Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

বাইফোকাল লেন্স

সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের নয়া সমীকরণ

Advertisement

Icon

একেএম শামসুদ্দিন

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সম্পর্কোন্নয়নে ভারতের নয়া সমীকরণ

Advertisement

২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারত যে অবস্থান নিয়েছিল, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হওয়ার পর আগের অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন করে সম্পর্কোন্নয়নে ইচ্ছা প্রকাশ করেছে। ভারত এখন বাংলাদেশের সঙ্গে পুরোনো ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ সম্পর্কের পরিবর্তে একটি ‘কাঠামোগত ও বাস্তববাদী’ (Institutional and Pragmatic) সম্পর্ক স্থাপনের দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে। আগের মতো একক কোনো দলের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক অংশীজনের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে মনোযোগ দেবে বলেও মতপ্রকাশ করেছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশের ‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ’ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছে। ভারতের নীতিনির্ধারক মহল, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন এমন রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূতদের দেওয়া সাম্প্রতিক কিছু বক্তব্য ও বিবৃতি পর্যালোচনা করে মনে হয়েছে, ভারত আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে চাচ্ছে। ভারত এখন অতীতের ‘আবেগী’ সম্পর্কের বাইরে এসে পারস্পরিক স্বার্থ ও বাস্তববাদী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সঙ্গে নতুন অধ্যায় শুরু করতে চায়, যেখানে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা হবে মূল ভিত্তি।

এ মাসের গোড়ার দিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের একটি প্রতিনিধি দলের নয়াদিল্লি সফরকালে সে দেশের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্র ও বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তাদের দেওয়া বক্তব্যে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ৪ মে বিকালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রশ্নোত্তর পর্বে দুদেশের সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে গিয়ে বিক্রম মিশ্র চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর স্থবির হয়ে পড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনার কথা বলেন। বাংলাদেশের নবগঠিত সরকারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর্যায়ে যোগাযোগ ও দ্বিপক্ষীয় প্ল্যাটফর্মের বৈঠক আয়োজনের উদ্যোগ এবং দুদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারে দুপক্ষের মধ্যে এক ধরনের ‘বোঝাপড়া’ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ভারত এখন মনে করে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার ভিত্তিতে। দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে বিশেষ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন আছে বলেও ভারত মনে করে। মতবিনিময়কালে ‘বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, সেটা বাংলাদেশই ঠিক করবে’ বলেও বিক্রম মিশ্র উল্লেখ করেন। তার এ বক্তব্য, ভারতের আগের অবস্থান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিলেও তিনি যা বলেছেন, তা মিন (Mean) করেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে। সন্দেহের অবশ্য কারণও আছে। বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক করবে, তা সম্পূর্ণ বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়। অথচ ২০০৯-২০২৪ সালে প্রকাশ্যেই বাংলাদেশের তৎকালীন একাধিক মন্ত্রীর মুখে এসব বিষয়ে ভারতের পছন্দ ও অপছন্দের কথা শোনা গিয়েছিল। বর্তমানে বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে ভারত যে নতুন করে কাজ করার ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিক্রম মিশ্রের বক্তব্যে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিক্রম মিশ্র সচেতনভাবেই অস্পষ্ট রেখেছেন। তা হলো, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণে বাংলাদেশের অনুরোধের বিষয়ে ভারতের সিদ্ধান্ত জানতে চাইলে বিক্রম মিশ্র একাধিকবার এড়িয়ে যান। তবে, বাংলাদেশের অনুরোধ এভাবে অগ্রাহ্য করে দুদেশের সম্পর্কোন্নয়ন কতটুকু সম্ভব, সে প্রশ্ন কিন্তু রয়েই গেল।

৫ মে বাংলাদেশের গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের সঙ্গে নয়াদিল্লির সুষমা স্বরাজ ভবনে মতবিনিময়কালে বাংলাদেশে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পঙ্কজ শরণও বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। পঙ্কজ শরণ বর্তমানে ভারতের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি ইনস্টিটিউট বা ন্যাটস্ট্র্যাটের কনভেনর হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। ন্যাটস্ট্র্যাট হলো ভারতের একটি স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক বা গবেষণা সংস্থা। এটি মূলত ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি, কৌশলগত বিষয় এবং ভূ-রাজনীতি নিয়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণ করে ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রয়োজনীয় তথ্য, কৌশল এবং নীতিনির্ধারণী পরামর্শ দিয়ে থাকে। পঙ্কজ শরণ বলেছেন, জনগণের ব্যাপক সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসায় বিএনপির এ সরকারের সময় আগের তিক্ততার পুনরাবৃত্তি দেখতে চায় না ভারত।

সম্প্রতি বিধানসভা নির্বাচনের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতার পালাবদল হওয়ায় দুদেশের সম্পর্কোন্নয়নে এর প্রভাব পড়তে পারে। কারণ, এতদিন পশ্চিমবঙ্গকে দেখা হতো অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পীঠস্থান হিসাবে। ভারতের স্বাধীনতার এতগুলো বছর পেরিয়ে গেলেও পশ্চিমবঙ্গে ধর্মাশ্রয়ী কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসতে পারেনি; কিন্তু এবার প্রবল হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপির বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়া সবাইকে অবাক করেছে। ভারতের এ মৌলবাদী দলের নেতারা তাদের নির্বাচনি প্রচারণার প্রথম থেকেই তীব্র মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। এসব নেতা প্রচারকালে ক্রমাগত বলে গেছেন, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি মুসলিম পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশ করে ডেমোগ্রাফির ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে; যার প্রভাব পড়েছে সেখানকার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনীতিতে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষও এসব কথা বিশ্বাস করে ভোট দিয়ে কট্টর বাংলাদেশবিরোধী শুভেন্দু অধিকারীকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বা সনদ ছাড়া প্রকাশ্যে গবাদিপশু জবাই বন্ধ করে মুসলিমদের এতদিনের ধর্মীয় আচরণবিধিকে বাধাগ্রস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। এছাড়া আন্তর্জাতিক সীমান্তের অবশিষ্টাংশে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের নির্দেশ দিয়ে বাংলাদেশের প্রতি তার মনোভাবের বহিঃপ্রকাশও ঘটিয়েছেন। ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে ভোটের ঠিক আগে আগে ৩১ লাখ বাঙালি মুসলিমকে ভোট দেওয়া থেকে বিরত রেখে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী বলে তাদের বিরুদ্ধে যে প্রচার রয়েছে, তাদের ব্যাপারে এখন কী সিদ্ধান্ত হয়, তা নিয়ে বাংলাদেশের চিন্তার কারণ আছে। পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া আসাম ও ত্রিপুরাতেও এখন বিজেপি ক্ষমতায়। বাংলাদেশের চারপাশ থেকে ধর্মাশ্রয়ী এ দলের উগ্র-মেজাজি নেতারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের স্বরে প্রতিনিয়ত যেভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা যদি বন্ধ না হয়, তাহলে ভারত যতই সম্পর্কোন্নয়নের কথা বলুক, আদতে ভালো ফল বয়ে আনবে না।

ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর ঐতিহাসিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আধিপত্যবাদী মনোভাবের কারণে তা হয়ে ওঠেনি। সম্পর্কোন্নয়নে বড় রাষ্ট্র হিসাবে ভারতকেই সে মনোভাব ত্যাগ করে এগিয়ে আসতে হবে। এতদিন ভারত নানাভাবে বাংলাদেশকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছে। তারপরও যদি তারা উপলব্ধি না করে, বাংলাদেশের মানুষ অতীতেও যেমন আধিপত্যবাদকে সহ্য করেনি এবং ভবিষ্যতেও করবে না, তাহলে ভুল করবে। ভারত যদি সত্যিই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো করতে চায়, তাহলে তাদের অভিসন্ধিমূলক মনোভাব (গোপন এবং অসৎ পরিকল্পনা) ত্যাগ করে এগিয়ে আসতে হবে। দুদেশের সম্পর্ক ভালো করার জন্য যৌথ নদীব্যবস্থাপনায় পানির ন্যায্য বণ্টন, সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা, বাণিজ্যিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিক সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আস্থার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, বিচারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে। তিস্তাচুক্তি স্বাক্ষর এবং ফারাক্কাচুক্তি নবায়ন হোক বা না হোক, এ দুটো নদীর পানিব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশের গৃহীত পদক্ষেপের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের পাশাপাশি চীন, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইছে, ভারতকে তা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখতে হবে। সম্পর্ককে শুধু নিরাপত্তা ও বাণিজ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, জনসাধারণের আস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তুলতে হবে।

একইভাবে ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মনোভাবেরও পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তার ব্যাপারে বাংলাদেশকেও ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শন করতে হবে। বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে আরও সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি, শেখ হাসিনার করে যাওয়া ভারত-বাংলাদেশের চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কিছু পাওয়া গেলে ভারতের সঙ্গে বসে পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সেগুলোর নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে ভারতের সঙ্গে নতুন সমঝোতার মাধ্যমে রেল, সড়ক ও নৌপথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করে আঞ্চলিক বাণিজ্য সহজতর করা যেতে পারে। মোদ্দা কথা, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে আস্থার সংকট কাটিয়ে সমতার ভিত্তিতে নতুনভাবে ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ তৈরি করতে হবে, যা দুদেশের মানুষেরই উপকারে আসে।

একেএম শামসুদ্দিন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, কলাম লেখক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম