Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই

Advertisement

Icon

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিনিয়োগ বৃদ্ধি করার কোনো বিকল্প নেই

Advertisement

দেশে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ অনেকদিন ধরেই স্থবির হয়ে আছে। সরকারি খাতে বিনিয়োগপ্রবাহ মোটামুটি সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলেও বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ একই স্থানে স্থির হয়ে আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য মোতাবেক, বর্তমানে জিডিপি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ রেশিও দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৩ শতাংশ। এটি গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ হয়েছিল জিডিপির ২২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ছিল ৫৫ লাখ ১৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। এ সময় সার্বিক বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল ১২ লাখ ১৪ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। কোনো দেশের উন্নয়নের গতিধারা প্রত্যক্ষ করতে হলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগকে বিবেচনায় নিতে হয়। কারণ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানকে সহায়তা করে। অর্থাৎ বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সরাসরি উৎপাদন কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর সরকারি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রধানত অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়। কোনো দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কাঙ্ক্ষিতমাত্রায় উন্নীতকরণ এবং বেকার সমস্যা সমাধান ও দারিদ্র্যবিমোচনের ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। আমাদের দেশে প্রতি বছর বেসরকারি খাতে উচ্চমাত্রায় বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বছরান্তে সেই লক্ষ্যমাত্রা অনর্জিত থেকে যায়। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে জিডিপি বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ রেশিও ২৮ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলেও তা অর্জিত হয়নি।

বেসরকারি খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বিনিয়োগ না হওয়ার জন্য নানা কারণ দায়ী। এর মধ্যে সবার আগে উল্লেখ করতে হয় দেশের ব্যাংক খাতের দুর্বলতা। বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বিনিয়োগযোগ্য তহবিল সংগ্রহের জন্য প্রধানত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভর করে থাকেন। দেশে মোট ৬১টি ব্যাংক ব্যবসায়রত রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই তারল্য সংকটসহ নানা সমস্যায় ভুগছে। ফলে ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের চাহিদামতো ঋণ দিতে পারছে না। ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের দুর্বলতার কারণে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মোতাবেক, ২০০৯ সালে ব্যাংকিং সেক্টরে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। গত ডিসেম্বর কোয়ার্টারে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়। পরবর্তীকালে নগদ ১ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট জমা দিয়ে ২ বছরের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১০ বছরের জন্য খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলিকরণ ও অন্যান্য সুযোগ দেওয়ায় খেলাপি ঋণের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। ব্যাংকগুলো কিস্তি আদায়ের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমাতে পারছে না।

ব্যাংক খাতকে বলা হয় ‘অর্থনীতির লাইফ লাইন’। সেই খাতকে আমরা সঠিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারিনি। ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের কারণে এ খাতের স্বাভাবিক চলার পথ ব্যাহত হয়েছে। উপযোগিতা বিবেচনা না করেই বিগত রাজনৈতিক সরকার আমলে দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। ফলে পুরো ব্যাংক খাতে এক ধরনের অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে অনেকেই তা উদ্দিষ্ট খাতে ব্যবহার না করে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেছেন। এমনকি বিদেশে পাচার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংক খাত সঠিকভাবে কাজ না করায় বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ আশানুরূপভাবে বাড়ছে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয় না। ব্যাংকাররা বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করে ঝুঁকি নিতে চান না। তাদের কাছে যে আমানত আসে অথবা সংগৃহীত হয়, তা নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ করে। তারা বিভিন্ন বন্ডে বিনিয়োগ করে নিরাপদ থাকতে চায়। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের হার যদি জিডিপির ২৮-২৯ শতাংশে উন্নীত করা না যায়, তাহলে অর্থনীতি গতিশীল হবে না। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য ব্যাংকের ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা এবং বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে হবে। ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্বল হচ্ছে সাধারণ মানুষের নিরঙ্কুশ আস্থা।

উন্নত দেশগুলোতে উদ্যোক্তারা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শেয়ারবাজারের ওপর নির্ভর করে থাকে; কিন্তু বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনো বিকশিত হয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থার স্থানে পরিণত হয়নি। বিশেষ করে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে শেয়ারবাজারে কেলেঙ্কারির পর ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা শেয়ারবাজারবিমুখ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রীয় এবং ব্যক্তিমালিকানায় যেসব বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে, আমরা তাদের শেয়ারবাজারে আনতে পারিনি। শেয়ারবাজার থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহের সুবিধা হচ্ছে কোম্পানি লাভজনকতা অর্জন না করা পর্যন্ত লভ্যাংশ দিতে হয় না। কিন্তু ব্যাংক থেকে বিনিয়োগ সংগ্রহ করা হলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর সুদসহ কিস্তি পরিশোধ করতে হয়। প্রতিষ্ঠিত কোম্পানিগুলোকে বাজারে শেয়ার ছাড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে হবে। শেয়ারবাজারে যেসব অসংগতি ও দুর্নীতি রয়েছে, তা দূরীকরণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে নানারকম সমস্যা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচকে ১৯০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৬তম। অর্থাৎ কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের দুর্বলতা এ প্রতিবেদনে প্রতিভাত হয়ে উঠে। বর্তমানে ‘ইজ অব ডুয়িং বিজনেস’ সূচক প্রকাশ বন্ধ রয়েছে। তার পরিবর্তে বিশ্বব্যাংক ‘বিজনেস রেডি’ নামে একটি সূচক প্রকাশ করছে। সেখানে ৫০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ সারিতে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কোনো দেশে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে এসব প্রতিবেদন ভালোভাবে পর্যালোচনা করে থাকে। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা অনেক সময় নানা আইনি জটিলতার কারণে নিজ দেশের বাইরে বিনিয়োগ করতে পারে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন ‘শীতের অতিথি পাখি’র মতো। শীতের অতিথি পাখি যেমন কোনো জলাশয়ে পর্যাপ্ত খাবার এবং জীবনের নিরাপত্তা না পেলে আশ্রয় গ্রহণ করে না, বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও তেমনি কোনো দেশে পর্যাপ্ত মুনাফা এবং পুঁজি ও জীবনের নিরাপত্তা না পেলে বিনিয়োগে আগ্রহী হয় না। বিনিয়োগ একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সাধারণত সরাসরি অথবা যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ করে থাকেন। তারা কোনো দেশে বিনিয়োগ করার আগে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অবস্থা পর্যালোচনা করে থাকেন। কোনো দেশে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত পরিমাণে বিনিয়োগ না করলে সেদেশে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আগ্রহী হয় না। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ। এ দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে। এখানে তুলনামূলক কম মজুরিতে পর্যাপ্তসংখ্যক শ্রমিক পাওয়া যায়। বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করে পণ্য উৎপাদন করলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বাজারে মুক্তভাবে রপ্তানির সুযোগ পাওয়া যায়। এসব কারণে বাংলাদেশ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হওয়ার দাবি রাখে; কিন্তু আমরা কার্যকর বিনিয়োগ পরিবেশ গড়ে তুলতে পারিনি। সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোতে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়; বন্দর ব্যবস্থাপনা খুবই দুর্বল।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যেসব নীতিমালা আছে, তাকে যৌক্তিক করতে হবে। শুল্ক ছাড় দেওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূরীকরণ করতে হবে। ব্যবসায়বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যা যা করণীয় তা করতে হবে। বিনিয়োগ নীতির ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বিনিয়োগ আহরণের জন্য খুবই প্রয়োজন। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, চাঁদাবাজি এবং সামাজিক অস্থিতিশীলতা বিনিয়োগ পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ছিল সাড়ে ৭ শতাংশ। পরবর্তী বছরে তা আরও কমে ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশে নেমে আসে। দক্ষিণ এশিয়ার ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ১২ শতাংশ। উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে এটি ১৫ শতাংশ থাকা প্রয়োজন।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হয়েছে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। আগের পুরো অর্থবছরে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছিল ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল চ্যালেঞ্জ হবে স্থানীয় উৎস থেকে সম্পদ আহরণ এবং বিদেশি সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণ। যেহেতু ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও কম, সেটাকে এ বছর অন্তত পক্ষে ৯ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে তা ধাপে ধাপে ১২ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে ঋণের কিস্তি পরিশোধের সক্ষমতা, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ, ঋণ ব্যবহারের প্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে।

আমাদের দেশের ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণের সময় রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতি নিয়ামক শক্তি হিসাবে কাজ করে থাকে। বিদ্যমান নিয়ম মেনে উপযুক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া হলে পরবর্তীকালে সেই ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। যেসব ব্যবসায়ীর ট্র্যাক রেকর্ড ভালো, ঋণদানের ক্ষেত্রে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। ঋণদানের ক্ষেত্রে বন্ধকিকৃত সম্পদের সঠিক ভ্যালুয়েশন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে দেশে রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাদের মূল দায়িত্ব হবে দেশে কার্যকর বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা। একইসঙ্গে পুঁজিবাজারের উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আহরণের কোনো বিকল্প নেই। (অনুলিখন : এম এ খালেক)

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : অর্থনীতিবিদ, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম