নারী অনুপস্থিত নয়, তবে তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ
Advertisement
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা
প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
ঢাকায় একজন নারী জেলা প্রশাসক নিয়োগ-এ ঘটনাটি অনেকের কাছে অগ্রগতির প্রতীক হিসাবে প্রতিভাত হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রে একজন নারীর উপস্থিতি নিঃসন্দেহে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের শক্তিশালী চিত্র। তবে এ দৃশ্যমানতা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে, এ অন্তর্ভুক্তি কি কাঠামোগত রূপান্তরের সূচক, নাকি এটি কেবল প্রতীকী উপস্থিতির সম্প্রসারণ?
এ প্রশ্নটি নতুন নয়। বাংলাদেশের সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের বিতর্ক বিদ্যমান। এ ব্যবস্থা নারীর সংখ্যাগত প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি করেছে; কিন্তু তা কি কার্যকর রাজনৈতিক ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে? নাকি এটি এমন এক প্রতিনিধিত্ব, যা দৃশ্যমান হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে সীমিত প্রভাব ফেলে? প্রশাসনে নারী জেলা প্রশাসকের নিয়োগ এবং সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের বাস্তবতা-উভয় ক্ষেত্রেই একই কাঠামোগত দ্বন্দ্ব কাজ করে: সংখ্যায় উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও ক্ষমতার বণ্টন অপরিবর্তিত থাকে।
এ দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ। খালেদা জিয়ার শাসনামল (১৯৯১-১৯৯৬; ২০০১-২০০৬) একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। সে সময়ে সিভিল সার্ভিসে নারীর অংশগ্রহণ ছিল প্রায় ১১ শতাংশ, যা প্রশাসনিক পদে নেমে আসে প্রায় ৮.১৯ শতাংশে। উচ্চ প্রশাসনিক পর্যায়ে পরিস্থিতি আরও সীমিত ছিল-১৯৯৪ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে মাত্র দুজন নারী যুগ্ম সচিব এবং আটজন উপসচিব ছিলেন; সচিব পর্যায়ে নারীর উপস্থিতি প্রায় দুই শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ, রাষ্ট্রের শীর্ষে নারী নেতৃত্ব থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনিক কাঠামো পুরুষপ্রধানই থেকে গেছে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সিভিল সার্ভিসে নারীর উপস্থিতি ২০ শতাংশের বেশি হয়েছে এবং মাঠ প্রশাসনেও নারীদের প্রবেশ বেড়েছে। কিন্তু এ অগ্রগতি মূলত নিম্ন ও মধ্যপর্যায়ে সীমাবদ্ধ থেকেছে। যেখানে প্রকৃত নীতিনির্ধারণী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত-সেই উচ্চ প্রশাসনিক স্তরে নারীর উপস্থিতি এখনো এক অঙ্কের মধ্যে আবদ্ধ। ফলে একটি স্পষ্ট দ্বৈত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে: অন্তর্ভুক্তির সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার কেন্দ্রে স্থবিরতা।
বর্তমান সময়েও এ প্রবণতা অব্যাহত। সিভিল সার্ভিসে নারীর অংশগ্রহণ ২০ শতাংশের বেশি হলেও প্রশাসনিক ক্যাডারে তা ১০-১৪ শতাংশ; যুগ্ম সচিব পর্যায়ে প্রায় সাত শতাংশ; এবং সচিব পর্যায়ে এখনো এক অঙ্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ, নারীরা কাঠামোতে প্রবেশ করছে, কিন্তু কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় পৌঁছাতে পারছে না।
২০২৬ সালের নির্বাচন-পরবর্তী প্রেক্ষাপট এ বৈষম্যকে আরও তীক্ষ্ণ করে তোলে। নারী প্রার্থী ছিল প্রায় চার শতাংশ, এবং সরাসরি নির্বাচিত নারী সংসদ-সদস্য মাত্র সাতজন। প্রশাসনিক কাঠামোতেও একই প্রবণতা লক্ষণীয়-৭৯টি শীর্ষ পদের মধ্যে প্রায় ১২টি নারীদের দখলে (১৫ শতাংশ), এবং ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ১৫ জন নারী জেলা প্রশাসক (২৩ শতাংশ)। গুরুত্বপূর্ণভাবে, এ সংখ্যাগুলো পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে, যা অগ্রগতির ধারাবাহিকতার অভাব নির্দেশ করে।
২০২৬ সালের সংসদীয় বাস্তবতায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ বৈপরীত্য লক্ষ করা যায়। সংরক্ষিত নারী আসন-যা মূলত নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি-তার বণ্টন ও মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় নারী নিজেই অনুপস্থিত। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো; যেমন-বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (এবং একই প্রবণতা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য), সংরক্ষিত নারী আসনের প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী পর্যায়ে মূলত পুরুষ সদস্যদেরই প্রাধান্য ছিল। অর্থাৎ, যে কাঠামো নারীর রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কথা, সেই কাঠামোর নিয়ন্ত্রণই পুরুষপ্রধান রয়ে গেছে।
এ বাস্তবতা একটি গভীর কাঠামোগত সমস্যাকে নির্দেশ করে: এখানে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে, কিন্তু প্রতিনিধিত্বের প্রক্রিয়াটি নিজেই লিঙ্গ-অসমতাপূর্ণ। ফলে নারীরা সংসদে প্রবেশ করলেও তাদের নির্বাচনের শর্ত, অবস্থান এবং রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন পূর্বনির্ধারিত ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এটি বর্ণনামূলক প্রতিনিধিত্বের একটি ক্লাসিক উদাহরণ, যেখানে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেলেও ক্ষমতার উৎস ও নিয়ন্ত্রণ অপরিবর্তিত থাকে। সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন এ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাকে আরও স্পষ্ট করে। এ ব্যবস্থায় নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও তাদের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন সীমিত থাকে; কারণ তারা সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে নয়, বরং দলীয় মনোনয়নের মাধ্যমে সংসদে প্রবেশ করেন। ফলে তাদের ভূমিকা প্রায়ই নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
এ বাস্তবতা বর্ণনামূলক প্রতিনিধিত্ব (descriptive representation) এবং কার্যকর প্রতিনিধিত্ব (substantive representation)-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যকে সামনে আনে। প্রথমটি উপস্থিতি নিশ্চিত করে; দ্বিতীয়টি নিশ্চিত করে ক্ষমতা, প্রভাব এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের অধিকার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রথমটির কিছু অগ্রগতি থাকলেও দ্বিতীয়টি কাঠামোগতভাবে সীমাবদ্ধ।
এ সীমাবদ্ধতাকে আরও গভীরভাবে বোঝার জন্য feminist institutionalism একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো প্রদান করে। এ দৃষ্টিভঙ্গি দেখায় যে, প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নিয়ম ও নীতির সমষ্টি নয়; এগুলো লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্ক দ্বারা গঠিত। ফলে আনুষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি বাড়লেও অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, নিয়ম এবং সাংগঠনিক সংস্কৃতি নারীর অগ্রগতিকে সীমিত করে। একইভাবে, state theory নির্দেশ করে যে রাষ্ট্র একটি নিরপেক্ষ সত্তা নয়; বরং এটি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত ক্ষমতার একটি ক্ষেত্র, যেখানে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রাধান্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পুনরুৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক বাস্তবতা এ দুই তাত্ত্বিক অবস্থানকে প্রতিফলিত করে।
প্রশাসন কোনো নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত ক্ষমতার কাঠামো। এর নিয়ম, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি এবং অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন ধরে পুরুষপ্রধান বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। ফলে নারীরা এ কাঠামোতে প্রবেশ করলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথে একটি অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা কাজ করে, যা ‘কাচের ছাদ’ হিসাবে পরিচিত।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এ বিশ্লেষণকে আরও স্পষ্ট করে। রুয়ান্ডায় সাংবিধানিক কোটা নারীর অংশগ্রহণকে কাঠামোগতভাবে বৃদ্ধি করেছে, তবে এর কার্যকারিতা এসেছে কোটা বাস্তবায়নের বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা থেকে। সুইডেনে লিঙ্গ-সমতা নীতি কেবল আইনি নয়, দলীয় কাঠামো ও নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংহত হয়েছে। ফলে প্রতিনিধিত্ব কার্যকর ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়েছে। ভারতে স্থানীয় পর্যায়ে সংরক্ষণ নারীদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সামাজিকীকরণ তৈরি করেছে; যা দীর্ঘমেয়াদে উচ্চপর্যায়ের নেতৃত্ব গঠনে ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, কানাডায় রাজনৈতিক অঙ্গীকার প্রশাসনিক নিয়োগ, নীতি কাঠামো এবং কর্মপরিবেশে রূপ নিয়ে একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন সৃষ্টি করেছে।
এ উদাহরণগুলো দেখায় যে, কেবল উপস্থিতি বৃদ্ধি নয়, বরং নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার কাঠামো পরিবর্তনের মাধ্যমেই প্রতিনিধিত্ব কার্যকর ক্ষমতায় রূপান্তরিত হয়। অতএব, বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত নীতিগত রূপান্তর। প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে; পদোন্নতির প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জেন্ডার-সংবেদনশীল করতে হবে; কর্মপরিবেশকে পুনর্গঠন করতে হবে, যাতে নারীরা দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারে; এবং স্থানীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে একটি টেকসই নেতৃত্বভিত্তি গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত তথ্য প্রকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
সুতরাং, সমস্যাটি কোনো ব্যক্তির নয়, এটি একটি কাঠামোর। নারী অনুপস্থিত নয়; কিন্তু তার ক্ষমতা সীমাবদ্ধ। কাঠামো তাকে প্রবেশ করতে দেয়, কিন্তু কেন্দ্রে পৌঁছাতে দেয় না। তাই প্রশ্নটি সংখ্যা নয়, প্রশ্নটি ক্ষমতার। এবং উত্তরটি স্পষ্ট-কেবল সংখ্যা নয়, বিদ্যমান ক্ষমতা কাঠামো বদলাতে হবে।
ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা : সহযোগী অধ্যাপক, নৃতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
