Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্নের মুখে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাধিকার

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রশ্নের মুখে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাধিকার

Advertisement

১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন পাশের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গণতন্ত্রের পথে সব নাগরিকের ভোটাধিকারের পক্ষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। ওই সময়ে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কেবল যে সীমিত ছিল, তাই নয়; কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব প্রায় অস্তিত্বহীন ছিল। তারা আমেরিকান জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও কংগ্রেসের নিুকক্ষ বা প্রতিনিধি পরিষদে তাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল ২ শতাংশের কম এবং সিনেটে একজন কৃষ্ণাঙ্গ সদস্যও ছিল না। ভোটাধিকারের নতুন আইন কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটদানের বাধাগুলো দূর করে তাদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দরজা খুলে দেয়। কারণ, এটিই ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ। এ অগ্রগতি আকস্মিক ছিল না, এটি ছিল দীর্ঘ সংগ্রামের বাস্তব ও ইতিবাচক ফল। যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোয় বসবাসকারী কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের একটি প্রজন্ম, যারা দাসত্বের উত্তরাধিকার বয়ে বেড়ে ওঠে, তারা তাদের ভোটাধিকারের বাধা দূর করতে এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আদালতে এবং রাজপথে লড়াই করেছেন।

কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে আমেরিকান সুপ্রিমকোর্টের এক রায়ে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিকদের ভোটাধিকার আবারও সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা (৬-৩) একমত পোষণ করেছেন যে, আমেরিকান কংগ্রেসের নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণের ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যগুলোর জাতি ও বর্ণগত জনসংখ্যার ওপর নির্ভর করা সংগত নয়। এটি এমন একটি রায়, যা কৃষ্ণাঙ্গ, হিসপানিক ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধি নির্বাচন কঠিন করে তুলবে। সুপ্রিমকোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামত বর্ণবাদকে অতীতের সমস্যা হিসাবে বর্ণনা করেছে। ভিন্নমত পোষণকারী তিন বিচারপতি রায়টিকে বর্ণবাদের পুনরুত্থানের আরেকটি দৃষ্টান্ত হিসাবে দেখেছেন। বিপুলসংখ্যক কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানের জন্য সুপ্রিমকোর্টের এ সিদ্ধান্ত তাদের সিভিল রাইটস মুভমেন্টের অর্জিত আকাক্সক্ষার ওপর মৃত্যু পরোয়ানার মতো। যেসব অঙ্গরাজ্যে কোনো নির্বাচনি এলাকায় কৃষ্ণাঙ্গ জনসংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ বা বেশি, আদালতের রায়ে তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা চাইলেও পছন্দের প্রার্থীর পক্ষে কংগ্রেসে নির্বাচিত হওয়া সম্ভব হবে না।

এমন একটি অঙ্গরাজ্য টেনেসি। সেখানে ফায়েট কাউন্টিকে ঘিরে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা উদ্বিগ্ন। পশ্চিম টেনেসির পশ্চিমাঞ্চলীয় কৃষিনির্ভর এ অঞ্চলটি এখন আমেরিকার গণতন্ত্র, বর্ণরাজনীতি এবং সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আদালতের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ফায়েট কাউন্টির কৃষ্ণাঙ্গ বাসিন্দারা বলছেন, বহু বছরের আইনি লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তারা যে রাজনৈতিক কণ্ঠ ফিরে পাওয়ার আশা করেছিলেন, সুপ্রিমকোর্টের সাম্প্রতিক রায় সেই আশাকে নিরাশার অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এ আশঙ্কা কারও ব্যক্তিগত ভয় নয়, বরং সমগ্র আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গ সম্প্রদায়ের। ফায়েট কাউন্টির বাসিন্দাদের ২৫ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ হওয়া সত্ত্বেও ইতঃপূর্বে অনুষ্ঠিত কাউন্টি কমিশনের নির্বাচিত ১৯ সদস্যের সবাই ছিলেন শ্বেতাঙ্গ। এর কারণ নির্বাচনি এলাকা এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল, যাতে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের রাজনৈতিক শক্তি কার্যত ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়। গত বছর ওই কাউন্টিতে মেজরিটি-মাইনরিটিভিত্তিক কংগ্রেসের তিনটি নির্বাচনি এলাকার সীমানা অনুমোদন করায় কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা তাদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির আশা করেছিল। সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্ত তাদের হতাশ করেছে; সংখ্যালঘু ভোটারদের রাজনৈতিক অধিকার রক্ষার প্রধান আইনি হাতিয়ার ভেঙে গেছে।

আইন বিশ্লেষকদের মতে, কোনো আইন বা উচ্চ আদালতের রায় যদি সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটের শক্তি হ্রাস করে, তাহলে কোনো অঙ্গরাজ্য বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সমতাভিত্তিক নির্বাচনি ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব হবে না। সুপ্রিমকোর্টের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে এ ধরনের দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি করতে পারে। ফলে স্থানীয় সরকার, স্কুল বোর্ড ও কাউন্টি কমিশনে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব সংরক্ষণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। টেনেসির ফায়েট কাউন্টির ইতিহাস স্বয়ং আমেরিকার বর্ণবৈষম্যের এক ভয়াবহ দলিল। ১৯৬৫ সালে ভোটাধিকার আইন পাশ হলেও কৃষ্ণাঙ্গ কৃষিশ্রমিকরা যখন ভোটার হিসাবে নিবন্ধন শুরু করে, তখন জমির শ্বেতাঙ্গ মালিকরা অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারকে উচ্ছেদ করেছিল। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে হাজার হাজার কৃষ্ণাঙ্গ পরিবার তাঁবুর নিচে অস্থায়ী শিবিরে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছিল।

