Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

কোথায় দাঁড়িয়ে আমাদের দুগ্ধশিল্প

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কোথায় দাঁড়িয়ে আমাদের দুগ্ধশিল্প

Advertisement

দুগ্ধ সাধারণত এক ধরনের সাদা তরল খাদ্য। তবে এর রঙের মধ্যে কিছুটা হলদেটে, মাখনের মতো, গোলাপি অথবা বাদামি আঁচ দৃশ্যমান হতে পারে। যে গাভি বাছুরকে দুধ খাওয়ায় সেই গাভির মাম্মারি গ্ল্যান্ড থেকে দুগ্ধ উৎপাদিত হয়। দুগ্ধ শিশু বয়সি স্তন্যপায়ীদের পুষ্টির প্রধান উৎস। কঠিন খাদ্য হজমের উপযোগী হওয়ার আগ পর্যন্ত স্তন্যপায়ী জীবরা তরল দুধের উপরই বেঁচে থাকার জন্য নির্ভর করে। এটি মানব সন্তানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। মানব সন্তান জন্মের পরপর মাতৃদুগ্ধ এবং তারপর গরুর দুধের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকে।

দুধের মধ্যে অনেক ধরনের পুষ্টিকর উপাদান থাকে। এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে ক্যালসিয়াম, ভিটামিন প্রোটিন, লেকটোজ এবং পরিতৃপ্ত স্নেহ পদার্থ। স্তন্যদানকারীর প্রথম দুধকে বলা হয় পোলোস্ট্রাম। এতে থাকে এন্টিবডি এবং রোগ প্রতিরোধক উপাদান। এসব উপাদান দুগ্ধ পানকারীদের অনেক রোগ থেকে রক্ষা করে।

আমাদের দেশে যখন আত্মপোষণশীল কৃষির প্রাধান্য ছিল, তখন অধিকাংশ সম্পন্ন পরিবার গাভি পালন করত। এর পাশাপাশি জমিতে চাষ দেওয়ার জন্য অনেক কৃষক হালের গরুও পালন করত। কালের বিবর্তনে গো-খাদ্যের অভাব ও গরুর দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমান্বয়ে গরু দিয়ে হালচাষের প্রথা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তার জায়গায় স্থান করে নিচ্ছে পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টর। অতীতে গৃহপালিত গাভির দুধ পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে তা বাজারে বিক্রি করা হতো। তবে গাভি পালনের মূল উদ্দেশ্য ছিল পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় দুধের চাহিদা মেটানো। আমাদের দেশে কৃষিতে বাজার সম্পর্কের অনুপ্রবেশ ও বাণিজ্যায়নের ফলে দুধের উৎস পারিবারিক গাভি থেকে খামারের দিকে রূপান্তরিত হচ্ছে। এখন দেশে অনেক দুগ্ধবতী গাভির খামার দেখতে পাওয়া যায়। এসব খামার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে দুগ্ধ উৎপাদন করে বাজারজাত করে। এসব দুগ্ধের একটি বড় অংশ দুগ্ধজাত খাদ্য উৎপাদনকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন-আড়ং, মিল্কভিটা ও ফ্রেশমিল্ক জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পাইকারিভাবে খামারিদের কাছ থেকে কিনে নেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল সুপারিশ করে, ১২ মাস বয়সের বড় শিশুদের দিনে অন্তত ২ বেলা দুগ্ধজাত খাবার দিতে হবে। পৃথিবীব্যাপী ৬০০ কোটিরও বেশি মানুষ দুগ্ধ অথবা দুগ্ধজাত খাদ্য গ্রহণ করে।

২০১১ সালে দুধের খামারগুলো পৃথিবীব্যাপী ৭৩০ মিলিয়ন মেট্রিক টন দুগ্ধ উৎপাদন করত ২৬০ মিলিয়ন খামারের গাভি থেকে। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদনকারী দেশ এবং নেতৃস্থানীয় গুঁড়া দুধ রপ্তানিকারক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প সরকার যখন পারস্পরিক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, তখন এর একটি উদ্দেশ্য ছিল বাণিজ্য-অংশীদার দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস করা। এ লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার সঙ্গে বাণিজ্যকারী দেশগুলোকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বেশি করে কেনার জন্য চাপ দেয়। এসব কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাধ্যতামূলকভাবে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানি করা হলে ভারতের দুগ্ধ খামারগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, এ কারণে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারেনি। নিউজিল্যান্ড, জার্মানি ও নেদারল্যান্ডস দুগ্ধজাত পণ্যের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। সমগ্র পৃথিবীতে ৭৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন জনসংখ্যা দুগ্ধ খামার গৃহস্থালিতে অবস্থান করে।

১ জুন ছিল বিশ্ব দুগ্ধ দিবস। বাংলাদেশে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার ২৭ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে চাহিদার ৯৬ শতাংশ পূরণ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদন দ্বারা।

চাহিদার পরিমাণ হচ্ছে ১ কোটি ৬২ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন। সে জায়গায় উৎপাদন হয় ১ কোটি ৫৫ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন। দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের উৎপাদনে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৫.৫৫ শতাংশ। দেশে জনপ্রতি দৈনিক চাহিদা হলো ২৫০ মিলিলিটার। এর বিপরীতে বর্তমানে প্রাপ্যতা হলো ২৩৯.২৯ মিলিমিটার। দেশে ৯৪ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে প্রত্যেক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুগ্ধখাতে। দেশে এখন সক্রিয় দুগ্ধ খামারের সংখ্যা ১২ লাখ। শীর্ষস্থানীয় বাজার নিয়ন্ত্রণকারীরা পাস্তরিত দুধের ৮০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। দুগ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠান হলো আবুল খায়ের গ্রুপ; ফ্রেশ, নিউজিল্যান্ড ডেইরি, প্রাণ, নেসলে বাংলাদেশ ও ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো। এ প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক বিপণন নিশ্চিত করছে।

দুগ্ধের উৎস দুগ্ধ প্রদানকারী গবাদি পশু। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ২৫১.৭১ লাখ গরু, ২৭১.২৭ লাখ ছাগল এবং ৫৫.১৩ লাখ ভেড়া ও মহিষ। আলোচ্য দুগ্ধ সংক্রান্ত তথ্যের উৎস যথাক্রমে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসর্স অ্যাসোসিয়েশন।

একদিক থেকে বলা যায়, দুগ্ধ উৎপাদনে বাংলাদেশের সাফল্য চমৎকার। মোট চাহিদার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে দুগ্ধ উৎপাদন। বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে বিদেশি গুঁড়া দুধের ওপর বিশাল নির্ভরশীলতা চলে আসছিল। এখন যখন চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে কাছাকাছি ভারসাম্য সৃষ্টি হতে চলেছে, তখন বলা যায়, বিদেশি গুঁড়া দুধের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস পাবে। তবে পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। ২০২১, ২০২২, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে গুঁড়া দুধ আমদানি হয়েছে যথাক্রমে ১.৩৪ লাখ টন, ১.৩০ লাখ টন, ১.২৪ লাখ টন, ১.২৭ লাখ টন এবং ১.৫৮ লাখ টন। এ তথ্যের উৎস জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। ২০২৫ সালে গুঁড়া দুধের আমদানি বেশ খানিকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে গুঁড়া দুধের বাজার ১৩ হাজার কোটি টাকা, অন্যদিকে দেশে দুগ্ধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার ২৭ হাজার কোটি টাকা। মোটামুটিভাবে বলা যায়, গুঁড়া দুধের বাজার মোট বাজারের এক তৃতীয়াংশ। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, আমদানিকৃত গুঁড়া দুধের পরিমাণ কমছে না। মাথাপিছু হিসাবে এখন দুধের প্রাপ্যতা মাত্র ২৩৯.২৯ মিলিমিটার। পরিমাণের দিক থেকে এটা খুবই সামান্য। এর পরিমাণ অন্তত দিগুণ হওয়া উচিত। দুগ্ধ খাতে যে সাফল্য অর্জিত হয়েছে, তার পেছনে রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, শিক্ষিত তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়া এবং প্রবাসী আয়ের একটি অংশ দুগ্ধ খাতে বিনিয়োগ হওয়া। এতদিন আমরা জানতাম প্রবাসী আয়ের প্রায় পুরোটাই ভোগের জন্য ব্যয় হয়; একটি অংশ অবশ্য বাড়িঘর নির্মাণের জন্য ব্যয় হয়। এ ধরনের ব্যয় অনুৎপাদনশীল বিবেচনা করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে দুগ্ধ খামার গড়ার জন্য প্রবাসী আয়ের ব্যবহার গ্রাম বাংলার অর্থনৈতিক রূপান্তরের অনুঘটক হিসাবে কাজ করছে। পরিবর্তনের এ ধারা চরিত্রগতভাবে প্রগতিশীল। শিক্ষিত তরুণদের দুগ্ধ খামারি হওয়া নিয়ে আমার জানা একটি গল্প আছে। এক তরুণ মাস্টার্স পাশ করার পর চাকরি পাচ্ছিল না। সে ঢাকায় ছোটখাটো ব্যবসা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে। কিন্তু দুর্ঘটনায় পড়ে তার সেই চেষ্টাও ভেস্তে যায়। আমি তাকে নিজ গ্রামে গিয়ে দুগ্ধ খামার ও মাছের খামার করার পরামর্শ দেই। পৈতৃক সূত্রে তার বেশ কিছু জমিজমা ছিল। অচিরেই সে দুধ ও মাছের খামার করে ভালো সাফল্য অর্জন করে এবং অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হয়ে ওঠে।

দেশে দুধের চাহিদা হিসাব করা হয়েছে দৈনিক ২৫০ মিলিলিটার হিসাবে। এই হিসাব খুবই রক্ষণশীল এবং উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। দুগ্ধ উৎপাদনে সাফল্য সত্ত্বেও বাংলাদেশের শিশুদের কত শতাংশ প্রয়োজন অনুযায়ী দুধ খেতে পায়? এক সময় বলা হতো, আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। বাংলাদেশের খুব মুষ্টিমেয় সংখ্যক শিশুর বেলায় এ প্রবচনটি প্রযোজ্য। এবার যখন শিশুদের মধ্যে ভয়াবহ আকারে হামের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা গেল, তখন দেখা গেছে, শিশুদের অনেকে হাম থেকে সেরে উঠলেও নিউমোনিয়াসহ অন্যান্য জটিলতায় মৃত্যুবরণ করছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এসব শিশুর রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা নেই বললেই চলে। এরা পুষ্টিকর খাবার পায় না। দুধ তো দূরের কথা। দারিদ্র্যই এর মূল কারণ। বাংলাদেশে যে পরিমাণ দুধ উৎপাদিত হয়, তার বণ্টনও খুবই বৈষম্যপূর্ণ। দুধ যাদের বেশি করে প্রয়োজন, তারা দুধ খেতে পায় না। আয় বণ্টনে বৈষম্যের সঙ্গে এর একটা গাভির সম্পর্ক রয়েছে। একটি পরিবার যখন নিম্নআয়ের পর্যায়ে থাকে, তখন সেই পরিবারের পক্ষে পুষ্টিকর খাবার তো দূরের কথা, প্রয়োজনীয় শর্করা জাতীয় খাদ্য জোগাড় করাও দুরূহ হয়ে ওঠে। খাদ্য গ্রহণে সুসমতা বলতে কিছুই থাকে না। সুষম খাদ্যের অপ্রতুলতার মধ্যে যে প্রজন্ম গড়ে উঠছে, সেই প্রজন্মের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ পরিপূর্ণতা অর্জন করতে পারে না।

বাংলাদেশে দেশীয়ভাবে দুগ্ধ উৎপাদন সত্ত্বেও বিদেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে গুঁড়া দুধ আমদানি করা হয়। ধারণা করা যায়, দেশীয় উৎপাদিত দুধ ও বিদেশ থেকে আমদানি করা গুঁড়া দুধের একটি বড় অংশ নানা ধরনের মিষ্টি উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশের মতো একটি দেশের জন্য মিষ্টি বানিয়ে পুষ্টিকর দুধের সাবাড় করা মোটেও যৌক্তিক ব্যবহার হিসাবে বিবেচিত হতে পারে না। তা সত্ত্বেও মিষ্টির উৎপাদন ও ভোগ বেড়েই চলেছে। স্বাস্থ্যের বিবেচনায় মিষ্টিরূপে দুধের ব্যবহার খুবই ক্ষতিকর। তা সত্ত্বেও এটা হচ্ছে। কারণ বাজার বিকৃত ও ভুল সংকেত দিচ্ছে। এ বাজারে উত্তম তথ্যের প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। উত্তম তথ্যের অভাব থাকলে বাজার ত্রুটিহীনভাবে কাজ করতে পারে না। ভাবতে হবে বাজারকে কীভাবে ত্রুটিমুক্ত করা যায়।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম