বাইফোকাল লেন্স
মমতার প্রস্থানে তিস্তাচুক্তির বাধা কি দূর হলো
Advertisement
একেএম শামসুদ্দিন
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাধা হিসাবে কাজ করেছে, তার মধ্যে অন্যতম ছিল মাত্র একটি রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ভারতের বাংলাদেশকে দেখা। এছাড়া আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আছে, যা দেড় যুগেরও বেশি সময় এ দুদেশের মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নেতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। যেমন: বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে ভারত তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক কিছু একতরফাভাবে আদায় করে নিলেও বিনিময়ে বাংলাদেশকে দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতিই রক্ষা না করা। এরই মধ্যে যে ইস্যুটি আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গাটি সবচেয়ে বেশি নষ্ট করেছে, তা হলো-‘তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি’। ২০১১ সালে এ চুক্তি স্বাক্ষরের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও ভারত পিছু হটে যায়। তারপর থেকে বছরের পর বছর চুক্তি স্বাক্ষর করার নামে বাংলাদেশকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘রাজনৈতিক বাধা’র কারণেই ওই চুক্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। দিল্লির তরফে এও বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে মতভেদ দূর করার প্রক্রিয়া চলছে, দূর হওয়া মাত্রই চুক্তি করা হবে। এভাবেই প্রায় দেড় যুগ কেটে গেছে, কিন্তু ঢাকাকে দেওয়া দিল্লির সে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
তিস্তা নিয়ে দিল্লি ও কলকাতার মধ্যে মতভেদের শুরু ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে। সেই সময় ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং-এর বাংলাদেশ সফরকালে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু কলকাতার বিরোধিতার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর না করেই মনমোহন দিল্লি ফিরে যান। যাওয়ার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সঙ্গে মতভেদ মিটিয়ে যত দ্রুত সম্ভব তিস্তাচুক্তি করা হবে। ক্ষমতায় আসার পর নরেন্দ্র মোদিও একাধিকবার ‘ঘরোয়া সমস্যা’ দ্রুত মিটিয়ে তিস্তাচুক্তি করার প্রতিশ্রুতি দেন। দিল্লি থেকে বলা হয়, বিজেপি সরকার তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি নিয়ে আন্তরিক হলেও স্রেফ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে চুক্তিটি নিয়ে এগোতে পারছে না। পশ্চিমবঙ্গ রাজি হলেই তিস্তাচুক্তি করে ফেলবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার।
অথচ দিল্লির ওই বক্তব্যের বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিলেন কেন্দ্রের সঙ্গে রাজ্য সরকারের হয়ে যোগাযোগের দায়িত্বে ছিলেন এমন দুজন কর্মকর্তা। তাদের দাবি, রাজ্য অযৌক্তিক আপত্তি তুলে চুক্তি আটকে রেখেছে-এটা একেবারেই ভিত্তিহীন একটা ন্যারেটিভ। রাজ্য চেয়েছিল, বাস্তব তথ্যের ভিত্তিতে দুই দেশের মধ্যে পানিবণ্টন হোক। পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ির সেই সময়ের জেলা প্রশাসকও বলেছিলেন, তিস্তার পানি না মেপেই, পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে পানি দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অথচ সে সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকার তিস্তার পানি মাপার জন্য একটি কমিটিও তৈরি করে দিয়েছে; কিন্তু নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে কেন্দ্র সেই কাজ বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে বিষয়টি কার্যত ধামাচাপা পড়ে যায়।
মমতা ব্যানার্জির তৎকালীন সেচমন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জি এ প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল কাঠামোয় সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করে বা মুখ্যমন্ত্রীর সম্মতি না নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। মমতা ব্যানার্জি কিন্তু ‘স্রেফ বিরোধিতার জন্য চুক্তির বিরোধিতা’ করেননি। বরং তিনি বিভিন্ন বিকল্প প্রস্তাব পেশ করে বরাবরই বাংলাদেশের সঙ্গে পানি ভাগাভাগি করতে চেয়েছিলেন। তিনি ওই অঞ্চলের তোরসা, মানসাই কিংবা ধরলার মতো অন্য নদীগুলো থেকে পানি দেওয়ার বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছিলেন; কিন্তু দিল্লি সেদিকে কর্ণপাত করেনি। অথচ মোদি সরকারের পক্ষে বারংবার বলা হয়েছে, মমতাই অযথা আপত্তি তুলে তিস্তাচুক্তি আটকে রেখেছেন।
এক যুগেরও বেশি অপেক্ষার পর ভারতের প্রতিশ্রুতির ওপর আর ভরসা না করে বাংলাদেশ বিকল্প পথ খুঁজে বের করে এবং চীনের আর্থিক ও কারিগরি সহযোগিতায় তিস্তার বাংলাদেশের অংশের উজানে একটি বহুমুখী ব্যারাজ নির্মাণসহ দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা হাতে নেয়, যার পুরো নাম ‘কম্প্রিহেনসিভ ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড রেস্টোরেশন অব তিস্তা রিভার প্রজেক্ট’। বাংলাদেশ এ মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়ার পরপরই ভারতের টনক নড়ে। বাংলাদেশের এ উদ্যোগ ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হবে জানিয়ে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে আপত্তি জানায়। তিস্তা মহাপরিকল্পনার নামে ভারতের ‘শিলিগুড়ি চিকেন নেক’-এর সন্নিকটে চীনের উপস্থিতি ভারত কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। ভারতের আপত্তির ফলে এ প্রকল্পের কার্যক্রম আটকে যায়। এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারত বাংলাদেশের ন্যায্য পানি তো দেবেই না; আবার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেও দেবে না! তারা নিজেদের প্রয়োজনে তিস্তার পানি ব্যবহার তো করছেই; অপরদিকে শুষ্ক মৌসুমে একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে বাংলাদেশকে সবদিক দিয়ে বঞ্চিত করে যাবে। চীনের সঙ্গে যখন তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত হওয়ার পথে; ঠিক তখনই ভারত এ প্রকল্প করার আগ্রহ দেখিয়ে তিস্তার পানি সংকটকে জিইয়ে রাখার কৌশল নেয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান শুরুর ঠিক এক মাস আগে শেখ হাসিনা দিল্লি সফরে গেলে ভারত এ প্রকল্প নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে এবং সফর শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ প্রকল্পের সমীক্ষা করতে ভারতের একটি কারিগরি দল দ্রুত ঢাকা সফর করবে বলে নরেন্দ্র মোদি ঘোষণা করেন। চীন ও বাংলাদেশের এ যৌথ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারতের ঘোরতর আপত্তি নিয়ে তখন বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি ও সমালোচনা হয়। সে সময় আমার লেখা কয়েকটি নিবন্ধও যুগান্তরসহ অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
মমতা ক্ষমতা হারানোর পর তিস্তাচুক্তি নিয়ে আর বাধা থাকল না বলেই আপাতত মনে হচ্ছে। কারণ, মোদি সরকার ‘দিল্লি-কলকাতার মধ্যে রাজনৈতিক ভিন্নমতই তিস্তাচুক্তি না হওয়ার একমাত্র অন্তরায় বলে এতকাল বলে এসেছে। দিল্লির উঁচু মহল থেকে তখন বলা হতো, মোদি ও মমতার ইগোর লড়াইয়ে তিস্তাচুক্তি আটকে আছে। অতএব, মমতার প্রস্থানের সঙ্গে সঙ্গে ভারতের সেই ঘরোয়া সমস্যাও দূর হয়েছে বলা যায়। এখন চুক্তি না হওয়ার কোনো অজুহাত আর ভারতের হাতে রইল না। ভারত এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তিস্তাচুক্তির ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে পারে। গত সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের একদল সাংবাদিকের দিল্লি সফরকালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিস্তাচুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি হবে কি না প্রশ্ন করা হলে সে দেশের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্র এ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ধরে নেওয়া যাক, ভারত চীনকে ঠেকাতে তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর করতে আগ্রহ দেখাল। বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া কী হবে? বাংলাদেশ কি ভারতকে বিশ্বাস করে সে পথেই এগোবে? প্রশ্ন হচ্ছে, এতকিছুর পরও ভারতের প্রতিশ্রুতির ওপর কতটুকু আস্থা বা বিশ্বাস রাখা যায়? ভারত যদি আবারও চুক্তির কথা বলে সময়ক্ষেপণের কৌশল বেছে নেয়, তাহলে কী হবে? ভারতের প্রতি বিশ্বাস হারানোর যে পরিবেশ ভারত নিজেই তৈরি করেছে, তা কি দূর হয়েছে? হঠাৎ ভারত এমন কী করেছে, তাদের ওপর ভরসা করা যায়? বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের এতদিনের আচরণের পরিপ্রেক্ষিতে এমন প্রশ্ন উঁকিঝুঁকি দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে এ কথাও ঠিক, পারস্পরিক সমস্যার ক্ষেত্রে অবিশ্বাস বা নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে বসে থেকে কোনো ইতিবাচক সমাধান পাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে আলোচনা করতে আপত্তি কী! আলোচনা হলো যোগাযোগ ও সমঝোতার পথ। অবিশ্বাস নিয়ে কথা বললে সম্পর্কের উন্নতি হয় না। বরং সংলাপ, ধৈর্য ও পারস্পরিক আস্থার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের সুযোগ তৈরি হয়।
তবে চীনের সহায়তায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারত যে কৌশলই নেয়, বাংলাদেশকে বসে থাকলে চলবে না। এটি চীনের কোনো প্রকল্প নয়; বাংলাদেশের প্রকল্প। চীন শুধু অর্থনৈতিক ও কারিগরি সাহায্য করতে রাজি হয়েছে। এ প্রকল্পের দায়িত্ব ভারতকে দেওয়া হলে শেষ পর্যন্ত কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, সে বিষয়ে আশঙ্কা আছে। ভারতই তো তিস্তার পানি আটকে দিয়ে সমস্যা তৈরি করেছে। আবার এ প্রকল্প যদি তাদেরই দেওয়া হয়, তাহলে প্রকল্পের খরচ বহন করবে কে? ভারত তো বিনা পয়সায় এ প্রকল্প করে দেবে না? এর সম্পূর্ণ খরচের অর্থ সুদসমেত বাংলাদেশকেই পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশের প্রাপ্য পানি বন্ধ করে দিয়ে সমস্যা তৈরি করে আবার সেই প্রকল্প থেকেও ভারত মুনাফা তুলে নেবে, তা তো হতে পারে না।
তিস্তা মহাপরিকল্পনা মূলত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নদী ব্যবস্থাপনা। এর সুফল পেতে হলে পানির হিস্যা পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করা জরুরি। আন্তর্জাতিক নদী হিসাবে যে পরিমাণ তিস্তার পানি ভারতের কাছ থেকে পাওয়ার কথা, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। কাজেই পানিবণ্টন চুক্তির বিষয়েও জোরালো উদ্যোগ নিতে হবে। তবে শুধু চুক্তি করলেই হবে না। সীমানার ওপারে যদি পর্যাপ্ত পানিই না থাকে; তাহলে শুকনো মৌসুমে আর পানি পাওয়া যাবে না। এ কারণে তিস্তা মহাপরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করা জরুরি; যাতে বর্ষাকালে ভারত পানি ছাড়লে তা ধরে রেখে প্রয়োজনীয় সময়ে কৃষি ও অন্যান্য কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। আশার কথা, সরকারও হয়তো চুক্তির জন্য মহাপরিকল্পনার কাজ ফেলে রাখতে চায় না। তারই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে গত সপ্তাহে চীন সফরে যাওয়ার আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি মন্তব্যে। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্যের উল্লেখ করে লেখাটি শেষ করতে চাই। চীন সফরে যাওয়ার প্রাক্কালে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘তাদের (ভারত) মাইন্ড রিড করা আমার কাজ না। তবে প্রত্যাশা থাকবে, যাতে এ চুক্তিটা, যেটা করার কথা ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটা আমরা কনসিডার করতে পারি কি না। কিন্তু সেজন্য তো বসে থাকা চলবে না, আমাদের কাজ আমাদের করতে হবে।’
একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক
