প্রাক-বাজেট ভাবনায় ক্ষুদ্রঋণ
Advertisement
তারিক সাইদ হারুন
প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
অর্থনীতির অন্যতম রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা হচ্ছে ঋণ। একটি দেশের অর্থনীতিতে সঞ্চয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই সেই সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত করার জন্য কার্যকর ঋণব্যবস্থাও অপরিহার্য। এর প্রধান কারণ, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত সঞ্চয় বা আমানত যখন কৃষি, শিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসা কিংবা নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে ঋণ আকারে পৌঁছে যায়, তখনই কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, উৎপাদন বাড়ে এবং অর্থনীতিতে গতি আসে।
প্রাক-বাজেট ভাবনায় ব্যাংক ঋণ বা ক্ষুদ্রঋণ আলাদাভাবে ভাবতে হচ্ছে। কারণ, এমন একসময় আগামী বাজেট আসছে, যখন দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে এসেছে। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো ক্রমেই বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে ট্রেজারি বন্ড ও বিলে, পুঁজিবাজারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে-কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন কোথা থেকে আসবে? এ বাস্তবতায় ক্ষুদ্রঋণ খাতকে নতুনভাবে ভাবার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন বেশি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ কোটি টাকা। আগের বছর এটি ছিল ১৮.৮৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে আমানত বেড়েছে ১১.৫৭ শতাংশ। অন্যদিকে ট্রেজারি বিল ও বন্ডে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ এক বছরের ব্যবধানে ৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫.৩৮ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা আগের বছর ছিল ৩.৮২ লাখ কোটি টাকা। ২০২৫ সাল শেষে ব্যাংকিং খাতের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.০৯ লাখ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় মাত্র ৬ শতাংশ বেশি। নিশ্চিত মুনাফার কারণে ব্যাংকগুলো এখন ব্যবসায়িক ঋণ দেওয়ার বদলে সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগে বেশি ঝুঁকে পড়ছে। একদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে একুশ বছরের মধ্যে সর্বনিু পর্যায়ে নেমে এসেছে, অন্যদিকে সরকারের ঋণগ্রহণ ২৪ শতাংশ বেড়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। এর ফলে মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে ব্যাংকগুলোর আয়ের কাঠামোও। পরিচালন আয়ের বড় অংশ এখন প্রথাগত ঋণের বদলে সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আসছে।
বলতে দ্বিধা নেই, এ প্রবণতা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতোমধ্যেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। শিল্প বিনিয়োগের অন্যতম সূচক মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ১০.৪৩ শতাংশ কমেছে। সরকারি ঋণের প্রায় ৬৭ শতাংশ এখন ব্যাংকগুলো ধারণ করছে। ব্যাংকিং খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাত (সিএআর) ১.৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিু ১২.৫ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যায়, যা বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, ট্রেজারি আয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরশীলতা শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমিয়ে দেবে।
কর্মসংস্থানের গতি কমে গেলে নিঃসন্দেহে তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে দারিদ্র্য বিমোচন প্রক্রিয়ায়। বিশ্বব্যাংক বলছে, গত চার বছর ধরে দেশে দরিদ্রের হার বাড়ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়াই এর মূল কারণ বলে মনে করে বিশ্বব্যাংক।
নতুন সরকার অর্থনীতিতে চাঙাভাব আনার জন্য ইতোমধ্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষি খাত, কর্মসংস্থান এবং ডিজিটালাইজেশনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে কৃষি খাত অন্যতম প্রধান ভিত্তি, জিডিপিতে যার অবদান প্রায় ১১১৩ শতাংশ। প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এ কৃষি খাত, একই সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে। শিল্প ও সেবা খাতের প্রসারের কারণে জিডিপিতে এর অবদান ক্রমশ কমলেও গ্রামীণ আয় বৃদ্ধি ও রপ্তানি আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসাবেই কৃষি এখনো দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
কিন্তু দেশে মোট বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ২ শতাংশ কৃষি খাতে যায়। আবার কৃষি খাতে বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই যায় ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) মাধ্যমে। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ বিতরণ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। ২০২৪ সালে তারা ৩ কোটি ২১ লাখ ঋণগ্রহীতার মাঝে প্রায় ২ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করেছে। সহজ ভাষায় বললে, গ্রামীণ ও কৃষি অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
নানাবিধ প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ ব্যাংক কৃষিঋণ বাড়াতে প্রভিশন সংরক্ষণে ব্যাংকগুলোকে ছাড় দিয়েছে। এসব ঋণের বিপরীতে মাত্র ০.৫ শতাংশ প্রভিশনিং নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগে ছিল ১-৫ শতাংশ। সরকার কৃষি ঋণকে ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। সন্দেহ নেই, প্রভিশনিং কমানোর ফলে কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ বাড়বে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, প্রান্তিক পর্যায়ে এ ঋণ কার্যকরভাবে পৌঁছে দিতে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া কঠিন।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৭০০ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান ৪ কোটি ১৫ লাখ সদস্য নিয়ে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৮৪ শতাংশ মানুষ এখন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে যুক্ত। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রতিবছর আনুমানিক ৮-১০ লাখ নতুন বা সম্প্রসারিত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে। উদ্যোক্তা উন্নয়নেও এ খাত উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে। ক্ষুদ্রঋণ গ্রাহকদের মধ্য থেকে প্রতিবছর প্রায় ৭ শতাংশ নতুন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ বা এসএমই গ্রাহক তৈরি হচ্ছে।
এ খাতের ঋণস্থিতি প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা। বিতরণকৃত ঋণের বড় অংশ সদস্যদের সঞ্চয় এবং ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত থেকে এলেও বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং পিকেএসএফ থেকেও ঋণ নিতে হয়। এ সেক্টরের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৫ শতাংশ হলেও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো তহবিল সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সাড়ে চার দশক ধরে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কাজ করে যাচ্ছে। এ তহবিল সংকট না থাকলে প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো আরও বড় অবদান রাখতে পারত। একদিকে ব্যাংকগুলো যথাযথ বিনিয়োগ করতে পারছে না, অন্যদিকে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো তহবিল সংকটে ভুগছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল সংকট নিরসনে একটি বিশেষ ফান্ড গঠন বা কার্যকর উদ্যোগ নিলে দারিদ্র্য বিমোচন ও কর্মসংস্থান আরও বেগবান হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা কঠিন। যখন বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমছে, শিল্প বিনিয়োগ স্থবির হচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি মন্থর হয়ে পড়ছে, তখন ক্ষুদ্রঋণ খাত নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, এ খাত শুধু ঋণ বিতরণই করে না; এটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উৎপাদন, সঞ্চয়, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে। দেশের বিস্তৃত গ্রামীণ নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষিত কর্মীবাহিনী এবং তৃণমূলভিত্তিক অভিজ্ঞতাকে যথাযথ নীতিসহায়তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত করা গেলে ক্ষুদ্রঋণ খাত ভবিষ্যতে কর্মসংস্থান, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা এবং দারিদ্র্য বিমোচনে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবে। আসন্ন বাজেটে তাই ক্ষুদ্রঋণ খাতকে শুধু সামাজিক উন্নয়ন কর্মসূচি হিসাবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসাবে বিবেচনা করার সময় এসেছে।
তারিক সাইদ হারুন : ক্ষুদ্রঋণ বিশেষজ্ঞ
