শতফুল ফুটতে দাও
মানব পাচার রোধ করা কি একেবারেই অসম্ভব
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জার্মান কবি ও নাট্যকার বেরটোল্ট ব্রেশ্ট তার ‘Questions From A Worker Who Reads’ কবিতায় লিখেছেন,
কে সাত দরজার থিবিস নির্মাণ করেছেন?
বই থেকে তুমি জানবে রাজাদের নাম।
রাজারা কি পাথরের চাকতি জড়ো করেছেন?
এবং ব্যাবিলন বহুবার ধূলিসাৎ হয়েছিল
কে এটাকে এতবার পুনর্নির্মাণ করেছে?
কোন ভবনে সোনায় চক্চক্ করা লিমায় নির্মাণকারীরা বাস করত?
যে সন্ধ্যায় চীনের প্রাচীর নির্মাণ শেষ হয়েছিল
তখন কোথায় রাজমিস্ত্রিরা গিয়েছিল?
মহান রোম যেটি বিজয় সূচক তোরণে পরিপূর্ণ।
তা কারা নির্মাণ করেছিল?
কাদের ওপর সিজারদের বিজয় হয়েছিল?
গানে গানে প্রশংসিত বাইজেনটিয়াম কি কেবল
তার বসবাসকারীদের প্রাসাদের জন্যই?
এমনকি রূপকথার আটলান্টিসে যে রাতে
সমুদ্র এটিকে উদরগ্রস্ত করল
সেদিনও ডুবে যাওয়া কি তার দাসদের জন্য
ক্রন্দন করেছিল?
তরুণ আলেকজান্ডার ভারত জয় করেছিলেন।
তিনি কি একা ছিলেন?
সিজার গল্দের পরাস্ত করেছিলেন
তার সঙ্গে কি একজন রন্ধনকারীও ছিল না?
স্পেনের ফিলিপ তার নৌবাহিনী ডুবে যাওয়ার পর কেঁদেছিলেন।
তিনি কি একাই কেঁদেছিলেন?
সপ্তম ফেডারিক সাত বছরের যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন।
আর কে জয়লাভ করেছিল?
বিজয়ে প্রতিটি পাতা।
কারা বিজয়ীদের জন্য ভোজের রান্না করেছিল?
প্রতি দশ বছরে একজন মহান মানুষ।
কে বিল পরিশোধ করেছিল?
এত এত প্রতিবেদন।
এতসব প্রশ্ন।
১৯৫৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভ এবং প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই বুলগেনিন ঐতিহাসিক ভারত সফর করেন। এ সফর ভারত-সোভিয়েত সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে, যার ফলে ভিলাই স্টিল প্ল্যান্ট ও আইআইটি বোম্বের মতো প্রকল্প শুরু হয়। এ সফরে ক্রুশ্চেভ ও বুলগেনিন ভারতজুড়ে, বিশেষ করে কলকাতায় বিপুল সংবর্ধনা পান।
ভারত সফরের সময় নিকিতা ক্রুশ্চেভ আগ্রার তাজমহল দেখতে যান। সাংবাদিকরা তার অনুভূতি কী জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে ক্রুশ্চেভ বলেছিলেন, তাজমহলের প্রতিটি পাথরের পরতে পরতে রয়েছে শ্রমিকের রক্ত ও ঘাম। পৃথিবীর যা কিছু মহান সৃষ্টি, তার বেশির ভাগই কোনো রাজাধিরাজ অথবা প্রবল ক্ষমতাধরের নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, যারা এ বিশাল সৌধ, সুরম্য অট্টালিকা অথবা বিশাল স্থাপনা নিজ দেহের ঘাম, রক্ত ও মেহনত দিয়ে তৈরি করেছিলেন, তাদের নাম কখনো ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে না। সেজন্যই বেরটোল্ট ব্রেশ্ট প্রশ্ন তুলেছেন, চীনের মহাপ্রাচীর যে সন্ধ্যায় নির্মাণ শেষ হয়েছিল, সেই সন্ধ্যায় এর রাজমিস্ত্রিরা কোথায় গেছেন?
