পদ শূন্য থাকলে সেবাবঞ্চনা তো হবেই
ড. মাহবুব হাসান
প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
জনপ্রশাসনে অনুমোদিত ১৯ লাখ ১৫১ পদের বিপরীতে বর্তমানে শূন্য রয়েছে ৪ লাখ ৬৮ হাজার ২২০টি পদ। অর্থাৎ মোট জনবলের প্রায় ২৫ শতাংশ পদ খালি থাকলেও সেগুলো পূরণে দৃশ্যমান কোনো বড় নিয়োগ কার্যক্রম নেই। মামলা, পুরোনো নিয়োগবিধি, রাজনৈতিক তদবির, প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঝুঁকি এবং প্রশাসনিক অনাগ্রহ-সব মিলিয়ে সরকারি নিয়োগ কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। (যুগান্তর, ৪ মে, ২০২৬)
সরকারি সেবার হাল এ চিত্র থেকেই বোঝা যায়, দেশের জনপ্রশাসনের সাড়ে ৪ লাখেরও বেশি পদে কেন সেবক (কর্মকর্তা/কর্মচারী) নিয়োগ দেওয়া হয়নি, বা কেন হচ্ছে না, তার কিছু কারণ অবশ্যই আছে। আবার ঝামেলা-জটিলতা ইত্যাদি এড়ানোর জন্য নিয়োগদাতা কর্তৃপক্ষ তা এড়িয়ে যান। এই যে এড়িয়ে যাওয়ার মানসিকতা, সেটা যদি ওই কর্মকর্তার জীবনে ঘটত, তাহলে তিনি কি আজকের পজিশনে আসতে পারতেন, কাজ করতে পারতেন? তিনি যে একজনের রিজিকের ওপর হাত রেখেছেন, যা অন্যায় ও অপরাধের শামিল, তা কি একবার ভেবে দেখেছেন? এর বাইরে আছে অফিসের কর্মচারীর ঘাটতি, ফলে ঠিকমতো সেবা না দেওয়ার বিষয়টি। অন্য যারা ওই সেবাদানের ব্যাপারে নিজেদের কাজে লাগান, তারা টুপাইস পাওয়ার লোভে লাগান। তারা যদি প্রতিবাদ করেন, তাহলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তাদের বাড়তি কাজের জন্য হুকুম দিতে পারত না। ফলে সরকারি সেবা থেকে একদিকে গ্রহীতা বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে এ ব্যর্থতার দায় গিয়ে পড়ে খোদ সরকারের কাঁধে। সরকারের বদনাম হয়, সরকারের কর্মচারীদের ঘুসের বিষয়টি চাউর হয়। লোকেরা বোঝে সরকারের সব কর্মকর্তা-কর্মচারী ঘুসখোর।
৯ লাখ ১৫১ পদ কেন পূরণ করেনি সরকার? এ প্রশ্ন তুললেই বলবেন, সরকারের আর্থিক সংকট রয়েছে। তাই ওই শূন্যপদ পূরণ করা যায়নি। এ জবাবের উলটোপিঠে এটা বলা কি অন্যায় হবে, তাহলে পদস্থ, উচ্চপদস্থ আমলাদের জন্য যে বিপুল অঙ্কের টাকা ব্যয় করা হয় শুধু নতুন মডেলের গাড়ি কেনার জন্য, সেই টাকা কেন জনপ্রশাসন অনুমোদন করে? কোনটা জরুরি। আমলাদের বিলাসবহুল জীবনাচরণ, নাকি সেবাপ্রার্থী গরিব মানুষের প্রতি প্রাক্কলিত জনবল নিয়োগ? আয়েশি জীবনযাপন করে মন্ত্রণালয়ের আমলাকুল ভুলে যান যে, তারা এদেশের সন্তান, এদেশের কৃষকের সন্তান। তাদের বাড়িতে এসি ছাড়া চলে না, গাড়িও এসি ছাড়া চলে না। যে রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আছেন এখন, সেসব মন্ত্রীও অফিসে-গাড়িতে-বাড়িতে এসি ছাড়া চলতে পারেন না। ঠিক এ কারণেই তারা কৃষকের প্রতি মনোযোগ দিতে পারেন না। তাদের আচার-আচরণ আর গাঁয়ের কৃষকের আচার-আচরণের মধ্যে পার্থক্য আছে। অথচ তারা উভয়েই বাংলাদেশি, বাংলাদেশি কালচারে লালিত-পালিত। এ পার্থক্যই সেবাদাতা আর গ্রহীতার মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি করেছে। ওই যে সাড়ে চার লাখ মানুষ চাকরি থেকে বঞ্চিত হয়েছে, বঞ্চনার গ্লানি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছে, সেই দিকে কি কারও নজর পড়ে না?
২.
কী কী কারণে ওইসব পদে নিয়োগ দেওয়া হয় না, তার কিছু বয়ান আমরা পড়ে আসি। সংশ্লিষ্টদের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ঘিরে দালালচক্রের সক্রিয়তাও উদ্বেগজনক। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটলে তদন্ত, গণমাধ্যমের সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত জবাবদিহির চাপ-সব মিলিয়ে কর্মকর্তারা নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকতে চাইছেন।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। এ মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর ও সংস্থায় খালি পদ ৭৪ হাজার ৫৭৪টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪ হাজার ৭৯০টি পদ খালি রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে।
এসব শূন্যপদে যে একই রকম কারণে নিয়োগ হচ্ছে না, তা নয়; কিন্তু এক জায়গায় মিল সবখানেই। নিয়োগ বাণিজ্য। এ খাতটি সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য এক পোয়াবারো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে রেখেছে।
খালি পদ নিয়ে আলোচনায় সবচেয়ে অগ্রাধিকার হলো স্বাস্থ্যসেবা ও প্রাথমিক ও গণস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রলালয়ে সাড়ে ৭৮ হাজার পদ খালি। ওই খালি পদে কোনো জনবল নেই। অথচ ঢাকা মহানগরে হাজার হাজার বেসরকারি ক্লিনিকে ডাক্তারদের উপস্থিতি আমরা দেখি। এরা কেউ রাজধানীর মধুর চাক রেখে মফস্বলে যাবেন না। যেতে চান না। গ্রামের মানুষকে সেবা দেওয়ার কোনো ভাবনাই তারা করেন না। তারা স্বপ্ন দেখেন বড় ডাক্তার হবেন, প্রফেসর হবেন, রোগীদের পকেট থেকে কী করে টাকা বের করতে হয়, সেই মেডিকেল বিদ্যা তারা জানেন।
এখন হামের সংক্রমণ চলছে। এরই মধ্যে তিন শতাধিক শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। হামের টিকা সরকারের কোষে ছিল না। ইউনিসেফের কাছ থেকে কিনে এনে তারপর ১০-১২ দিন পর শুরু হয়েছে টিকাদান কর্মসূচি। এখনো হামে মৃত্যুর খবর আসছে প্রতিদিনই। গত ৪ মে মারা গেছে ১৭টি শিশু, হাম-নিশোনিয়াসহ অন্যান্য কারণে। সরকারি পরিসংখ্যান বলেছে, এরই মধ্যে তারা ৮১ শতাংশ শিশুকে হামের টিকার আওতায় এনেছেন। তথ্যটি খুব ভালো। কিন্তু ওই ভালো তথ্যটি শিশুর হাম ঠেকাতে ও মৃত্যুরোধ করতে পারেনি। তাহলে ফল হলো-কিছু মৃত্যুর বিনিময়ে আমরা হামের টিকার আওতায় আনতে পারলাম শিশুদের।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৪৪ হাজার ৭৯০টি পদ খালি রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। জাতির মেরুদণ্ড বলে খ্যাত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা কী রকম চলছে, তা শিক্ষামন্ত্রী ড. আনম এহছানুল হক মিলন সম্যক উপলব্ধি করতে পারছেন। এবং ধারণা করি, প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ও বুঝতে পারছেন।
এখানে বোঝার বিষয় হচ্ছে, ওই পদগুলো কি কেবল প্রশাসনিক খালি পদ, নাকি প্রাথমিক ও গণশিক্ষার শিক্ষকরাও ওই তালিকায় যুক্ত আছেন? আবার এটাও মনে রাখতে হবে, দেশের যেসব গ্রামে প্রাথমিক ও গণশিক্ষার অবকাঠামো-বিদ্যালয় নেই, তাদের সংখ্যা যদি যুক্ত করা হয়, তাহলে পরিস্থিতিকে ভালো-মন্দ ইত্যাদি শব্দে বাঁধাই করা যাবে না। যদি বলি তা সাংবিধানিকভাবে অধিকারপ্রাপ্ত শিশুদের শিক্ষাবঞ্চনা গত ৫৫ বছর ধরেই চলছে, এর প্রতিকারই বা কীভাবে হবে? আমরা কি ভাবতে পারি, ৫৫ বছর ধরে আমাদের রাজনীতিকরা কী পরিমাণ রাজনৈতিক অসততার পরিচয় দিয়ে চলেছেন? গত ৫৫ বছরে যদি প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্ভব হতো, তাহলে ওইসব গ্রামের শিশুরা বঞ্চনার শিকার হতো না। আবার প্রতি বছর ৫০০ গ্রামে একটি করে প্রথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা গেলেও এতদিনে প্রতিটি গ্রামের শিশুরাই শিক্ষার আলো পেত। তার মানে, রাজনৈতিক সরকার বা অরাজনৈতিক সরকার, সেনাশাসিত সরকার, কোনো সরকারই তাদের মৌলিক চেতনায় শিশুশিক্ষাকে প্রাধান্য দেননি। আর সেই মানসিকতাই ফুটে উঠেছে গণশিক্ষা ও প্রাথমিক মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৫৫ হাজার পদ খালি পড়ে থাকার মধ্যে।
বর্তমান সরকার শিশুদের টিফিনের রেওয়াজ চালু করতে চাইছে। দিতে চাইছে স্কুল ব্যাগ; কিন্তু তার আগে ভাবুন, ওইসব ব্যাগ শিশুর কাঁধে নেওয়ার ক্ষমতা আছে কী নেই। তারা পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে কী, পায়নি, সেটি ভাবুন। আবার এটাও ভাবুন, যাদের দুপুরে খাবার ব্যবস্থা করছেন, তাদের চেয়েও হতভাগ্য শিশুরা বঞ্চিত হয়ে রয়েছে গ্রাম-গ্রামান্তরে। এ বঞ্চনা তো বৈষম্য বাড়াবে। বৈষম্য কমাতে হলে আগে সমতা নির্মাণ করুন। প্রতিটি শিশু যাতে শিক্ষা পায়, খাদ্য পায়, পুষ্টির জোগান যেন আমরা করতে পারি, তার ব্যবস্থা করতে হবে।
৩.
আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারের বয়স খুবই কম। ৬০-৬৫ দিন হলো। এত কম সময়ের মধ্যে নতুন করে আয়োজন সম্ভব নয়। তাই পুরোনো খালি পদগুলোতে লোক নিয়োগ করে দেশের স্থবির পরিস্থিতিতে একটি জোয়ার আনা সম্ভব। তবে, সেটা করতে হলে প্রশাসনকে জড়তা ও ঘুম থেকে জাগিয়ে দিতে হবে। তাদের মধ্যে সেই চিন্তা ঢোকাতে হবে, যা দেশের মানুষের জন্য কল্যাণকর। বঞ্চিতদের মধ্যে একটি সুখের আবহ সৃষ্টি হতে পারে। পুরোনো রোগ সারিয়ে আমলাকুল ও রাজনৈতিক শক্তি জনআকাঙ্ক্ষার অনুকূলে আসুক, আমি-আমরা সেটাই চাই।
ড. মাহবুব হাসান : কবি ও সাংবাদিক
