Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও স্পিনিং খাতের পেমেন্ট জটিলতা

Advertisement

Icon

মো. সাইফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাক টু ব্যাক এলসি ও স্পিনিং খাতের পেমেন্ট জটিলতা

Advertisement

বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো তৈরি পোশাকশিল্প। আর এ শিল্পের মেরুদণ্ড হিসাবে কাজ করছে দেশীয় স্পিনিং মিলগুলো। আমরা জানি, পোশাক রপ্তানির জন্য প্রয়োজনীয় সুতার একটি বিশাল অংশের জোগান দেয় স্থানীয় এ কলকারখানাগুলো। সাধারণত এ সুতা বিক্রয় প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় ‘ব্যাক টু ব্যাক এলসি’র মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে এ এলসির বিপরীতে পেমেন্ট বা অর্থপ্রাপ্তির প্রক্রিয়াটি যে জটিল আকার ধারণ করেছে, তাতে দেশের স্পিনিং মিল মালিক এবং সংশ্লিষ্ট বিপণন কর্মকর্তারা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

সহজ কথায়, একজন রপ্তানিকারক যখন বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে মূল ক্রয়াদেশ (মাস্টার এলসি) পান, তখন সেই পণ্য তৈরির কাঁচামাল হিসাবে সুতা কেনার জন্য স্থানীয় স্পিনিং মিলের অনুকূলে যে দ্বিতীয় এলসি ইস্যু করেন, তাই হলো ব্যাক টু ব্যাক এলসি। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে ৯০ থেকে ১২০ দিনের ডেফার্ড এলসির মাধ্যমে সিংহভাগ সুতা বিক্রয় হয়। তবে ইদানীং এ আইনগত কাঠামোর আড়ালে পেমেন্ট নিয়ে যে হয়রানি চলছে, তা পুরো সরবরাহ চেইনকে হুমকির মুখে ফেলছে।

পেমেন্ট প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে পাঠানো ‘ডেসক্রিপেন্সি লেটার’ বা ত্রুটিজনিত পত্র। নিয়ম অনুযায়ী, বিক্রেতা (স্পিনিং মিল) যখন ক্রেতাকে সুতা সরবরাহ করে বিল অব এক্সচেঞ্জ এবং ডেলিভারি চালানসহ যাবতীয় নথিপত্র ক্রেতার ব্যাংকে জমা দেয়, তখন ব্যাংকের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ‘ম্যাচুরিটি পেপার’ বা অর্থ প্রদানের অঙ্গীকারনামা দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, প্রায় ১০০ শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যাংক নথিপত্রে সূক্ষ্ম কোনো ভুল ধরে ডেসক্রিপেন্সি লেটার পাঠিয়ে দেয়।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এটি অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায়ের একটি কৌশলে পরিণত হয়েছে। এ ডেসক্রিপেন্সি প্রত্যাহারের জন্য আবার ক্রেতাকে চিঠি দিতে হয়। অনেক সময় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এ চিঠি দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে দেরি করে বা গড়িমসি করে। ক্রেতা সম্মতি না দিলে ব্যাংক ম্যাচুরিটি প্রদান করে না। ফলে পণ্য সরবরাহ করেও বিক্রেতাকে তার পাওনা টাকার জন্য মাসের পর মাস ক্রেতা এবং ব্যাংকের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক সময় বিক্রেতা মাস্টার এলসির পরিবর্তে সেলস কন্ট্রাক্টের বিপরীতে ব্যাক টু ব্যাক এলসি গ্রহণ করে পণ্য সরবরাহ করেন। সুতা ডেলিভারি হয়ে যাওয়ার পর যখন পেমেন্টের সময় আসে, তখন ক্রেতার ব্যাংক অজুহাত দেয় যে, ক্রেতা এখনো মাস্টার এলসি সংগ্রহ করতে পারেনি, তাই পেমেন্ট বা ম্যাচুরিটি দেওয়া সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, যদি মাস্টার এলসি না-ই থাকে, তাহলে ব্যাংক কেন ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু করল? ব্যাংক যখন একটি এলসি ইস্যু করে, তখন সেই পেমেন্টের দায়ভার ব্যাংকের ওপরই বর্তানোর কথা। কিন্তু এ দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সংস্কৃতির কারণে বিক্রেতারা আজ চরম আর্থিক ঝুঁকিতে।

এলসির মূল উদ্দেশ্যই হলো লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থায় সুতা ডেলিভারি দিয়ে বিক্রেতাকে সব সময় পেমেন্ট না পাওয়ার ভয়ে থাকতে হয়। এলসির বিপরীতে পণ্য দিয়ে যদি দীর্ঘ সময় অর্থ আটকে থাকে, তাহলে স্পিনিং মিলগুলোর পক্ষে তাদের পরিচালনা ব্যয় মেটানো এবং কাঁচামাল (তুলা) আমদানির দায় মেটানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে উদ্যোক্তারা এলসির পরিবর্তে শুধু নগদ টাকায় বিক্রয় করতে বাধ্য হবেন, যা সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে ধস নামাতে পারে।

এ সংকট থেকে উত্তরণে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনকে (বিটিএমএ) অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পেমেন্ট পদ্ধতিকে সহজতর এবং নিশ্চিত করতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা প্রয়োজন। আমাদের দাবিগুলো হওয়া উচিত সুনির্দিষ্ট-

১. স্বয়ংক্রিয় ম্যাচুরিটি : যদি ক্রেতা বিল অব এক্সচেঞ্জ এবং ডেলিভারি চালানে স্বাক্ষর করেন, তাহলে ব্যাংককে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ম্যাচুরিটি প্রদান করতে হবে।

২. ডেসক্রিপেন্সি হয়রানি বন্ধ : তুচ্ছ কারণে ডেসক্রিপেন্সি লেটার পাঠানো এবং এর নামে অতিরিক্ত চার্জ আদায় বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর নীতিমালা প্রয়োজন।

৩. ব্যাংক থেকে পেমেন্ট গ্যারান্টি নিশ্চিত করা : মাস্টার এলসি থাকুক বা না থাকুক, ব্যাংক যদি ব্যাক টু ব্যাক এলসি ইস্যু করে, তাহলে তার পেমেন্টের সম্পূর্ণ দায়ভার ইস্যুকারী ব্যাংককেই নিতে হবে।

৪. ডিজিটাল ট্র্যাকিং : এলসির নথিপত্র জমা এবং পেমেন্টের বর্তমান অবস্থা জানার জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, স্পিনিং মিলগুলো টিকে না থাকলে দেশের পোশাক খাত প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে পারবে না। তাই ব্যাক টু ব্যাক এলসির পেমেন্ট জটিলতা নিরসন করা এখন সময়ের দাবি। নীতিনির্ধারক ও ব্যাংক খাত যদি এখনই সচেতন না হয়, তাহলে এ খাতের উদ্যোক্তাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে যাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পুরো জাতীয় অর্থনীতির ওপর।

মো. সাইফুল ইসলাম : জেনারেল ম্যানেজার (বিপণন), স্পিনিং ডিভিশন, যমুনা গ্রুপ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম