Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

গণতন্ত্রের তিন কাহিনি

Advertisement

Icon

সলিমুল্লাহ খান

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

গণতন্ত্রের তিন কাহিনি

Advertisement

বর্তমানে আমাদের দেশ যে তন্ত্রে বা ব্যবস্থাপনায় চলিতেছে, তাহাকে গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসি বলা হয়। যদি কেহ জিজ্ঞাসাবাদ করিতেন ইহা কোন ধরনের ‘গণতন্ত্র’, অনুমান করি জওয়াব পাইতেন লিবারেল বা উদারনৈতিক গণতন্ত্র। আমার প্রশ্ন গণতন্ত্র ও উদারনীতি-এ দুই পদের গোড়ায় যে দুইটি পদার্থ সেই দুটি কি বস্তু? অন্য কথায় ইহাদের মধ্যকার সম্পর্ক কি? একটি যদি সোনা হয় অন্যটি তো পাথর। কথাটি একটু খোলাসা করার জন্যই এই ছোট্ট নিবন্ধের অবতারণা।

‘স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব’ (বা মৈত্রী) ফরাসি বিপ্লবের এই তিন কাহিনির কথা সবাই জানেন। কিছু কম দুইশ বছর পর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেও একই কাহিনির পুনরাবর্তন ঘটিয়াছিল। আমাদের নতুন তিন কাহিনি ছিল ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’। এ কাহিনির ব্যর্থতা কী কারণে ঘটিয়াছিল আজ তাহা নির্ধারণের জন্য আমাদের নতুন যুগের দায় পড়িয়াছে। নচেত আমরা নতুন তিমিরে পড়িব।

আঠারো শতকের ফরাসি সাহিত্যিকরা যে পদার্থের স্থান এক নম্বরে নির্দেশ করিয়াছিলেন, তাহার নাম ‘স্বাধীনতা’। কেন করিয়াছিলেন তাহাও এতদিনে আর পরিষ্কার নয়। সেদিনের এক রাজা দাবি করিয়াছিলেন : ‘রাষ্ট্র, রাষ্ট্র আবার কি! আমিই রাষ্ট্র।’ পরম বা অপ্রতিহত রাষ্ট্রে স্বয়ং রাজাই রাষ্ট্র বা সার্বভৌম। এখনকার গণতন্ত্র বা নতুন কাহিনি অনুসারে সকলেই বলিতে পারেন ‘আমিও রাষ্ট্র’।

আজিকালি রাষ্ট্রের অপর নাম ‘সার্বভৌম’। কিন্তু এই যুগে সার্বভৌম কে তাহা লইয়া বিবাদ আছে। গণতন্ত্রের পুরাতন ধারণা অনুসারে রাষ্ট্র সার্বভৌম আর নতুন ধারণা মোতাবেক সম্পত্তি অর্থাৎ তাহার মালিক সার্বভৌম। সার্বভৌমের ক্ষমতা অসীম। এ অসীমকে সসীম করিবার জন্য সার্বভৌম জনসাধারণের নতুন নাম রাখা হইয়াছিল কোমল গান্ধার : ‘জাতি’। এই জাতি যেহেতু ব্যাকরণে পুরুষ, তাই জাতীয় একতার নাম ‘ভ্রাতৃত্ব’ দাঁড়াইয়াছিল।

ফরাসি বিপ্লবের ধুয়াকর, বিশেষ জঁ-জাক রুসো (১৭১২-১৭৭৮) সাহেব, ভাবিয়াছিলেন স্বাধীনতাই একমাত্র সম্পত্তি আর এই সম্পত্তি এজমালি (অর্থাৎ সম্পত্তিতে সকলের সমান মালিকানা) বটে। তিনি জোর দিয়াছিলেন এই কয়টি কথার ওপর : স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব সমার্থক কথা। এ সম্পত্তি তো বেচাকেনা করা যায় না, ইহার ভাগবাঁটোয়ারা করাও চলে না।

বেশিদিন না যাইতেই কালো বিড়াল লাফাইয়া বাহির হইল। বঁজামাঁ কঁস্তঁ (১৭৬৭-১৮৩০) নামীয় এক সাহিত্যিক মিউ মিউ করিয়া উঠিলেন : স্বাধীনতাই সম্পত্তি একথা সঠিক নয়, বরং সম্পত্তির অপর নাম ‘স্বাধীনতা’ বলাই ঠিক। সহজ কথায় সম্পত্তির মালিকানা নিশ্চিত করিবার স্বাধীনতাই একমাত্র স্বাধীনতা পদবাচ্য পদার্থ; সম্পত্তি যাহার স্বাধীনতাও তাহারই। অর্থের এ রূপান্তরকেই বলে প্রতিবিপ্লব। কালের কল্লোলে এই প্রতিবিপ্লব এতই সার্থক হইয়াছিল যে, ১৯৩৫ সালের ভারত সরকার আইন (গভর্নমেন্ট অব ইন্ডিয়া অ্যাক্ট) প্রজাসাধারণের একটি মাত্র অধিকারই স্বীকার করিতে বাধ্য হইয়াছিল : বলাবাহুল্য সে অধিকার সম্পত্তির অধিকার।