১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইন প্রণীত হওয়ার আগে দক্ষিণের শ্বেতাঙ্গপ্রধান রক্ষণশীল রাজ্যগুলোয় কৃষ্ণাঙ্গ-আমেরিকানদের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। ইউএস সেন্সাস ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট ৩৪ কোটি ৪০ জনসংখ্যার মধ্যে ৫ কোটি ১৬ লাখের বেশি ছিল কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান, অর্থাৎ জনসংখ্যার ১৫.২ শতাংশ। ১৯৬৫ সালে প্রতিনিধি পরিষদে যেখানে কৃষ্ণাঙ্গ সদস্য ছিল ৯ জন, এখন তা ৬০ জনে উন্নীত হয়েছে, অর্থাৎ মোট প্রতিনিধি সংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ। ছয় দশক আগে আইনটি পাশ হওয়ার পর আড়াই লাখের বেশি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান ভোটাধিকার লাভ করে। সেন্সাস ব্যুরোর পরিসংখ্যানে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ কোটি ২০ লাখ। অর্থাৎ এ পর্যায়ে পৌঁছতে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ৬০ বছর সময় লেগেছে। অবশেষে প্রতিনিধি পরিষদে আমেরিকান জনসংখ্যার কৃষ্ণাঙ্গ অংশের প্রতিনিধিত্বে সমতা এসেছে; কিন্তু সিনেটে এখনো তা হয়নি। সিনেটের ১০০ সদস্যের মধ্যে মাত্র ৫ জন বা ৫ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ, যা জনসংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের অনেক নিচে।

এ অবস্থায় যেখানে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের জন্য টেকসই সুরক্ষা ও কার্যকর নীতি প্রয়োজন, সেখানে সুপ্রিমকোর্টের নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণের ওপর রায় প্রতিনিধিত্বের চিত্র ওলটপালট করে দিতে পারে বলে অধিকার সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে। কারণ, এ রায়ের ফলে ১৯৬৫ সালের ভোটাধিকার আইন দুর্বল হয়েছে, নির্বাচনের ওপর ফেডারেল তদারকি হ্রাস পেয়েছে এবং বৈষম্যমূলক ভোট প্রদান ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগকে কঠিন করে তুলেছে। এককথায়, কৃষ্ণাঙ্গদের ষাট বছরের অর্জন হুমকির মধ্যে পড়েছে। কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য যেখানে পরিকল্পিতভাবে নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণ করা উচিত, সেখানে এলাকা নির্ধারণে কৃষ্ণাঙ্গদের সংখ্যাসাম্যের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ায় পক্ষপাতমূলক প্রভাব বিস্তারের আদলে বর্ণগত প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা সব বর্ণের আমেরিকানের জন্য গণতন্ত্রকে খেলো করে ফেলবে। এতে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন কোনো রাজনৈতিক দল ও সেই দলের প্রার্থীর অধিক রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা বা ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ পক্ষের প্রার্থীকে বিজয়ী করার উদ্দেশ্যে নির্বাচনি এলাকা নির্ধারণ করা হয়, তখন তারা কোনো সম্প্রদায়ের জাতি বা বর্ণগত পরিচয় স্পষ্টভাবে উল্লেখ না করেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষমতাকে হ্রাস করতে পারে।

কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের নিজস্ব প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের নির্বাচনি এলাকার ওপর নির্ভর করে। তাছাড়া নির্বাচনি এলাকার প্রশ্ন কেবল নির্বাচনে কারা জয়ী হবে তা নয়, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সম্পদ বণ্টনের নীতিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, সে বিষয়গুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ যে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কার স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবেন। ভোট পর্যবেক্ষকদের মতে, টেনেসি অঙ্গরাজ্যে ফায়েট কাউন্টির কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার এ সংগ্রাম প্রকৃতপক্ষে সমগ্র আমেরিকার গণতন্ত্রের প্রতিচ্ছবি। প্রশ্ন এখন শুধু একটি কাউন্টির নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্র কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে সংখ্যালঘু ভোটাধিকার আবারও সীমিত হয়ে পড়বে?

গত বছর ফায়েট কাউন্টির নতুন যে নির্বাচনি এলাকা অনুমোদিত হয়েছে, সে সম্পর্কে রাজ্যের নির্বাচন বোর্ড ছাড়াও কাউন্টিপ্রধান আশ্বাস দিতে চেষ্টা করেছেন, ২০৩০ সালের আগে নির্বাচনি এলাকার নতুন নির্ধারিত সীমানা বাতিল করার কোনো পরিকল্পনা নেই। কিন্তু স্থানীয় কৃষ্ণাঙ্গদের বড় অংশ এ আশ্বাসে ভরসা করতে পারছেন না। তাদের মতে, ইতিহাস তাদের শিখিয়েছে-অধিকার কখনো স্থায়ীভাবে নিশ্চিত হয় না; প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে তা রক্ষা করতে হয়। যারা ভোটাধিকার আইন পাশ করার জন্য সংগ্রাম করেছেন, তাদের উত্তরাধিকারীরা সুপ্রিমকোর্টের রায়ে বিস্মিত ও বিধ্বস্ত বোধ করছেন যে, ৬০ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষরা যে অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন, এখন একই অধিকার নতুন করে প্রতিস্থাপনের জন্য তাদের সংগ্রাম করতে হবে। তারা আশাবাদী, কংগ্রেসে কৃষ্ণাঙ্গ প্রতিনিধিত্ব হ্রাস করার চেষ্টার কারণে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যগুলোয় নাগরিক অধিকার আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করবে সমপ্রতিনিধিত্ব, সুবিচার ও সব ক্ষেত্রে সমতা প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম