শিক্ষা-নৈতিকতা-বাস্তবতা
Advertisement
আবদুল লতিফ মাসুম
প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
সংগৃহীত ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশ আজ এক জটিল ও পরিবর্তনশীল সময় অতিক্রম করছে। একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বৈশ্বিক সংযোগের বিস্তার ঘটছে; অন্যদিকে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, সামাজিক বিভাজন, দুর্নীতি, সহিংসতা, মাদকাসক্তি, সাইবার অপরাধ, অসহিষ্ণুতা এবং মূল্যবোধের সংকট ক্রমাগত বাড়ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে-শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন কি একটি জাতিকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে পারে? ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অভিজ্ঞতা বলে, উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি শুধু অর্থ বা প্রযুক্তি নয়; বরং নৈতিকতা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক আস্থার ওপরই একটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নির্ভর করে।
নৈতিক শিক্ষা মূলত এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা, মানবিকতা ও দেশপ্রেমের মতো মূল্যবোধ গড়ে ওঠে। এটি শুধু ধর্মীয় অনুশাসন বা আচরণগত নির্দেশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণমুখী চেতনা বিকাশের একটি সামগ্রিক শিক্ষাপদ্ধতি। এরিস্টটল বলেছিলেন, মানুষের হৃদয় ও নৈতিক চেতনাকে শিক্ষিত না করে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক উন্নয়ন প্রকৃত শিক্ষা হতে পারে না। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এ বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, আজ আমাদের সমাজে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে; কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকটও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানী এমিল দুর্খেইম নৈতিক শিক্ষাকে সামাজিক সংহতির মূলভিত্তি হিসাবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মতে, সমাজ তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন নাগরিকদের মধ্যে একটি সাধারণ নৈতিক চেতনা বিদ্যমান থাকে। নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে গেলে সমাজে বিশৃঙ্খলা, স্বার্থপরতা ও অরাজকতা বাড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা এ তত্ত্বকে নতুনভাবে সত্য প্রমাণ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নকল, প্রশ্নফাঁস, অসততা; প্রশাসনে দুর্নীতি; সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও বিদ্বেষ; তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি ও সহিংসতা-এসব শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৃহত্তর নৈতিক সংকটের বহিঃপ্রকাশ।
লরেন্স কোলবার্গ তার মরাল ডেভেলপমেন্ট তত্ত্বে দেখিয়েছেন, মানুষের নৈতিক বিকাশ ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে এবং শিক্ষা সেই বিকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ নৈতিক আচরণ জন্মগত নয়; এটি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বিত চর্চার মাধ্যমে তৈরি হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও প্রতিযোগিতানির্ভর হয়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদের সামনে জিপিএ, চাকরি ও অর্থনৈতিক সফলতাকেই মূল লক্ষ্য হিসাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে; ফলে চরিত্রগঠন, মানবিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পাওলো ফ্রেইরে তার বিখ্যাত গ্রন্থ পেডাগগি অব দ্য অপ্রেস্ডে বলেছেন, শিক্ষা যদি মানুষকে মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে না পারে, তবে তা শুধু যান্ত্রিক দক্ষতা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়। বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষা বাস্তবতায় এ সমালোচনা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
বর্তমান ডিজিটাল যুগে নৈতিক শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, তথ্যপ্রাপ্তিকে দ্রুত করেছে এবং বৈশ্বিক যোগাযোগকে সম্প্রসারিত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, অপপ্রচার, সাইবার বুলিং, অনলাইন প্রতারণা এবং অশালীন কনটেন্টের বিস্তার তরুণ সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি জ্ঞানের মাধ্যম না হয়ে আসক্তির উপকরণে পরিণত হচ্ছে। ফলে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, ডিজিটাল নৈতিকতা বা ডিজিটাল এথিকস এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি। তরুণদের শেখাতে হবে কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ করতে হয়, কীভাবে মতভিন্নতাকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হয় এবং কীভাবে প্রযুক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করতে হয়।
বাংলাদেশে নৈতিক সংকটের অন্যতম বড় দিক হলো দুর্নীতির সংস্কৃতি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, দুর্নীতি এখনো বাংলাদেশের অন্যতম সামাজিক ও প্রশাসনিক সমস্যা। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না; এটি মানুষের মধ্যে আস্থা ধ্বংস করে, সামাজিক ন্যায়বিচার দুর্বল করে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের বিশ্বাস নষ্ট করে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায়ও উল্লেখ করা হয়েছে যে টেকসই উন্নয়নের জন্য সুশাসন, জবাবদিহি ও নৈতিক সংস্কৃতি অপরিহার্য। অর্থাৎ নৈতিকতা ছাড়া উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
নৈতিক শিক্ষা শুধু বিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব নয়; পরিবার, সমাজ, গণমাধ্যম এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও এ প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবার হলো শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিশুরা পরিবার থেকেই সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে পারিবারিক সম্পর্কের দুর্বলতা, অতিরিক্ত ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের মানবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। একইভাবে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সমাজের মূল্যবোধ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদি সমাজে অসততা ও দুর্নীতিকে সফলতার প্রতীক হিসাবে উপস্থাপন করা হয়, তবে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। তাই সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিকতার ইতিবাচক চর্চা নিশ্চিত করা জরুরি।
বিভিন্ন উন্নত রাষ্ট্র বর্তমানে নৈতিক শিক্ষাকে নতুনভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। জাপানে বিদ্যালয় পর্যায়ে মরাল এডুকেশন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ফিনল্যান্ডের শিক্ষাব্যবস্থায় সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুরে ক্যারেক্টার অ্যান্ড সিটিজেনশিপ এডুকেশন জাতীয় শিক্ষানীতির অংশ। ইউনেস্কোর Education for Sustainable Development (ESD) কাঠামোতেও নৈতিকতা, মানবিকতা ও বৈশ্বিক নাগরিকত্বকে টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হয়েছে। কারণ, শুধু প্রযুক্তি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; মানবিক ও নৈতিক উন্নয়ন ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ হতে পারে না।
বাংলাদেশে নৈতিক শিক্ষা কার্যকর করতে হলে শিক্ষাক্রমে বাস্তবভিত্তিক মূল্যবোধ শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শুধু বইভিত্তিক নৈতিক শিক্ষা যথেষ্ট নয়; বরং শিক্ষার্থীদের সামাজিক কার্যক্রম, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ, কমিউনিটি সার্ভিস এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের নৈতিক নেতৃত্বের দক্ষতা বাড়াতে হবে, কারণ একজন শিক্ষক নিজেই শিক্ষার্থীর জন্য জীবন্ত উদাহরণ। একই সঙ্গে পরিবারভিত্তিক সচেতনতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল নাগরিকত্ব শিক্ষা, দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক আন্দোলন এবং তরুণদের ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও মানবিক করতে হলে নৈতিক শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে। একটি নৈতিক সমাজই পারে দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, মানবিক রাজনীতি, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়ে তুলতে। তাই আজকের বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু দক্ষ মানুষ নয়; বরং নৈতিক মানুষ। কারণ নৈতিকতা ছাড়া উন্নয়ন শুধু বাহ্যিক অগ্রগতি সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু একটি আদর্শ জাতি নির্মাণ করতে পারে না।
আবদুল লতিফ মাসুম : অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