বর্তমান বিশ্বে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে সম্পদশালী, শক্তিশালী ও ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। কিন্তু এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরতে পরতে নিহিত আছে আফ্রিকার কালো মানুষদের দাস হিসাবে ব্যবহারের কাহিনি। অ্যালেক্স হ্যালির ‘Roots’ বইটি যারা পড়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রে দাসপ্রথার ইতিবৃত্ত সম্পর্কে সম্যক অভিহিত আছেন। এছাড়া স্কুল জীবনে যারা ‘Uncle Tom's Cabin’ গল্পটি পড়েছেন, তারাও কম-বেশি দাসপ্রথা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন। এ পৃথিবীতে এক সময় দাসব্যবস্থা ছিল। এ উৎপাদন ব্যবস্থায় একদিকে ছিল দাস প্রভু এবং অন্যদিকে ছিল দাস শ্রমিক। দাস যুগের অমর কাহিনি হলো স্পার্টাকাসের বিদ্রোহ। বিদ্রোহে স্পার্টাকাসের পরাজয় হলেও পরবর্তী সময়ে দাসব্যবস্থাকে প্রতিরোধ করার জন্য হাজারও স্পার্টাকাসের জন্ম হয়েছিল। আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বের ভিত্তিমূলে রয়েছে দাস ব্যবসা। দাস ব্যবসার লাভের অঙ্ক থেকেই তৈরি হয়েছে আধুনিক পুঁজিবাদী সভ্যতার ইমারত। এখন দাস শ্রমিক নেই, কিন্তু আছে মজুরি শ্রমিক।
আধুনিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় এক দেশের কর্মজীবী মানুষ অন্য দূর দেশে শ্রমজীবী বা কর্মজীবী হিসাবে কাজ করেন, শুধু কোনোক্রমে বেঁচে থাকার জন্য। এক দেশ থেকে অন্য দেশে গিয়ে কাজ করার প্রক্রিয়ায় শ্রমজীবী মানুষগুলো দাসযুগের মতোই নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর শ্রমবাজারে প্রবেশ করে ২৫ লাখ মানুষ। কিন্তু দেশীয় বাজারে এদের শ্রম আত্মস্থ করার মতো সুযোগ নেই। দেশে প্রয়োজনমতো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না বলে দুস্তর প্রান্তর, মরুভূমি, শ্বাপদসংকুল বন-জঙ্গল এবং সমুদ্র পাড়ি দিয়ে সোনার হরিণের আশায় সোনার দেশে পৌঁছাতে অকাতরে জীবন ও সম্পদ হারাচ্ছেন শত শত মানুষ। এদের ট্র্যাজিক কাহিনি পড়লে চোখ দুটো অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু এতে ওদের ট্র্যাজেডি বিন্দুমাত্র লাঘব হয় না। এসব দুর্ভাগা মানুষের কষ্ট ও মৃত্যুর লক্ষণীয় কোনো বিচার হয়েছে বলে আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি।
একটি দৈনিকের শিরোনাম-‘মানুষ মরে, বিচার হয় না, পাচার থামে না।’ ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হওয়া মানব পাচারসংক্রান্ত ৪ হাজার ৪২৭ মামলার পরিসংখ্যান বলছে, ৯৪-৯৫ শতাংশ আসামি খালাস পেয়ে যান। পত্রিকার প্রতিবেদক ঢাকা থেকে লিখেছেন, ‘কথা ছিল সমুদ্রপথে ইতালি নেওয়া হবে। তবে পটুয়াখালীর দেলোয়ার হোসেনকে পাঠানো হয়েছিল লিবিয়ায়। সেখানে তার স্থান হয় কারাগারে। বহুদিন কারাগারে কাটানোর পর গত সপ্তাহে দেশে ফেরেন তিনি।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার কাউয়ার চরে ৩১ জানুয়ারি কথা হয়েছিল দেলোয়ার হোসেনের মা মোসাম্মত সুফিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সমিতি ও পরিচিতদের থেকে সুদে ৫ লাখ টাহা নিয়া পোলারে বিদেশে পাডাইছি (পাঠিয়েছি)। পোলা বিপদে পড়ছে। লোনের টাহাও দিতে পারতেছি না।’
কাজের খোঁজে বিদেশে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশি তরুণরা দেলোয়ারের মতো দালালের হাতে টাকা তুলে দিচ্ছেন। দালালরা তাদের বিদেশে নেওয়ার কথা বলে অনেক ক্ষেত্রে ঠেলে দিচ্ছেন অনাহারে মৃত্যুর মুখে। কেউ কেউ বিভিন্ন দেশে পৌঁছাতে পারছেন, তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় অনেককে কারাগারে অমানবিক অবস্থায় থাকতে হচ্ছে। কখনো কখনো পথে অপহরণ করে নির্যাতনের মাধ্যমে পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে মুক্তিপণ। জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মানব পাচার এখন বিস্তৃত হয়ে একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে। এর শিকার হয়ে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন সমুদ্রপথে। এর সর্বশেষ উদাহরণ লিবিয়া থেকে গ্রিসে যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকা অন্তত ২২ অভিবাসীর মৃত্যু অথবা নিখোঁজের ঘটনা, যার মধ্যে ২০ জনই বাংলাদেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২৬ মার্চ গ্রিসের উপকূলে অভিযানে ৪৮ আরোহীর মধ্যে মাত্র ২৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। বাকি ২২ জনের খোঁজ পাওয়া যায়নি।
এবার ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের অনেকেই শুধু খাদ্যের অভাব নয়, তৃষ্ণা মেটানোর জন্য সুপেয় পানির অভাবে মৃত্যুবরণ করেছেন। যে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে তারা ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিচ্ছিলেন, তার চারদিকে ছিল অথৈ জলসমুদ্র। কিন্তু এক ফোটা পানিও পান করার মতো ছিল না। সমুদ্রের পানি তো পান করা যায় না। যারা মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের মৃতদেহ দুদিন ধরে নৌযানেই পড়ে ছিল। কিন্তু তারপর লাশ থেকে দুর্গন্ধ নিঃসৃত হতে থাকলে লাশগুলো সমুদ্রে নিক্ষেপ করা হয়। পিতা-মাতাসহ আপনজন কেউ জানবে না সমুদ্রের কোন গহীনে হারিয়ে গেছে তাদের প্রিয় মানুষটি। এর চেয়ে বেদনাদায়ক ট্র্যাজেডি আর কী হতে পারে!
শুধু ভূমধ্যসাগর পাড়ের দেশ ইতালি বা গ্রিস নয়, অস্ট্রেলিয়া বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নেওয়ার জন্য পাচারকারীরা ভাগ্যান্বেষণে বের হয়ে পড়া মানুষগুলোর সঙ্গে অমানুষের মতো ব্যবহার করে এবং অনেকেরই গন্তব্যস্থলে যাওয়া সম্ভব হয় না। গহিন অরণ্যে অনেকেরই মৃত্যু ঘটে।
মানব পাচার আধুনিক পুঁজিবাদের এক অভিশাপ। মানব পাচারের বিরুদ্ধে দেশে দেশে কঠিন আইন আছে। কিন্তু পাচার থামছে না। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তুলে নিয়ে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রে। মাদুরোর বিরুদ্ধে অভিযোগ-তিনি মাদক পাচারের জন্য দায়ী। কিন্তু মাদক পাচার থামেনি। এখন পাচার হচ্ছে ভেনিজুয়েলার তেল। ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের অতি সাম্প্রতিক মন্তব্য হলো, আমেরিকা ইরানের তেল সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ চায়। পৃথিবীতে মানব পাচার ও মাদক পাচার অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। দরিদ্র বাংলাদেশের কর্মহীন যুবকরা পিতা-মাতার সুদে ধার করা লাখ লাখ টাকা দালালের হাতে সঁপে দিয়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণভাবে বিদেশের মাটিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। অনেকেই মৃত্যুঝুঁকিতে পড়ছেন। প্রশ্ন হলো, লাখ লাখ টাকা দালালকে দেওয়া যায়, কিন্তু সে টাকা দিয়ে কোনো ব্যবসা বা উদ্যোগ গড়ে তোলা যায় না কেন? আসলে সোনার হরিণ খোঁজার এক অদ্ভুত মানসিকতা এ দেশের তরুণদের অনেককে পেয়ে বসেছে। তাদের এই মনস্তত্ত্বে পরিবর্তন আসবে তেমন সমাজ গড়ে উঠছে না কেন? দেশে দৈনন্দিন যারা সরকার চালায়, তারা কেন মানব পাচারকে অসম্ভব করে তুলতে পারছে না? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে পাচারকারীদের অনেকের পরিচয় জানা আছে। তবুও তাদের কঠোরভাবে দমনের উদ্যোগ নেই কেন? তাহলে কি ধরে নেব মানব পাচার বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার একটি হাতিয়ার?
ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

