|
ফলো করুন |
|
|---|---|
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি এখন টক অব দ্য টাউন। অভিযোগ আছে, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে তড়িঘড়ি করে এ চুক্তি সম্পাদন করে দেশকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে যুক্তরাষ্ট্র লাভবান হবে এবং বাংলাদেশ তার স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার নিজের গা বাঁচাতে বলেছে, চুক্তি সই করার আগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সঙ্গে এ চুক্তি নিয়ে আলাপ হয়েছে এবং তাদের সম্মতির ভিত্তিতেই চুক্তি সই করা হয়েছে। বিএনপি এবং জামায়াত এ ব্যাপারে মুখে কুলুপ এঁটেছে। সাধারণ নাগরিকরা ধন্দে পড়ে গেছেন। দেশের বড় দুই দল যদি এ ব্যাপারে একমত হয়ে থাকে, তাহলে তারা কি জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে? দেশের দেখভাল করার দায়িত্ব তো তাদেরই?
একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার। এ চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সরকার বেশ উদ্যোগী ছিল। ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অসমতা ও ঘাটতি নিয়ে অনেকদিন ধরেই সোচ্চার ছিল। তারা যেসব দেশ থেকে পণ্য আমদানি করে, সেসব দেশের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্কারোপ করে দেশগুলোকে অস্থির করে তুলেছিল। বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অভিঘাত হতে পারত বিপুল। পরে একটা সমঝোতা হয়। শুল্কহার নেমে আসে; কিন্তু বিনিময়ে এমন কিছু শর্তে সায় দিতে হয়, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়তে পারে আমাদের অর্থনীতিতে।
আমাদের সরকারের কর্তারা একটু একটু করে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। কেউ বলছেন, এ চুক্তি আগের সরকার করেছে, তার দায় এসে পড়েছে বর্তমান সরকারের ওপর। কেউ বলছেন, এ চুক্তির ফলে বাংলাদেশও লাভবান হবে। নাগরিকরা এতে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ইতোমধ্যে আমরা নাগরিক সমাজ ও কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিক্রিয়া দেখতে পেয়েছি। এ নিয়ে বাদ-প্রতিবাদ, বিবৃতি, মানববন্ধন-সবই হচ্ছে। বলা হচ্ছে, এটি একটি গোলামির চুক্তি। প্রশ্ন হলো, ‘দেশবিরোধী’ এ চুক্তি আমরা কেন করেছি? নাকি আমরা এ চুক্তি সই করতে বাধ্য হয়েছি?
এ চুক্তি সই না করলে আমাদের রপ্তানি বাণিজ্য নানা বিধিনিষেধের মধ্যে পড়ত বলে আশঙ্কা ছিল। আমাদের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটা বড় অংশের গন্তব্য হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত হলো জনশক্তি এবং তৈরি পোশাক। যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। চীন এবং ভিয়েতনামের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করে বাংলাদেশকে এ অবস্থানে যেতে হয়েছে। বাংলাদেশ চায় না, এ অবস্থানে কোনো হেরফের হোক। এছাড়া, বাংলাদেশে গার্মেন্টস লবি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে খুবই শক্তিশালী। এ লবি যা চায়, সেটি পেয়ে যায়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি সচল রেখেছে বিদেশ থেকে আমাদের লোকদের পাঠানো রেমিট্যান্স। আমাদের আমদানি ব্যয় এবং বৈদেশিক দেনার একটা বড় অংশ এ রেমিট্যান্স দিয়ে মেটানো হয়। আমদানি ব্যয় যত বাড়ছে, ঋণ যত ঊর্ধমুখী হচ্ছে, রেমিট্যান্সের চাহিদা তত বাড়ছে। কোন মাসে কত রেমিট্যন্স এলো, সেটি আগের বছরের ওই মাসের চেয়ে কম না বেশি, এটি আমাদের সংবাদ শিরোনাম হয় নিয়মিত। বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান দুই বা তিন নম্বরে। এটি কোনো হেলাফেলার বিষয় নয়। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে চটাতে গিয়ে দুবার ভাববে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে ফিরে এসেই দুনিয়াটাকে অস্থির করে তুলেছেন। শুল্ক নিয়ে তিনি রীতিমতো একটা বিশ্বযুদ্ধ শুরু করে দিয়েছেন। এটা কি তার পাগলামি? আমরা অনেকেই এমনটা ভেবে বিনোদন পাই। ট্রাম্প সবসময় একটা কথা বলেন-আমেরিকা ফার্স্ট। অর্থাৎ সবার ওপরে তার দেশ। তাই যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি আছে, তিনি সেসব দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমতা তৈরি করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বার্থেই তিনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। তদুপরি আছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ। যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী বা বৈরী, যুক্তরাষ্ট্র চায় তার বাণিজ্যিক সহযোগীরা সেসব দেশের সঙ্গে ঢলাঢলি না করুক, সেসব দেশকে এড়িয়ে চলুক। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ‘মাখামাখি’ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কথা হলো, তার কাছ থেকে কিছু পেতে হলে তার কথা শুনতে হবে।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ সুবোধ ছাত্রের মতো যুক্তরাষ্ট্রের কথা শুনতে গিয়ে নিজের স্বার্থরক্ষা করতে পারছে কিনা। বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র খুবই শক্তিশালী দেশ। তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার মতো বুকের পাটা আছে যাদের, তাদের আছে প্রবল সামরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্য। এর বাইরে কিছু ব্যতিক্রম আছে-যেমন, কিউবা ও ইরান। এ দুটো দেশের জনগণের রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং গণসংহতি তুলনাহীন। আমরা তার ধারেকাছেও নেই। আমাদের রাজনীতি হচ্ছে কলতলার ঝগড়া। এটি সম্বল করে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারা অসম্ভব। সেজন্য আমরা অনেক অসম চুক্তিতে সায় দিই আমাদের দুর্বলতার কারণে কিংবা ভয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হয়ে যাওয়া সাম্প্রতিক চুক্তির আগে আমরা অনেক দেশের সঙ্গে অনেক চুক্তি করেছি। সবগুলোতে আমাদের জাতীয় ও জনস্বার্থ রক্ষা পায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র যদি চটে যায়, আমরা কী করতে পারি? শাহবাগের মোড়ে মানববন্ধন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তো দূরের কথা, আমাদের কর্তারাই মাথা ঘামান না। তাহলে আমাদের সামনে বিকল্প কী? আসলে আকণ্ঠ ঋণে ডুবে থাকা গরিবের সামনে কোনো বিকল্প থাকে না। আমরা অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করি, তার আগ্রাসী ভূমিকার নিন্দা জানাই; কিন্তু বিকল্পের সন্ধান করি না।
ষাটের দশকে চীনের নেতা মাও সে-তুং বৈরী বিশ্বব্যবস্থার সমালোচনা করে একটা কথা বলতেন-আমেরিকান ইম্পেরিয়ালিজম অ্যান্ড ইটস রানিং ডগস, অর্থাৎ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার পদলেহী কুকুর। চীন দীর্ঘদিন একঘরে ছিল। একটি রেজিমেন্টেড সরকার প্রবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে সম্বল করে দুর্ভিক্ষপীড়িত চীনকে একটি পরাশক্তিতে রূপান্তরিত করেছে। চীন এখন বিশ্বের দ্বিতীয় প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি। আমাদের যখন যাত্রা শুরু, আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা চীনের চেয়ে খারাপ ছিল না। এখন চীন কোথায়, আর আমরা কোথায়?
যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গে আসি। দেশটি চাইলেই যখন-তখন যাকে তাকে একঘরে করে দিতে পারে, অবরোধ দিয়ে অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দিতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ খেয়ে বসে আছে। রাশিয়া থেকে তেল কিনতে আমরা কয়দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি ভিক্ষা করেছি। মার্কিন ডলার আমাদের অর্থিনীতিকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। এটাই বাস্তবতা।
আমরা আমাদের দেশটাকে ঢেলে সাজানোর সুযোগ পেয়েছিলাম। দেশ স্বাধীন করেছি দুবার। কেউ কেউ মনে করেন, দুবছর আগে আমাদের তৃতীয় স্বাধীনতা এসেছে। অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতা থেকে আমরা এখনো যোজন যোজন দূরে। এমন একটি পরিস্থিতিতে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটা বাণিজ্য চুক্তি করেছি। এর মধ্যে থেকে কীভাবে আমরা আমাদের সামর্থ্য বাড়াতে পারি, সেই চেষ্টা থাকা দরকার। ইতিহাস আমাদের বারবার সুযোগ দিয়েছে।
চীন ও ভারতের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি প্রবল। দেখা যাবে, চীন বা ভারতের জায়গায় চলে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। আমরা যত রপ্তানি করি, আমদানি করি তার চেয়ে বেশি। একটি উন্নয়নকামী দেশের জন্য এটি স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি ভালো নয়। আমরা কি ঘাটতিতেই থেকে যাব? এখান থেকে উত্তরণের ও পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।
মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
