খাল খননে সুফল পেতে দরকার নিবিড় সেচ প্রকল্প
Advertisement
মেজর (অব.) মনজুর কাদের
প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে ১৫ আগস্টের সফল সামরিক অভ্যুত্থানকারীদের বিরুদ্ধে পালটা অভ্যুত্থান ঘটলে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত হন। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহি জনতার বিপ্লবের পর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান হিসাবে পুনর্বহাল হওয়ার পরও বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম প্রেসিডেন্ট এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে বহাল থাকেন। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত না থাকা সত্ত্বেও মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান দেশপ্রেমের বড় পরিচয় দিয়েছিলেন।
মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ প্রকল্প চালুর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ
১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ শেষে একতরফা গঙ্গার পানি অপসারণের মাধ্যমে পদ্মা নদীকে পানিশূন্য করে ফেলার চেষ্টা করে। এ বাঁধ চালু করার ফলে এর ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বাংলাদেশের পরিবেশে ফারাক্কার সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য জাতির প্রতি আহ্বান জানান। প্রবীণ এ মজলুম জননেতা ভারতের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। এরই প্রেক্ষাপটে ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ মে পদ্মা নদীর তীরবর্তী বিভাগীয় শহর রাজশাহী থেকে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ফারাক্কা বাঁধ অভিমুখী ফারাক্কা লংমার্চ সংঘটিত ও পরিচালিত হয়েছিল। যদিও মওলানা ভাসানী সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে ফারাক্কা পর্যন্ত পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছিলেন, তবু সরকারের পরামর্শে এ পদযাত্রা ১৭ মে অপরাহ্নে ভারতীয় সীমান্তের কাছে কানসাটে গিয়ে শেষ করা হয়। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নেপথ্যে থেকে এ লংমার্চ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করেন।
ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করে একতরফা পানি সরিয়ে নেওয়ার কারণে নদীনালায় পানির ঘাটতি দেখা দেয় এবং মাটির নিচে পানির স্তর (গ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল) নিম্নমুখী হতে থাকলে ১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর জিয়াউর রহমান উপপ্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসাবে খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
খাদ্যের বিনিময়ে কাজ : খাল খনন কর্মসূচি
খাদ্য বিপর্যয় থেকে রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পিএল-৪৮০ (PL-480; Food for Peace) কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে খাদ্যশস্য (বিশেষ করে গম) সাহায্য হিসাবে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। জনগণকে রিলিফ হিসাবে না দিয়ে এটি ‘খাদ্যের বিনিময়ে কাজ’ (Food for Work) ধরনের কর্মসূচির অংশ হিসাবেই চালু হয় এবং খাল খনন কাজে তা ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশের কৃষি বিপ্লব ও স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে এটি ছিল যুগান্তকারী উদ্যোগ। শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যে হাজার হাজার কিলোমিটার খাল সেসময় খনন ও পুনঃখনন করা হয়েছিল।
উলাশী খাল খনন প্রকল্প
১৯৭৬ সালের ১ নভেম্বর স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে, স্বেচ্ছাশ্রম ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ‘জিয়া মডেল’ হিসাবে পরিচিতি পায়। যশোরের উলাশী গ্রামের খাল খনন (উলশী প্রকল্প) ছিল এ কর্মসূচির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ, যা হাজার হাজার একর জমিকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছিল। সেনাবাহিনীর অফিসার হিসাবে উলশী প্রকল্পে আমার (লেখক) কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। আমি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম।
সেসময় আধিপত্যবাদী শক্তি কর্তৃক গঙ্গা নদীতে একতরফা পানি প্রত্যাহার এবং সীমান্ত এলাকায় অশান্তি সৃষ্টি করলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি অশান্ত হতে থাকে এবং সে কারণে দেশ রক্ষার জন্য মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (সিএমএলএ) নিযুক্ত হন।
এরপর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম পদত্যাগ করার পর জেনারেল জিয়া ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথগ্রহণ করেন। এরপর আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে জিয়া অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেন, যার মধ্যে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ছিল অন্যতম। জিয়াউর রহমান বুদ্ধি করে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া পিএল-৪৮০ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে দেওয়া সাহায্য কৃষি উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করেন।
খাদ্য সাহায্য সংকুচিত হয়ে আসে
পরবর্তীকালে পূর্ব ইউরোপ এবং দরিদ্র দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্র সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে বাংলাদেশে সাহায্য সংকুচিত হয়ে যায়। তাই কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচির আওতায় খাল খনন কর্মসূচিতে ভাটা পড়ে। তবে বৃহৎ সেচ প্রকল্প গ্রহণ করে পাম্পিং স্টেশন ও বাঁধ নির্মাণ করে নিয়ন্ত্রিত সেচ দেওয়ার জন্য খাল খনন অব্যাহত থাকে। যেমন আমি (লেখক) সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রী থাকাকালে ১৯৮৮-১৯৯০ সালের মধ্যে পাবনা সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের মধ্যে অসংখ্য সেচ খাল খনন করা হয় এবং তিস্তা বাঁধ নির্মাণ ও সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রধান খাল ও উপ-খাল খনন করা হয়। এসব খালের মাধ্যমে এখনো সেচ কার্যক্রম চালু আছে। তাই বাস্তবসম্মত সেচ প্রকল্প গ্রহণ করে পানির উৎসের সঙ্গে খননকৃত সেচ খালের সংযোগ, অবকাঠামো নির্মাণ এবং বন্যার সময় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল খনন করা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল একসঙ্গে না করলে শুধু বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে খাল খনন করা অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং অর্থ ও পরিশ্রমের অপচয় হতে পারে।
তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় সেচ প্রকল্প গ্রহণ করে শুকনো মৌসুমে সেচ এবং বন্যার সময় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের জন্য খাল খনন করার কোনো বিকল্প নেই।
মেজর (অব.) মনজুর কাদের : সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক সংসদ-সদস্য
