উচ্চ মূল্যস্ফীতি জনপ্রিয় সরকারকেও অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে
Advertisement
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী
প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে বিরাজমান একটি জটিল সমস্যা হচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। প্রায় চার বছর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে; কিন্তু কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে সাধারণ মানুষের জীবন বিপন্ন হতে চলেছে। করোনা-উত্তর বিশ্ব অর্থনীতি যখন উত্তরণের পর্যায়ে ছিল, ঠিক তখনই শুরু হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই সময় রাশিয়া-ইউক্রেনসহ বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্য উৎপাদন অন্যান্য বছরের মতোই স্বাভাবিক ছিল; কিন্তু যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী পরিবহণব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে খাদ্যপণ্যসহ অন্যান্য আবশ্যিক পণ্যের মূল্য দ্রুত বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়। এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ৪০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। সেই সময় ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকা (ফেড) একাধিকবার পলিসি রেট বৃদ্ধি করে। পলিসি রেট বৃদ্ধিকরণসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তাদের উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৭টি দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব আমেরিকার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে পলিসি রেট বাড়াতে থাকে। অধিকাংশ দেশই তাদের অর্থনীতিতে সৃষ্ট উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়; কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। একসময় বাংলাদেশ ব্যাংকের পলিসি রেট ছিল ৫ শতাংশ। এখন তা ১০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বিগত রাজনৈতিক সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, কেউই সফল হতে পারেনি। পলিসি রেট কমানো প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক একসময় বলেছিল, জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নেমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন পলিসি রেট কমানো হবে; কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের সেই প্রত্যাশা পূরণ হওয়ার ন্যূনতম কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। এদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সৃষ্ট সামরিক সংঘাতের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি তেলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে পরিবহণ এবং পণ্য উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ব অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) সম্প্রতি প্রকাশিত তাদের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’-এ বলেছে, চলতি পঞ্জিকাবর্ষে (২০২৬) বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ, যা আগে দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়ে কিছুটা কম। বাংলাদেশ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। একই প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। আর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বাংলাদেশের জিডিপি প্রক্ষেপণ করেছে ৪ শতাংশ। আইএমএফ-এর প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে, এতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
আইএমএফ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) গড় মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়াতে পারে ৯ দশমিক ২ শতাংশ। এডিবি বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশ থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভয়াবহতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির হার ‘ডাবল জিডিট’ অতিক্রম করে যেতে পারে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পলিসি রেট বাড়ানো একটি গ্রহণযোগ্য কৌশল। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি অনেকদিন ধরেই সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছে। কোনোভাবেই মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না। করোনাকালীন নতুন করে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে, তাদের অধিকাংশই আর আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারেনি। মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪ বছর উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। আগামী মাসগুলোয় মূল্যস্ফীতি আরও বৃদ্ধি পাবে, এটি নিশ্চিত করেই বলা যেতে পারে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মূল্য ছিল ৬০ থেকে ৬৫ মার্কিন ডলার। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা ১২০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়। পরে অবশ্য কিছুটা কমেছে; কিন্তু তারপরও বর্তমানে প্রতি ব্যারেল জ্বালানি তেল ১০০ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। এলএনজির মূল্যও বেড়েছে। জ্বালানি তেল এমন একটি উপকরণ, যা প্রতিটি উৎপাদনকার্যে ব্যবহার করতে হয়। বাংলাদেশ তার মোট ব্যবহার্য জ্বালানির ৬০ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করে থাকে। কাজেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সৃষ্ট সামরিক সংঘাত প্রত্যক্ষভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। পরিবহণ ব্যয় বেড়েছে। অর্থাৎ, জ্বালানিসংশ্লিষ্ট প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয় বেড়েছে। আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনই অভ্যন্তরীণভাবে যেসব পণ্য উৎপাদন করা হয়, তার মূল্যও বৃদ্ধি পাবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রত্যেক মানুষের জীবনেই দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। তবে দুর্ভোগের মাত্রা দরিদ্র এবং নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি; যারা চাকরি করেন, তাদের মজুরি বাড়ছে না। অর্থাৎ, উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে মজুর বৃদ্ধি না হওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে। কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ, আন্তর্জাতিক বাজারে সারের মূল্য বেড়েছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় বাড়বে। কৃষক যদি তার জমিতে সময়মতো সার-কীটনাশক ব্যবহার করতে না পারেন, তাহলে আগামী দিনে খাদ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে মোটামুটি ভালো অবস্থানে থাকায় সংকটকালে খুব একটা সমস্যা হয় না।
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে বর্তমানে দুরবস্থার মধ্যে রয়েছে। একটি সূত্রমতে, দেশের প্রায় অর্ধেক তৈরি পোশাক কারখানা তাদের স্বাভাবিক উৎপাদনকার্য চালাতে পারছে না। কোনো কোনো কারখানায় ৫০ শতাংশ উৎপাদন হচ্ছে। এ মুহূর্তে যদি তৈরি পোশাকশিল্প স্বাভাবিক রাখা না যায়, তাহলে যুদ্ধোত্তরকালে বিশ্বব্যাপী তৈরি পোশাকের যে নতুন চাহিদা সৃষ্টি হবে, তা পূরণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে না। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে যে সামরিক সংঘাত চলছে, তা শুধু এ তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ মুসলিম দেশ এ যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনা আছে এমন মুসলিম দেশগুলোয় ইরান আক্রমণ পরিচালনা করছে। ফলে ওইসব দেশে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে যারা কর্মসংস্থান উপলক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে গমন করেন, তাদের বেশির ভাগই মধ্যপ্রাচ্যের ছয়টি মুসলিম দেশে যায়। যুদ্ধের কারণে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকেই চাকরি হারানোর ভয়ে রয়েছেন। আগামী দিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগামী অর্থবছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই জটিল সমস্যা হিসাবে দেখা দেবে। বাংলাদেশের মতো দেশে অর্থনীতিতে শুধু পলিসি রেট বাড়ানোর মাধ্যমে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না; এজন্য আমাদের আরও কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। একশ্রেণির ব্যবসায়ীর অতি মুনাফা অর্জনের প্রবণতা, পরিবহণ খাতে ব্যাপক চাঁদাবাজি, ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাজারব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বমুখীপ্রবণতা রোধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। শুধু পলিসি রেট বাড়িয়ে আমাদের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না; উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে পলিসি রেট কমানোর তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। আবার পলিসি রেট বেশি হলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বা করণীয় হচ্ছে, যে কোনো মূল্যেই হোক অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা। উচ্চ মূল্যস্ফীতি প্রবল জনপ্রিয় একটি সরকারকে অজনপ্রিয় করে তুলতে পারে। বর্তমান সরকার যেহেতু জনগণের সরকার, তাই এ মুহূর্তে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে।
(অনুলিখন : এমএ খালেক)
ড. মোস্তফা কে. মুজেরী : অর্থনীতিবিদ; নির্বাহী পরিচালক ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট
