সুচিন্তিত প্রত্যাঘাত।

ইরানের চার দশকের প্রতিরোধ

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ইরান পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি। এ দীর্ঘ চার দশকের অভিজ্ঞতাই ইরানকে করে তুলেছে বিশ্বের সবচেয়ে পরিশীলিত ‘নিষেধাজ্ঞাপ্রতিরোধী অর্থনীতি’র রূপকার। এটি কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য; যার প্রতিটি স্তম্ভ নির্মিত হয়েছে সুচিন্তিতভাবে। সর্বোচ্চ নেতা খামেনিই ২০১০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিরোধ অর্থনীতির নীতিমালা ঘোষণা করেন। এর তিনটি মূল স্তম্ভ ছিল-আত্মনির্ভরতা, বৈচিত্র্য এবং অভিযোজনযোগ্যতা। ইবনে খালদুনের ‘আসাবিয়্যাহ’ তত্ত্বের মতোই এ দর্শন বিশ্বাস করে, বাহ্যিক চাপ একটি জাতিকে ভেতর থেকে আরও সংহত করে তোলে।

গ্যাস থেকে বিটকয়েন

বিশ্বখ্যাত ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান Elliptic-এর গবেষণায় একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে : এক সময় বিশ্বের মোট বিটকয়েন মাইনিংয়ের প্রায় ৪.৫ শতাংশ সম্পন্ন হতো ইরানে। কিন্তু এর পেছনের কৌশলটি আরও বেশি বুদ্ধিদীপ্ত। ইরানের কাছে রয়েছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুত। নিষেধাজ্ঞার কারণে এ গ্যাস সরাসরি রপ্তানি করা যাচ্ছে না। তাই তেহরানের কৌশলবিদরা একটি অসাধারণ সমীকরণ তৈরি করেছেন : প্রাকৃতিক গ্যাস, সস্তা বিদ্যুৎ, বিটকয়েন মাইনিং, আন্তর্জাতিক পণ্য আমদানি। এ পুরো চক্রে কোথাও মার্কিন ব্যাংক বা SWIFT-এর ছায়া পড়ে না। তবে বিশ্লেষকরা একটি সীমাবদ্ধতাও চিহ্নিত করেছেন : বিটকয়েনের অস্থির মূল্যমান এটিকে স্থায়ী রিজার্ভ কারেন্সি হতে দেয় না। এটি মূলত একটি ‘লিকুইডিটি টুল’; বেঁচে থাকার হাতিয়ার, দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ নয়।

হাজার বছরের ‘হাওলা’ পদ্ধতি

ডিজিটাল যুগে ইরান শুধু কেবল অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ওপরই নির্ভর করেনি। হাজার বছরের পুরনো ‘হাওলা’ পদ্ধতিটি আজও তাদের অর্থনৈতিক অস্ত্রাগারের অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র। এ পদ্ধতিতে কোনো অর্থই আসলে সীমান্ত পার হয় না। তেহরানের একজন ব্যবসায়ী স্থানীয় হাওলা ব্রোকারকে রিয়াল দেন। দুবাইয়ে সেই ব্রোকারের অংশীদার পণ্য সরবরাহকারীকে দিরহামে পরিশোধ করেন। পরে দুই ব্রোকার বিভিন্ন পণ্য বা নগদ বিনিময়ের মাধ্যমে নিজেদের হিসাব মেলান। পুরো প্রক্রিয়ায় নেই কোনো ডিজিটাল রেকর্ড, নেই কোনো আন্তর্জাতিক লেনদেন। আন্তর্জাতিক অর্থ পাচার প্রতিরোধ সংস্থা FATF এটিকে তাদের সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হিসাবে স্বীকার করেছে।

তেলের ছায়া রপ্তানি

তেল বিক্রির ক্ষেত্রে ইরান একটি জটিল ছায়া রপ্তানি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। ট্যাংকারের AIS ট্র্যাকার বন্ধ করে সমুদ্রে জাহাজ থেকে জাহাজে তেল স্থানান্তর করা হয়। মালয়েশিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাতে পৌঁছে তেল আবারও লেবেলিং হয়। চীনে বিক্রির পর পাওয়া ইউয়ান দুবাইয়ের মাধ্যমে ফেরত আসে তেহরানে। পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক ব্যাংক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে এড়িয়ে চলে।

বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ও ইরানের বিলিয়ন ডলারের লেনদেন

রয়টার্সের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ Binance-এর মাধ্যমে ইরান বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের লেনদেন সম্পন্ন করেছে। ইরানি ব্যবসায়ীরা ভিপিএন এবং বিদেশি আইপি ব্যবহার করে এ লেনদেনগুলো সারেন। ডলারের সরাসরি নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও এটি তাদের অর্থনীতির জন্য একটি অপরিহার্য ‘সেফটি ভালভ’ হিসাবে কাজ করছে।

‘ডিজিটাল রিয়াল’ ও স্বর্ণনির্ভর ক্রিপ্টো

সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপটি এখনো নির্মাণাধীন। ইরান তার নিজস্ব সিবিডিসি বা ‘ডিজিটাল রিয়াল’ তৈরির পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গে মিলে একটি গোল্ড-ব্যাকড ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরির পরিকল্পনা করছে। প্রতিটি টোকেনের পেছনে থাকবে নির্দিষ্ট পরিমাণ স্বর্ণ। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে চীন, রাশিয়া ও ইরানের মিলিত স্বর্ণ মজুতের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠতে পারে এক বিশাল অর্থনৈতিক ব্লক। যেখানে ডলারের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না। তবে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন : ব্রেটন উডস-পরবর্তী বিশ্বে সফল মুদ্রার জন্য দরকার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা; যা এখনো অনুপস্থিত। চীন নিজে ডলারনির্ভর বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এতটাই নিমজ্জিত যে, সম্পূর্ণ বিচ্ছেদে রাজি নয়। চীনের দুর্বলতার কারণে এ প্রজেক্ট এখনো ধীরগতিতে আছে।

শাহেদ ড্রোন থেকে ফাত্তাহ মিসাইল

ইরানের সামরিক শক্তির পেছনে রয়েছে একটি নির্মম অর্থনৈতিক যুক্তি। শাহেদ-১৩৬ ড্রোনটির উৎপাদন খরচ ২০ থেকে ৫০ হাজার ডলার। কিন্তু এটি মোকাবিলা করতে ব্যবহৃত মার্কিন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ ৩০ লাখ ডলারেরও বেশি। এ অসামঞ্জস্যপূর্ণ খরচের সুবিধাটিই ইরানের সামরিক-অর্থনৈতিক কৌশলের মূল ভিত্তি। এ সামর্থ্যরে পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াজুড়ে শত শত ফ্রন্ট কোম্পানির এক গোপন নেটওয়ার্ক। তিনটি স্তরে কাজ করে এ নেটওয়ার্ক : বৈধ ব্যবসার আড়ালে থাকে প্রথম স্তর, ‘ডুয়াল-ইউজ’ ইলেকট্রনিক্স পণ্য আসে দ্বিতীয় স্তরে, আর সম্পূর্ণ গোপন চ্যানেলে আসে সরাসরি সামরিক যন্ত্রাংশ। এ নেটওয়ার্কের কেন্দ্র হলো দুবাই। যেখানে ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায় এ মধ্যস্থতার আদর্শ পরিবেশ তৈরি করেছে।

একই পথে দুই ভিন্ন গতি

২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়াও একই পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। SWIFT থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মস্কো ইরানের SEPAM-এর অনুকরণে নিজের SPFS সিস্টেম সম্প্রসারিত করছে। তেল ইউরোপের পরিবর্তে এশিয়ায় পাঠাচ্ছে। ২০২৩-২৪ সালে ক্রিপ্টোকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বৈধতা দিয়েছে; কিন্তু এখানেই দুই দেশের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইরান চার দশকের প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এ পথে হেঁটেছে ধীরে, পরিকল্পিতভাবে। রাশিয়া সেই কাঠামো তৈরি করছে তাড়াহুড়ো করে। রাশিয়ার পাইপলাইন অবকাঠামো ইউরোপমুখী। নতুন পাইপলাইন নির্মাণে লাগবে আরও এক-দেড় দশক। তাছাড়া বিশ্বের মোট SWIFT লেনদেনের মাত্র ১ শতাংশ এখন পর্যন্ত বিকল্প ব্যবস্থায় সম্পন্ন হয়।

নিষেধাজ্ঞা কি আদৌ কাজ করে?

এ সমগ্র বিশ্লেষণ একটি প্রশ্নের দিকে ইঙ্গিত করছে। পশ্চিমা কূটনীতির একটি মৌলিক অনুমান হলো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা রাষ্ট্রীয় আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু ইরান ও রাশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, কিছু রাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞাকে ধ্বংসের হাতিয়ার হিসাবে না দেখে রূপান্তরের সুযোগ হিসাবে ব্যবহার করছে। ক্রিপ্টো প্রযুক্তি মূলত নিষেধাজ্ঞাপ্রতিরোধী হওয়ার জন্যই ডিজাইন করা হয়েছিল। হাওলা নেটওয়ার্ক ডিজিটাল সীমার বাইরে। আর চীনের মতো বড় অর্থনীতি যখন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাণিজ্য অব্যাহত রাখে, তখন পশ্চিমা চাপ অনেকাংশেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। বিশ্ব এখন ধীরে ধীরে বহু মেরু আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যেখানে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে। ইরান ও রাশিয়া এ পরিবর্তনের ‘টেস্ট কেস’ হিসাবে কাজ করছে।

উপসংহার

তবে এ সমান্তরাল অর্থনীতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এ ব্যবস্থা বেঁচে থাকার যন্ত্র হিসাবে কাজ করতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি তৈরি করতে পারে না। কারণ উদ্ভাবন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং বিনিয়োগ এ তিনটি জিনিস বৈশ্বিক সংযোগ ছাড়া সম্ভব নয়। ইতিহাস বলে বিচ্ছিন্নতা টিকে থাকার উপায় দিতে পারে; কিন্তু উত্থানের পথ দেয় না। ইরান চার দশকেও তার মূল অর্থনৈতিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারেনি। রাশিয়াও সেই একই পথে হাঁটছে; তবে অনেক বেশি দ্রুতগতিতে এবং অনেক বেশি বাজি ধরে। তবে ইরান বনাম আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধের সমাপ্তি যদি ইরানের শর্ত মেনে হয়, তবে ইরান-রাশিয়ার বিকল্প পদ্ধতি বিশ্বকে অর্থনৈতিক লেনদেনের নতুন পথ দেখাবে; যা ডলারের বিকল্প বিশ্বব্যবস্থা হিসাবে শক্তভাবেই হাজির হবে।

সাইফুল খান : ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিকবিষয়ক বিশ্লেষক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম