দৃষ্টিপাত
ত্যাগের মহিমায় উজ্জ্বল
Advertisement
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের দুটি প্রধান আনন্দ উৎসব হচ্ছে ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা। এক মাস কঠিন সিয়াম সাধনার পর রোজা ভাঙার আনন্দই হচ্ছে ঈদুল ফিতর। আর আল্লাহর প্রতি বান্দার আনুগত্য প্রদর্শনের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা হচ্ছে ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার প্রধান অনুষঙ্গ হচ্ছে আল্লাহর নামে পশু কুরবানি করা। কুরবানিকৃত পশুর রক্ত বা গোশত কোনোটিই আল্লাহর কাছে পৌঁছে না। আল্লাহ শুধু তার বান্দার আনুগত্যের প্রমাণ চান কুরবানির মাধ্যমে। সংসারের ব্যয়ভার নির্বাহ করার মতো অর্থসম্পদ রেখে কুরবানির দিন যদি সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণ অথবা ৫২ ভরি রৌপ্য অথবা সমপরিমাণ নগদ অর্থ সঞ্চিত আছে, এমন মুসলমানের ওপর সাধ্যমতো পশু কুরবানি করা ওয়াজিব। কুরবানির মাধ্যমে প্রাপ্ত পশুর মাংসের এক ভাগ দরিদ্র মানুষের মাঝে বিলি করতে হয়। এক ভাগ কুরবানিদাতা নিজের পরিবারের সদস্যদের খাবারের জন্য রাখতে পারেন এবং অবশিষ্ট এক ভাগ আত্মীয়স্বজনদের মাঝে বিলি করবেন-এটাই ইসলামসম্মত রীতি। বিত্তবানের সম্পত্তিতে দরিদ্র মানুষের ‘হক’ আছে। কুরবানির মাধ্যমে কিছুটা হলেও সেই হক আদায় করা সম্ভব কিন্তু বর্তমানে কুরবানি যেন লোকদেখানো একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। কে কত বড় পশু কুরবানি দিতে পারেন, তার একটি প্রতিযোগিতা চলে। কুরবানির পশুর গোশত দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণের সময় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে, যা কোনোমতেই কাম্য নয়। দরিদ্র মানুষের কাছে কুরবানির গোশত বিতরণের সময় মনে রাখতে হবে, এটা দরিদ্র মানুষের প্রতি করুণা নয়, তাদের হক আদায় করা মাত্র।
আমাদের দেশে যারা প্রতিবছর ঈদুল আজহার সময় পশু কুরবানি দেন, তাদের অনেকেরই কুরবানি শুদ্ধ হয় না। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয়। হারামভাবে উপার্জিত অর্থ দিয়ে কুরবানি করা হলে সেটাও আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। প্রতারণার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে কুরবানি করা হলে তা-ও আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে না।
আগামী ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। ঈদুল আজহার প্রসঙ্গ এলেই নানা স্মৃতি মনে পড়ে। বিশেষ করে ছোটবেলার সেই রঙিন দিনগুলো স্মৃতিপটে ভেসে ওঠে। ছোটবেলার ঈদ কতই না আনন্দের ছিল। পরিবারের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা অধীর আগ্রহের সঙ্গে ঈদ উদযাপনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। উভয় ঈদে পরিবারের বাচ্চাদের জন্য নতুন পোশাক ক্রয় করা হয়। ঈদের আগে মুরব্বিরা নতুন জামা-কাপড় কিনে আনতেন। আমরা সেসব জামা-কাপড় লুকিয়ে রাখতাম, যাতে অন্যরা দেখে না ফেলে। ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে ঈদের নামাজ আদায় করার স্মৃতি এখনো মনে দোলা দেয়। ঈদুল আজহার দিন খুব সকালে ঘুম থেকে আমাদের জাগিয়ে দেওয়া হতো। তারপর গোসল করে নতুন জামা-কাপড় পরিধান করে আমরা মুরব্বিদের সঙ্গে ঈদের জামাতে নামাজ আদায় করতে যেতাম। ঈদুল ফিতরের চেয়ে ঈদুল আজহার দিন ঈদের জামাত কিছুটা আগে শুরু হতো। কারণ নামাজের পরপরই পশু কুরবানি দিতে হতো। আমাদের বাড়িতে সাধারণত ঈদের ২-৩ দিন আগে পশু ক্রয় করা হতো। আমরা ছোটরা দলবেঁধে কুরবানির পশুকে খাবার দিতাম। আমাদের বাড়িতে সাধারণত একটি গরু এবং একটি ছাগল কুরবানির জন্য ক্রয় করা হতো। পশুটিকে কুরবানি করার সময় খুব কষ্ট হতো। মনে হতো পশুটিকে যদি কুরবানি করা না হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো। ঈদের দিন পুরোটা সময় আনন্দ করতাম। বিকালে এলাকায় ফুটবল খেলা হতো। শারীরিকভাবে কিছুটা দুর্বল থাকার কারণে আমি ফুটবল খেলায় অংশ নিতাম না। আমি ছিলাম শুধুই দর্শক। ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম। পরবর্তী সময়ে যখন বড় হই, তখনো ঈদ উদযাপন করি; কিন্তু ছোটবেলার সেই ঈদ আনন্দ আর খুঁজে পাই না।
ইসলামের প্রতিটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আমাদের পরস্পর শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। কিন্তু আমরা সেই শিক্ষা ক’জন গ্রহণ করছি? আমরা যদি ঈদের মর্মকথা উপলব্ধি এবং বাস্তবজীবনে প্রয়োগ করতে পারতাম, তাহলে দেশে এত হানাহানি থাকত না। কেউ উন্নয়নের সুফলপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হতো না। কিন্তু আমরা ধর্মীয় আনন্দ অনুষ্ঠান উদযাপন করি ঠিকই; তবে তার মর্মকথা উপলব্ধি করতে চাই না। আর করলেও তা বাস্তবে প্রয়োগ করি না।
পরিবারের বড়রা যে কোনো উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন। আর ছোটরা নির্মল আনন্দ উপভোগ করে। বাবা হচ্ছেন একটি পরিবারের বটবৃক্ষের মতো। তিনি অকাতরে সবার জন্য ছায়া দিয়ে যান। বাবার অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। সন্তান যতদিন বাবা না হয়, ততদিন সে বাবার গুরুত্ব বুঝতে পারে না। আগে বুঝিনি-এখন বুঝতে পারি, বাবা ঈদের সময় আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্য কত কিছুই না করতেন। আমরা ছোটবেলায় ঈদ আনন্দ উপভোগ করতাম; কিন্তু বুঝতে পারতাম না এ আনন্দ আয়োজনের জন্য পরিবার-প্রধানকে কতটা পরিশ্রম এবং অর্থ ব্যয় করতে হয়।
ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান মাত্র নয়। এটি হচ্ছে আত্মীয়-স্বজনদের মিলিত হওয়ার একটি উপলক্ষ্য। যেসব আত্মীয়-স্বজন দূরবর্তী এলাকায় থাকেন, তারা ঈদ উপলক্ষ্যে বাড়িতে আসেন। এ সময় প্রতিটি এলাকা নতুন মানুষের আগমনে মুখরিত হয়ে ওঠে। ইসলামে যেসব আনন্দ আয়োজন রয়েছে, তার প্রতিটির উদ্দেশ্য হচ্ছে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি করা। এখনো ঈদ উপলক্ষ্যে গ্রামের বাড়িতে গেলে অনেকের সঙ্গেই দেখা হয়। যদিও ঈদের আনন্দ আর আগের মতো নেই। কেমন যেন কৃত্রিমতা সৃষ্টি হয়েছে ঈদ উৎসবে। শহর আর গ্রামের ঈদ আনন্দের মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে। ঈদ উপলক্ষ্যে গ্রামে বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। আর শহরে প্রধানত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এখনো ঈদ আনন্দের কথা ভাবলে ছোটবেলায় গ্রামে উপভোগ করা ঈদ আনন্দের কথা বড়ই মনে পড়ে। শহরে আমরা ঈদ আনন্দ উপভোগ করি, কিন্তু ছোটবেলায় গ্রামে ঈদের যে আনন্দ পেতাম, তা এখন আর খুঁজে পাই না।
ঈদের কথা মনে হলেই আমার মনে জেগে ওঠে বিদেশে ঈদ আনন্দ উদযাপনের বিষয়টি। আমি যখন বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসাবে দায়িত্ব পালন করি, তখন বেশ কয়েকবার ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা উদযাপনের সুযোগ হয়েছিল। আমি দূতাবাসে কুরবানি দিতাম। ঈদের দিন বাহরাইন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো। অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রদূতদেরও আমন্ত্রণ জানানো হতো। তবে বাহরাইনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য রাষ্ট্রদূত ভবনে ওপেন হাউজ অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল সবচেয়ে আকর্ষণীয়। বাহরাইনে যেসব বাংলাদেশি কর্মরত ছিলেন, তাদের অনেকেই এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতেন। তখন মনে হতো, রাষ্ট্রদূত ভবন একটি ‘মিনি বাংলাদেশ’।
যারা এ অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন, তাদের জন্য দেশি খাবারের ব্যবস্থা করা হতো। একজন মানুষ কতটা দেশপ্রেমিক, তা জানতে হলে বিদেশে গমন করতে হবে। বিদেশে না গেলে বোঝা যায় না দেশ আমার কতটা প্রিয়। বাংলাদেশ থেকে অনেকেই কর্ম উপলক্ষ্যে বিদেশে গমন ও অবস্থান করছেন। যারা দেশে আত্মীয়-পরিজন রেখে বিদেশে অবস্থান করছেন, তারাই বলতে পারবেন দেশ কতটা প্রিয়। বাহরাইনে যেসব বাংলাদেশি অবস্থান করছিলেন, তারা প্রতিবছর ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় আমার বাসভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার জন্য বছরের বাকি সময় অপেক্ষা করতেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি আরও অনেকের মতো সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করি এবং মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালেও ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়েছিল। কিন্তু আমরা মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ব্যস্ত থাকায় ঈদের আনন্দ উপভোগ করা সম্ভব হয়নি। কখন ঈদ এলো, আর কখন গেল, তা আমরা টের পাইনি। আমাদের চিন্তা-চেতনাজুড়ে শুধু ছিল কখন দেশ স্বাধীন হবে এবং আমরা দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারব। দেশ যে কত আপন, তা বিদেশে না গেলে অনুভব করা যায় না।
আমরা ২০২৬ সালের পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করতে চলেছি। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিবেশে আমরা এবারের ঈদ আনন্দ উপভোগ করতে চলেছি। ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে এ দেশের মানুষ ছিল অধিকারহারা। তারা মন খুলে কোনো আনন্দ-উৎসব করতে পারেনি। রুদ্ধ পরিবেশে কখনোই মন খুলে আনন্দ-উৎসব করা যায় না। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার গঠিত হয়েছে। এখন মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে মানুষ ঈদুল আজহা উদযাপনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। আশা করা যাচ্ছে, এবারের ঈদ সবার জন্য নির্মল আনন্দ বয়ে আনবে। তবে ঈদে শুধু আনন্দ করলেই চলবে না; ঈদের যে শিক্ষা বা মর্মবাণী তা উপলব্ধি করতে হবে, ত্যাগের আদর্শ ধারণ করতে হবে। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের প্রতি সহানুভূতি ও মমত্ববোধ সৃষ্টিতে ঈদের শিক্ষাকে কাজে লাগাতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ একটি কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হবে-এটাই হোক এবারের ঈদুল আজহার অঙ্গীকার।
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী : প্রফেসর ইমেরিটাস; সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

