সভ্যতা ধ্বংসের ভয়ংকর বিপর্যয় থেকে বেঁচে গেল বিশ্ব
মোবায়েদুর রহমান
প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অবশেষে বিশ্ব হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। এক মস্তিষ্কবিকৃত বিকল মনের উন্মাদ প্রেসিডেন্টের সভ্যতা ধ্বংস করার আসন্ন বিপর্যয় থেকে পৃথিবী বাঁচল। সমগ্র বিষয়টি এমন অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে ঘটে গেল, যা কল্পনাকেও হার মানায়। আমাকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছেন, আমেরিকার ৩৩ কোটি মানুষ কি বুদ্ধিবৃত্তিক দেউলিয়াত্বে ভুগছে? না হলে এমন মেন্টালি ডিরেঞ্জড ব্যক্তিকে তারা প্রেসিডেন্ট বানায় কীভাবে? মঙ্গলবার সন্ধ্যায় যখন কম্পিউটারে দেখলাম, পরদিন অর্থাৎ বুধবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টায় ইরানে কেয়ামত নেমে আসবে, তখন সত্যি কথা বলতে কী, আমি শান্তিতে ঘুমাতে পারিনি। এক মুহূর্তে সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে কীভাবে? অসংখ্য জঙ্গিবিমান দিয়ে হামলা করে, অসংখ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করে একটি দেশের ভাইটাল ইনস্টলেশনগুলো ধ্বংস করা যায়; কিন্তু তাই বলে সেগুলো করে সভ্যতা ধ্বংস করা যায় না। এ অবস্থায় কয়েকটি বিদেশি টিভি চ্যানেলের সংবাদের সূত্র ধরে বাংলাদেশের একটি জাতীয় দৈনিক আশঙ্কা প্রকাশ করে অনলাইনে খবর দেয় যে, আমেরিকা সম্ভবত তাদের সময় রাত ৮টা এবং বাংলাদেশ সময় পরদিন সকাল ৬টায় ইরানে পারমাণবিক বোমা ফেলবে। যারা এ বিষয়টি নিয়ে একটু পড়াশোনা করেছেন, তারা জানেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থামানোর জন্য আমেরিকা জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকির ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এ দুটি অ্যাটম বোমায় লাখ লাখ মানুষ নিহত হন, অসংখ্য মানুষ পঙ্গু হন এবং অসংখ্য স্ট্রাকচার ধূলিসাৎ হয়। এ ছাড়া আণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তায় আজও অনেকে সেখানে ভুগছেন। এখনকার যে কোনো দেশের যে কোনো অ্যাটম বোমা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ফেলা বোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই ইরানে যদি দু-তিনটি বোমা ফেলা হয়, তাহলে সেই দেশটি বিরান হয়ে যাবে। সেই চিন্তা করেই রাতে আমার ঘুমটি শান্তিময় ছিল না।
পরদিন সকালে ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট ব্রাউজ করি। দেখি, পাকিস্তানের প্রধান সেনাপতি (সেনাপ্রধান কেন বললাম না, সেটা পরে বলছি) ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার সারা রাত ধরে টেলিফোনে ব্যস্ত সময় পার করেছেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রটোকল মোতাবেক কথা বলেন আরেক প্রেসিডেন্ট। সেনাপ্রধান বা প্রধান সেনাপতি প্রটোকলে প্রেসিডেন্টের অনেক নিচে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প এক্ষেত্রে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স মানেননি। পাকিস্তানের জঙ্গিবিমান ভারতের রাফাল বিমানকে ভূপাতিত করার পর থেকেই অসিম মুনির ডোনাল্ড ট্রাম্পের চোখে একজন হিরো হয়ে যান। তিনি জেনারেল অসিম মুনিরকে দাওয়াত করেন। তার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কথা বলার সময় নির্ধারিত ছিল এক ঘণ্টা; কিন্তু ট্রাম্প তাকে এতই পছন্দ করতে শুরু করেন যে, এক ঘণ্টা পার হয়ে যায়। এর ফাঁকে তারা মধ্যাহ্নভোজ সারেন। তারপর আবার কথা বলেন। এভাবে দুই ঘণ্টা পার হয়ে যায়। অতঃপর অসিম মুনির প্রেসিডেন্টের কক্ষ থেকে নিষ্ক্রান্ত হন।
এর মধ্যে জেনারেল অসিম মুনিরের প্রমোশন হয়। তিনি হন ফিল্ড মার্শাল এবং সশস্ত্র বাহিনীগুলোর প্রধান সেনাপতি। অর্থাৎ সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী তার অধীনে চলে আসে। এজন্য পাকিস্তানের পার্লামেন্টে একটি আইনও পাশ হয়। এরপর আবার দ্বিতীয় দফা ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরকে ডাকেন এবং লম্বা কথা বলেন।
২.
সবাই মনেপ্রাণে ফিল করছিলেন, ইরানে মার্কিন ও ইহুদি আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। কিন্তু বিড়ালের গলায় কেউ ঘণ্টা বাঁধতে উদ্যোগী ছিল না। এখনকার বিশ্বব্যবস্থায় প্রধান মোড়ল আমেরিকা। তারপর অর্থনৈতিকভাবে চীন। তারপর সামরিক ও প্রযুক্তিগতভাবে রাশিয়া। কিন্তু এ দুটি দেশের কেউই ইরানের এ ভয়াবহ বিপদে কিছু গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের সাহায্য ছাড়া আর কোনো সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন না।
এমন পটভূমিতে ইরানের অভিন্ন প্রতিবেশী এবং মুসলিম ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ পাকিস্তান এগিয়ে আসে। প্রথমে তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান ও মিসর কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা করে। কিন্তু সেই আলোচনা নিষ্ফল হওয়ায় ২৯ মার্চ পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এ চারটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বৈঠক করেন। সেই বৈঠকও ব্যর্থ হয়। তখন থেকে পর্দার অন্তরালে পাকিস্তান একাই আমেরিকা ও ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ থামানোর জন্য দূতিয়ালি করেছে। অবশেষে ৭ এপ্রিল এ দূতিয়ালি সফল হয়।
একটু আগেই বলেছি, ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনির সারা রাত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেন। ম্যারাথন আলোচনা সন্তোষজনক হয় এবং ট্রাম্প নরম হন। তিনি এ ব্যাপারে ইরানের মতামত জানতে চান। তখন রাত সাড়ে ৪টায় ইরানের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অসিম মুনির নন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ কথা বলেন। ইরানের প্রেসিডেন্ট কয়েক মিনিটের সময় চান। এ সময়ে তিনি ইরানের সুপ্রিম লিডার মোজতবা খামেনির সঙ্গে কথা বলেন। মোজতবা খামেনি গ্রিন সিগন্যাল দিলে সেটি প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফকে জানানো হয়। অতঃপর আমেরিকা ও ইরান ১৫ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়।
এ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ লেখেন, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট শর্তে ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রাখা হবে এবং এটি হবে ‘দুই পক্ষের যুদ্ধবিরতি’। অন্যদিকে, ‘মধ্যপ্রাচ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল অসিম মুনিরকে ‘আমার প্রিয় ভাই’ সম্বোধন করে ‘অক্লান্ত পরিশ্রম’র জন্য তাদের গভীর কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। শেহবাজ শরিফ এ দূরদর্শী পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ খবরটি দিয়েছে ভারতের বিখ্যাত টিভি চ্যানেল এনডিটিভি।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ চেয়েছিলেন, যুদ্ধবিরতি আরও ১৫ দিন বৃদ্ধি করা হোক। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার আর প্রয়োজন হবে না। বরং পাকিস্তানের এ চৌকশ ও সফল দূতিয়ালিতে যারপরনাই সন্তুষ্ট হয়ে স্থায়ী শান্তির জন্য আজ (শুক্রবার) ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে আমেরিকা ও ইরানের প্রতিনিধিরা পাকিস্তানসহ এক বৈঠকে মিলিত হচ্ছেন। এ বৈঠকে মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন সে দেশের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির স্পিকার বাঘের ঘালিবাফের।
৩.
ইরান এ অসম যুদ্ধে যে অদম্য সাহস দেখিয়েছে, জান ও মালের বিপুল ক্ষতি সত্ত্বেও যে দৃঢ় মনোবল নিয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে গেছে, সে কথা স্বীকার করেও বলতে হচ্ছে, এ যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। কারণ ট্রাম্পের মতো মানুষ যে কখন কী করে বসেন, সেটি সম্ভবত স্বয়ং ট্রাম্প ছাড়া আর কেউ জানেন না। আসলে খোদ মার্কিনিরাই বলছেন, ইসরাইল বিশেষ করে নেতানিয়াহুর প্ররোচনায় ট্রাম্প এ আগ্রাসনে আমেরিকাকে নামিয়েছিলেন। আগ্রাসনের জন্য তাদের কোনোরূপ পরিকল্পনা বা প্রস্তুতি ছিল না। তাদের ধারণা ছিল, সপ্তাহখানেকের মধ্যে ইরানকে সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত করা হবে। কী অবাক ব্যাপার, যুদ্ধের মধ্যেও তারা সপ্তাহান্তে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার কথা বলেন।
মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত না হলে কেউ যুদ্ধকে সপ্তাহান্তে ক্যাম্পিংয়ে যাওয়ার এক্সকারশনের সঙ্গে তুলনা করতে পারে? শত্রুকে হত্যা করাকে ‘ফান’ হিসাবে উল্লেখ করতে পারে? কেউ কি বলতে পারে, ইরান নিজেই একটি বালিকা বিদ্যালয়ে টোমাহক ব্যবহার করে ১৭০ শিশুকে হত্যা করেছে? অথচ মার্কিনিদের হাতে ছাড়া ইরানের কাছে টোমাহক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ঘটনাটি হৃদয়বিদারক, কিন্তু তিনি শুধু মিথ্যা বলে ক্ষান্ত নন, শিশুদের অকালমৃত্যুতে বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজন মনে করেননি।
পত্রিকান্তরে লেখা হয়েছে, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম নামের এক কঠিন রোগে ভুগছেন। হিটলারেরও একই ধরনের রোগ ছিল। ম্যালিগন্যান্ট নার্সিসিজম হলো নার্সিসিজমের একটি গুরুতর রূপ, যা অসামাজিক আচরণ, স্যাডিজম (অন্যকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পাওয়া) এবং প্যারানয়ার (অতিরিক্ত সন্দেহপ্রবণতা) সঙ্গে মিলিত হয়। এর প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ও অধিকারের প্রতি চরম বিশ্বাস, সহানুভূতির অভাব, কৌশলী ও প্রভাব বিস্তারকারী আচরণ, অন্যের কষ্টে আনন্দ পাওয়া এবং তীব্র প্রতিশোধপরায়ণ সন্দেহপ্রবণতা। ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা প্রায়ই চরম আক্রমণাত্মক ও নির্মম আচরণ করে।
আমেরিকার এমন একটি অস্থির চিত্ততার মধ্যে এ যুদ্ধবিরতি ইরানের জন্য অবশ্যই মঙ্গলদায়ক। আর ইরানের জন্য এটি বিজয় এ কারণে যে, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের মালিকানা ১০ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে মেনে নেওয়া হয়েছে। এর ইতিবাচক দিক হলো, সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইরান পরাশক্তি না হলেও হরমুজ প্রণালি তার হাতে থাকায় বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চাবিকাঠি এখন ইরানের হাতে রয়েছে বলে পরোক্ষভাবে বিশ্বস্বীকৃতি মিলল।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তথা পাকিস্তানকে ভাই বলে সম্বোধন করেছেন। এটি পাকিস্তান তথা ওই অঞ্চলের জন্য স্বস্তিদায়ক। ইতোমধ্যেই ভারতের উসকানিতে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে অশান্তি লেগে আছে। এর পরিণতিতে আফগানিস্তানের সঙ্গে পাকিস্তানের সশস্ত্র সংঘর্ষও হয়েছে। ওদিকে ভারতের প্রশ্রয়ে ও প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বেলুচ লিবারেশন আর্মি গঠন করে বেলুচিস্তানকে পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র করেই যাচ্ছে ভারত। দেশের দুই সীমান্তে অশান্তি। সেখানে যদি ইরান সীমান্তেও অশান্তি থাকত, তাহলে সেটি ইরান ও পাকিস্তান উভয়ের জন্যই বিড়ম্বনার কারণ হতো।
ইরানের এ ভয়ংকর দুঃসময়ে যেভাবে পাকিস্তান তার পাশে দাঁড়িয়েছে, তার ফলে নিকট ভবিষ্যতে পাকিস্তান ও ইরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। এ ঘনিষ্ঠতা ইরানকে পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনে সাহায্য করবে। শোনা যায়, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণে সক্ষম হয়েছে পাকিস্তানের সহযোগিতায়। চীনেরও সহযোগিতা ছিল। এখন পাক-ইরান সহযোগিতা এ এলাকায় নতুন সমীকরণ সৃষ্টি করতে পারে।
মোবায়েদুর রহমান : সিনিয়র সাংবাদিক
journalist15@gmail.com