ফরাসি দেশে রাজতন্ত্রের পুনরুদ্ধার ঘটে ১৮১৫ সালে। ১৮১৮ সালে পারির রাজকীয় একাডেমি বা পণ্ডিত সভার এক বক্তৃতায় কঁস্তঁ সাহেব জানাইয়াছিলেন, রুসো সাহেবের কহা কাহিনিটা একান্ত অমূলক, অন্তত কাহিনিটি একালে আর শুনিবার মতো নহে। কঁস্তঁ সাহেব কহিতেছিলেন : পুরাকালে লোকের চাহিদা ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার সমান ভাগ, ক্ষমতার এ শরিকানার নামই তাহারা রাখিয়াছিলেন স্বাধীনতা। তাহারা চাহিতেন সম্পত্তির ভোগ নয়, ক্ষমতার ভাগ।

কঁস্তঁ সাহেবের বয়ান অনুসারে আধুনিক যুগে লোকের চোখ পড়িয়াছে অন্য জায়গায়। তাহারা চাহেন স্ব স্ব সম্পত্তি ভোগের নিরাপত্তা, নিরাপদ দেশলাই জ্বালাইবার সুবিধা। স্বাধীনতার অর্থই আমূল বদলাইয়া গেল। সহায়-সম্পত্তি উপার্জন আর অর্জিত সম্পত্তি উপভোগের নামই স্বাধীনতা আর ভোগ-উপভোগের নিরাপত্তা পাওয়ার জন্য যে ভোগান্তি, তাহার নাম রাষ্ট্র।

কঁস্তঁ সাহেব যে মতবাদ প্রচার করিয়াছিলেন, তাহার ইংরেজি অভিধা লিবারেলিজম বা একালের বাজে বাংলায় ‘উদারনীতি’। লিবারেলিজমের মূল কাহিনি লির্ববা স্বাধীনতাই। এ স্বাধীনতার অর্থ রাষ্ট্রের হাতে যথাসম্ভব কম ক্ষমতা দিয়া সম্পত্তি-মালিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। পুরাকালে স্বাধীনতা বলিতে বুঝাইত রাষ্ট্রক্ষমতায় সদস্য-সমাজের সমান ভাগ। এজমালি ক্ষমতার এ ভাগাভাগি ছিল সচলায়তন আর সকর্মক। রুসো স্বাধীনতা বলিতে ইহাই বুঝিতেন। প্রাচীনকালে, বিশেষ গ্রিস দেশে, এ বুঝটারই নাম দাঁড়াইয়াছিল ‘গণতন্ত্র’।

আর এখন যে পদার্থের নাম আমরা গণতন্ত্র রাখিয়াছি, তাহা প্রকৃত প্রস্তাবে লিবারেলিজম। বাংলাদেশে লিবারেলিজমের তর্জমা চলিতেছে ‘উদারনীতি’। প্রকৃত প্রস্তাবে ইহার নাম হওয়ার কথা ‘স্বাধীনতাবাদ’। আমি অনেক দিন আগে একটি অন্য অনুবাদ প্রস্তাব করিয়াছিলাম ‘স্বাধীনতা-ব্যবসায়’। লোকে কানে তোলে নাই!

স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীরা গণতন্ত্রের শতভাগ শত্রু। কে না জানে একশ বছর আগেও তাহারা সকলকে ভোটদানের অধিকার দিতে চাহেন নাই? নারী জাতির ভোটাধিকার মঞ্জুর করার নিয়ম মাত্র ১৯১৮/২০ সালের পর আর সম্পত্তিহীন সকল মানুষের ভোটাধিকার তো মাত্র ১৯৪৫ সালে মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মাত্র স্বীকার করা হইল।

আজিকালি তাহারা গণতন্ত্রের ভেক ধরিয়াছেন। সর্বজনীন ভোটাধিকারকে এখন গণতন্ত্রের একমাত্র মাপকাঠি বা দাঁড়িপাল্লা মনে করা হয়। এখন গণতন্ত্রের দাবি মানে সম্পত্তিতে সকলের সমানাধিকারের দাবি। এই দাবির অপর নাম সাম্য। এখন সাম্য ঠেকাইবার কাহিনিকেই ফলাও করিয়া স্বাধীনতা বলা হইতেছে। আর যাহারা সাম্যের দাবি তোলেন অর্থাৎ প্রতিবিপ্লবের আগে স্বাধীনতা বলিতে যাহা বুঝাই, তাহা চাহেন তাহাদিগকে বলা হয় ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিরুদ্ধাচারী বা সমাজতন্ত্রবাদী। জঁ-জাক রুসোকেও আধুনিক স্বাধীনতা-ব্যবসায়ীরা বলেন টৌটালিটারিয়ান বা স্বাধীনতার শত্রু।

আসলেই কি তাই! রুসো দেখিয়াছিলেন রাষ্ট্র অপরিহার্য। কিন্তু তিনি ইহাও জানিতেন যে রাষ্ট্র যখন অসীম ক্ষমতা সদস্য-সমাজ বা সিভিল সোসাইটির বিরুদ্ধে ব্যবহার করে, তখন সে আর রাষ্ট্রই থাকে না, তখন রাষ্ট্রের আত্মভাব বিনষ্ট হয়, রাষ্ট্র আত্মহত্যা করে।

রুসো যদি বলিয়া থাকেন রাষ্ট্র কখনো আত্মভাব ছাড়িতে পারে না, তো তিনি ঠিকই বলিয়াছিলেন। ইহার অর্থ আত্মঘাতী রাষ্ট্রের জায়গায় নতুন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কারণ রাষ্ট্র কখনো শূন্য থাকে না। বহু আগেই আরস্তু বলিয়াছিলেন মানুষ মানুষের হইয়াছে রাষ্ট্রের কারণে। রাষ্ট্রবিহীন মানুষ মানুষই নহে।

৪ জুন ২০২৬

(লেখকের ভাষা ও বানানরীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক ও চিন্তাবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম