বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু : বাংলাদেশ প্রসঙ্গ
Advertisement
তাহমিনা আখতার টফি
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অটিজম, বর্তমানে ‘অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার’ (এএসডি) হিসাবে পরিচিত; একটি বিকাশগত সমস্যা, যা শিশুর মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশ এবং কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং পরিসংখ্যানগত তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে অটিজম আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৭৮ মিলিয়ন। সাম্প্রতিক গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার জনে গড়ে ১৭ জন (বা প্রতি ৫৮৯ জনে একজন) শিশু অটিস্টিক।
বর্তমানে নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের অধীনে ১৪টি চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করছে; কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক সুবিধা প্রদান এবং বিশেষ স্কুলগুলোতে নিয়োজিত শিক্ষকদের ও নিউরো ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী শিশুর পিতামাতাকে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব শিশুর জন্য বিদ্যালয়মুখী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অটিজম শিশুদের চিকিৎসা, থেরাপি এবং শিক্ষাসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধার যথেষ্ট অভাব রয়েছে এবং গ্রামীণ পর্যায়ে একেবারেই অপ্রতুল ও নগণ্য। এ ছাড়া গ্রামীণ পর্যায়ে ল্যাংগুয়েজ থেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি কিংবা ফিজিওথেরাপির প্রচণ্ড অভাব রয়েছে। মেন্টাল অ্যাবিলিটির ওপর লক্ষ রেখে এসব শিশুর জন্য আর্লি এডুকেশনাল প্রোগ্রাম, প্রি-স্কুল এডুকেশন প্রোগ্রাম, স্পেশাল এডুকেশন প্রোগ্রাম এবং ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা উচিত, যা একেবারেই অপর্যাপ্ত রয়েছে। বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা চালুর জন্য বিশেষায়িত ডিগ্রিধারী শিক্ষক প্রয়োজন; কিন্তু বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এ ধরনের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হাতেগোনা ২-৪টি রয়েছে। বেশির ভাগ ‘বিশেষ স্কুলে’ কিছু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক রয়েছে; আনুষ্ঠানিক সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত ডিগ্রিধারী স্বল্পসংখ্যক শিক্ষক রয়েছে। এছাড়া অটিজম শিশুদের জন্য পরিচালিত স্কুলগুলোতে অধিকাংশ শিক্ষক এমপিওভুক্ত নয় এবং এসব শিক্ষক নিয়মিত বেতন পান না। সাধারণ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে এসব শিশুর প্রবেশগম্যতার অধিকার দিলেও বেশির ভাগ স্কুলে অটিজম শিশুদের ভর্তি করতে স্কুল কর্তৃপক্ষ অনীহা প্রকাশ করে। কারণ এসব শিশুর পড়াশোনার জন্য আলাদা বিশেষায়িত শিক্ষক নেই; তাছাড়া অন্যান্য শিশুর সঙ্গে ‘বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশু’ মিশতে পারে না, বরং বুলিংয়ের শিকার হয়ে থাকে।
অটিজমের প্রকৃতি এবং তার কারণ সম্পর্কে এখনো বেশকিছু গবেষণা চলছে, অটিজমের সঠিক কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে বলা যায়, অটিজমের জন্য বিভিন্ন জেনেটিক এবং পরিবেশগত উপাদান দায়ী হতে পারে। কিছু গবেষক মনে করেন, গর্ভাবস্থায় মায়ের স্বাস্থ্য সমস্যা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস না থাকা, ভুল ওষুধ সেবন, চিকিৎসা এবং যত্নের অভাবে শিশুর গর্ভাবস্থায় বিকাশের অসুবিধা হতে পারে।
সাধারণত প্রথম তিন বছরের মধ্যে শিশুর মধ্যে এর লক্ষণ প্রকাশ পায়; তবে এ অবস্থা কখনো কখনো বড় হওয়ার পরও ধরা পড়ে। অটিজমের লক্ষণ প্রতিটি শিশুর আলাদা হয়ে থাকে। কিছু শিশু খুব কম কথা বলে বা কথা বলার ক্ষেত্রেও ত্রুটি থাকে, আবার কিছু শিশুর আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়; যেমন একই কাজ বারবার করা, একঘেয়ে শব্দ বা বাক্য পুনরাবৃত্তি করা। এ ছাড়া সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় সমস্যা, যেমন অন্যদের সঙ্গে কথা না বলা বা চোখের সংযোগ না করা, সাধারণত অটিজমের প্রধান লক্ষণ হিসাবে চিহ্নিত হয়। অনেক অটিজম শিশুর মধ্যে বুদ্ধি প্রতিবন্ধিতা থাকতে পারে বা বহুমাত্রিকতা নিউরো ডেভেলপমেন্টাল সমস্যা থাকতে পারে। এসব শিশুর মাত্রা ভিন্নতা থাকতে পারে।
অটিজম চিহ্নিত করতে আগে দেখা হয় শিশু বা ব্যক্তির চোখে চোখ কম রাখা, নামে সাড়া না দেওয়া, কথা-ইশারায় ভাব প্রকাশে অসুবিধা বা অন্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগে সমস্যা আছে কিনা। এর সঙ্গে একই কাজ বারবার করা, একই রুটিনে জোর দেওয়া, হাত নাড়া/দুলানো বা শব্দ-আলো-স্পর্শে অস্বাভাবিক সংবেদনশীলতা আছে কিনা সেটাও লক্ষ করা হয়। এ ধরনের লক্ষণ ছোটবেলা থেকেই বারবার দেখা গেলে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের মূল্যায়ন জরুরি, কারণ নিশ্চিত চিহ্নিতকরণ পেশাগত পরীক্ষার মাধ্যমেই হয়।
অটিজমের কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা না থাকলেও সঠিক সময়ে থেরাপি এবং চিকিৎসা শুরু করা শিশুর বিকাশে সহায়ক হতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুর জন্য বিভিন্ন ধরনের থেরাপি ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ভাষাগত থেরাপি, আচরণগত থেরাপি, সামাজিক দক্ষতা উন্নয়নমূলক থেরাপি এবং অ্যাকটিভিটিস অব ডেইলি লিভিং (এডিএল)। এ থেরাপিগুলোর মাধ্যমে শিশুর ভাষাগত দক্ষতা বাড়ে, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া শক্তিশালী হয় এবং তাদের একে অপরের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
অটিজমের বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্য অটিজমে আক্রান্ত শিশুর দৈনন্দিন জীবনযাপনকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে। এখানে পিতামাতার দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিশু অটিজমে আক্রান্ত হলে তাদের পিতামাতা প্রথমে তাদের সন্তানকে বুঝতে চেষ্টা করবেন এবং তাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করবেন। পিতামাতার কাজ হলো তাদের বিশেষত্বগুলো চিনে তাদের জন্য উপযুক্ত সহায়তা প্রদান করা। যেমন-তাদের ভাষাগত এবং সামাজিক দক্ষতা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত থেরাপি প্রোগ্রাম তৈরি করা, সামাজিক পরিবেশে তাদের মানিয়ে চলার জন্য সহায়তা করা এবং তাদের নিজস্ব আত্মবিশ্বাস এবং সক্ষমতা গড়ে তোলার সুযোগ প্রদান করা।
শিশুর মানসিক সামর্থ্য এবং দক্ষতা বিবেচনা করে এসব শিশুর বৃত্তিমূলক ও কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। এসব শিশু কোনো একটি বিশেষ বিষয়ে খুবই পারদর্শী হয়ে থাকে; যেমন-কেউ অঙ্কে, কেউ কম্পিউটারে, আবার কেউবা অঙ্কনচিত্রে, আবার কেউ খেলাধুলায়। পিতামাতার এ দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা একদিকে যেমন তাদের সন্তানের উন্নয়নে সহায়ক, তেমনি এটি সমাজে অটিজম নিয়ে যে ভুল ধারণা রয়েছে, তা ভাঙতে সহায়তা করে। তাদের সাহস, ধৈর্য এবং সঠিক দিকনির্দেশনা অটিজম আক্রান্ত শিশুদের জীবনে একটি নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
অন্যদিকে সরকারকে এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু বা এনডিডি শিশুদের জন্য সঠিক মেডিকেল অ্যাসেসমেন্ট, ডায়াগনসিস, দক্ষ জনবল সৃষ্টি, সেবার পর্যাপ্ততা রাখতে হবে। এসব শিশুর জন্য প্রতিটি বিভাগে ন্যূনতম ২০০ জন এনডিডি শিশু থাকতে পারে এমন আবাসন ব্যবস্থা, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা এবং পুনর্বাসনসংবলিত কেন্দ্র চালু করতে হবে। দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে স্নায়বিক বিকাশজনিত সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকল্পে একটি করে বিশেষায়িত ‘হাসপাতাল কর্নার’ স্থাপন করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে এ শিশুদের সঠিক সেবা ও পরিচর্যা প্রদানের লক্ষ্যে প্রতিটি কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ও অভিজ্ঞ জনবল কাঠামো তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
এছাড়া সরকারি উদ্যোগে বিশেষায়িত স্কুলের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার যেহেতু প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ব্যয় ও শিক্ষকদের বেতনভাতা ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে; তাই অনতিবিলম্বে এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য বিশেষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিভাগী পর্যায়ে খুলতে পারে এবং এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সুযোগ দেওয়া দরকার।
সর্বোপরি, অনেক পিতামাতা তাদের এসব বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর জন্য ভবিষ্যতে কার তত্ত্বাবধানে রেখে যাবেন-এ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত। গবেষণালব্ধ তথ্যে দেখা গেছে, অনেক মা-বাবা তাদের সন্তানের সম্পত্তির মালিকানা রাষ্ট্রের হাতে দিতে চায়; এ কারণে যাতে তাদের মৃত্যুর পর সেই সম্পত্তির মাধ্যমে তাদের সন্তানদের সেবা যথাযথ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন করা হয়। সরকার বিভিন্ন বেসরকারি এতিমখানায় বার্ষিক অনুদান দিয়ে থাকে; আবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এতিম, দুস্থ-অসহায় শিশুদের জন্য সরকারি শিশু সদন কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। আর এরাও শিশু, বরং অত্যন্ত স্পর্শকাতর, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যারা তাদের অধিকারের কথা বলতে পারে না, মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে না, বৈষম্য বঞ্চনা আর অপাংক্তেয় হয়ে যাদের বেঁচে থাকতে হয়-তাদের জন্য বর্তমান জনবান্ধব সরকার কিছু করবে এবং একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে-এটাই বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসের প্রত্যাশা।
অধ্যাপক তাহমিনা আখতার টফি : গবেষক ও লেখক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
