রাষ্ট্র ও নাগরিকের আস্থা দূর করবে করভীতি
Advertisement
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
প্রতীকী ছবি।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
কর বা ট্যাক্স প্রদান শুধু রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নয়, এটি মূলত সরকারের সঙ্গে নাগরিকের এক অনানুষ্ঠানিক চুক্তি। নাগরিকরা তাদের করযোগ্য উপার্জনের একটি অংশ রাষ্ট্রকে প্রদান করবেন, বিনিময়ে রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামোসহ উন্নত নাগরিক সুবিধা প্রদান করবে। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কর প্রদান এবং কর আদায় উভয় ক্ষেত্রেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতি বিরাজমান। সাধারণ মানুষের মনে ‘করভীতি’ এক স্থায়ী আসন গেড়েছে, যার মূলে রয়েছে জটিল করনীতি, প্রশাসনিক হয়রানির আতঙ্ক এবং করের অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে জনমনে আস্থার অভাব। রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে জনমনে করভীতি দূর করে একটি জনবান্ধব ও কার্যকর করনীতি গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে টিআইএনধারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ। তবে এদের সবাই কর প্রদান করেন না। ২০২৫-২৬ কর বছরে এখন পর্যন্ত মাত্র ৪৩ লাখের মতো করদাতা তাদের আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছেন। অনেক টিনধারীই বছর শেষে ঠিকমতো রিটার্ন জমা দেন না। ফলে নতুন টিনধারীর সংখ্যা বাড়লেও কর আহরণ বাড়ছে না। চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংকিং, সম্পত্তি নিবন্ধন, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংযোগ, ক্রেডিট কার্ড, সঞ্চয়পত্র ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগসহ প্রায় ৪০ ধরনের সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে টিআইএনের আওতায় আসা বাধ্যতামূলক। তাই অনেক টিনধারীই শুধু বিভিন্ন সেবা গ্রহণের জন্য আয়কর নিবন্ধন করে থাকেন। এতে দেখা যায়, টিআইএনধারী বেশির ভাগই শুধু নাগরিক সেবা গ্রহণের জন্য নিবন্ধিত হলেও আয়কর রিটার্ন জমা দেন না। অথচ নেপাল, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলংকার চেয়েও কম আয়কর প্রদান করেন আমাদের দেশের মানুষ। এমনকি কেনিয়া ও সিয়েরা লিয়নের মানুষরা আমাদের চেয়ে বেশি আয়কর দেন।
একটি রাষ্ট্র পরিচালনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন বিপুল অর্থের। এ অর্থের প্রধান উৎস হলো জনগণের দেওয়া কর বা ট্যাক্স। আমরা যখন উন্নত দেশের কথা ভাবি, তখন তাদের চকচকে রাস্তা, আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থা আর উন্নত জীবনযাত্রার চিত্র ভেসে ওঠে। এসব কোনো জাদুমন্ত্রে হয়নি। এগুলোর অর্থের মূল উৎস হলো জনগণের ট্যাক্স। ওইসব দেশের নাগরিকরা নিয়মিত কর দেন বলেই সরকার উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে পারে। সরকার যখন নিজস্ব অর্থায়নে মেগাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করে, তখন প্রতিটি করদাতা গর্ব করে বলতে পারেন, এখানে আমারও অবদান আছে। তাই, কর ফাঁকি দেওয়া মানে উন্নয়নের চাকা ধীরগতি করে দেওয়া, যা আমাদের নিজেদেরই ক্ষতি। অনেকের ধারণা কর দেওয়া মানে বাড়তি চাপ বা হয়রানি। এ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তি কর ব্যবস্থাকে সহজ ও স্বচ্ছ করেছে। এখন ঘরে বসেই আয়কর রিটার্ন দাখিল করা যায়। কর অফিসগুলো কর আহরণবান্ধব হয়ে উঠছে।
বিগত সরকারের ফেলে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যে সামনে আসছে চ্যালেঞ্জিং বাজেট। দেশের প্রতিটি সক্ষম নাগরিক যখন নিয়মিত ও সততার সঙ্গে কর দেবেন, তখন জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে বৈদেশিক ঋণ নির্ভরতা কমে আসবে। একটি জনমুখী বাজেট তৈরি করতে কর ব্যবস্থায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা বাড়াতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা না থাকলে কর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। তবে রাজস্ব আয় ও ব্যয় সঠিকভাবে না করলে করদাতাদের ওপর অবিচার করা হয়। অর্থনীতিকে চাঙা রাখতে ব্যবসায়ীদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে করদান পদ্ধতি সহজ করতে হবে। করদান পদ্ধতি জটিল করা হয় দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি করার জন্য।
আসন্ন বাজেটে ব্যক্তি পর্যায়ে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার কথা শোনা যাচ্ছে। তবে সম্পত্তির উত্তরাধিকার কর, মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর কর আরোপের বিষয়টি স্পর্শকাতর বিধায় তা নিয়ে এনবিআরের আরও যাচাই-বাছাই করা উচিত। অনেকের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদ থেকে আয় নেই। আবার অনেক বাইকচালক যারা রাইড শেয়ারিং কিংবা ফুড ডেলিভারি অথবা টিউশনির মতো কর্মে নিয়োজিত থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন, যাদের করযোগ্য আয় নেই। এসব খাতে কর আরোপ করলে নিম্নআয়ের মানুষের ওপর চাপ তৈরি হবে। এতে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে পারে। তবে বিলাসবহুল মোটরবাইকের ওপর কর আরোপ করা যৌক্তিক।
প্রায় দুই দশক পর বিএনপি সরকার আবার বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে। এ বাজেটের আকার হতে পারে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকবে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ আকারের বাজেট প্রণয়নের কথা ভাবছে, যখন আওয়ামী সরকারের ফেলে যাওয়া লণ্ডভণ্ড অর্থনীতি দেশকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংকট পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চলছে মন্দা। রেমিট্যান্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নমুখী। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে ৯ শতাংশের উপরে। ভতুর্কি দিতে হচ্ছে সার, বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন খাতে। সরকারের ব্যয় বাড়লেও আয়ের উৎস সংকোচন ও রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এনবিআর ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) রাজস্ব আহরণ হয়েছে ৩ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এতে দেখা যাচ্ছে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি দেড় লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে।
কর ব্যবস্থাপনার প্রতি জনগণের আস্থা বাড়াতে হলে করের অর্থের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। নাগরিকরা যখন দেখবেন তাদের ট্যাক্সের টাকা সঠিক কাজে ব্যয় হচ্ছে, তখন তারা কর দিতে আরও উৎসাহিত হবেন। সরকার যখন করের আওতা বৃদ্ধি করে করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে রাখবে, তখন কর ফাঁকির প্রবণতা কমে যাবে। কর আহরণে সরকার তথা এনবিআর আন্তরিক। এনবিআরে অনেক মেধাবী কর্মকর্তা আছেন যারা একটি জনবান্ধব কর ব্যবস্থাপনা চালু করতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এছাড়া করদানে আগ্রহ বাড়াতে কর মেলা, কর ছাড়সহ সেরা করদাতা পুরস্কার, ট্যাক্স কার্ড ও পদক প্রদান করা হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের বেশির ভাগ মানুষও সঠিক কর প্রদান করতে চান। তবে দরকার কর আহরণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করে জনগণকে সম্পৃক্ত করা। যাতে মানুষের মধ্যে করভীতি কাজ না করে। এক্ষেত্রে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে কর সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে এবং করভীতি দূর করতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে করের গুরুত্ব বিষয়ক সাধারণ অধ্যায় যুক্ত করার পরিকল্পনা সরকার ভেবে দেখতে পারে।
কর ব্যবস্থাপনা শুধু সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম নয়, এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার প্রতীক। অথচ প্রতি অর্থবছরেই কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির চেয়ে অনেক বেশি ধরা হয়। যার ফলে অর্থবছর শেষে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়, যা বাজেট বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করে। করভীতি ও করনীতি একে অপরের পরিপূরক। করনীতি যদি জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন হয় তবে জনমনে করভীতি কেটে যাবে। আর করভীতি দূর হলে রাজস্ব আদায় বহুগুণ বাড়বে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় দেশের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করতে কর, জিডিপি অনুপাত বাড়ানো অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্র ও নাগরিকের পারস্পরিক আস্থা। করদাতাদের সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন এবং সংগৃহীত রাজস্বের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শুধু ‘করভীতি’ দূর করে ‘করনীতি’কে সার্থক করা সম্ভব, যা বাংলাদেশকে একটি স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
হাসান আহমেদ চৌধুরী কিরণ : চেয়ারম্যান, ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি
