Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

পুশইন আর পুশব্যাকের রাজনীতি

Icon

মহিউদ্দিন আহমদ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পুশইন আর পুশব্যাকের রাজনীতি

অভিবাসন হচ্ছে মানবজাতির আদিমতম প্রবণতা। টিকে থাকার জন্য মানুষের চাই খাবার এবং আশ্রয়। মানুষ খাবারের খোঁজে এবং বৈরী প্রকৃতি থেকে বাঁচতে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেত। তখন দেশ-বিদেশ বলে কিছু ছিল না।

ক্রমে মানুষ বাড়ল। সে কৃষিকাজ শিখল। বসতি গড়ে উঠল। নগরায়ণ হলো। সে হলো কর্তৃত্বপরায়ণ। শুরু হলো ব্যক্তি থেকে গোত্রের আধিপত্য। ক্ষমতার আরও কেন্দ্রীভবন হলো। গড়ে উঠল রাষ্ট্রব্যবস্থা। মানুষ নাগরিকে রূপান্তরিত হলো। তার মধ্যে তৈরি হলো দেশভাবনা। এক দেশের মানুষের আরেক দেশে চলাচলের ওপর চেপে বসল নানা নিয়ন্ত্রণ, বিধিনিষেধ। চালু হলো পাসপোর্ট-ভিসা। দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কে পরিবর্তন এলো। কেউ হলো মিত্র, কেউ বা শত্রু।

একসময় অভিবাসন ছিল একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, জীবনেরই একটি অংশ। এখন এটি নানা আইনকানুনের জালে বাঁধা। চাইলেই কেউ এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে গিয়ে থিতু হতে পারে না। মানুষ কাঁচি দিয়ে কেটে সীমান্ত তৈরি করে দিয়েছে। সব সীমান্ত স্বাভাবিক নয়, নয় প্রতিবেশ-অনুকূল। বেশির ভাগই রাজনৈতিক সীমান্ত। কাল রাতে যে এক দেশের প্রতিবেশী হয়ে ঘুমুতে গেছে, আজ সকালে ঘুম ভাঙতেই সে হয়ে গেছে ভিনদেশি, অচেনা।

একসময় এ অঞ্চলে ছিল অনেক ছোট ছোট রাজ্য। একেকটা একেক রকম। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এসে সব রাজ্য একসঙ্গে জুড়ে দিয়ে তৈরি করল আধুনিক ভারত রাষ্ট্র। কালের বিবর্তনে সেটি কয়েক টুকরো হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে আলাদা হয়েছে বার্মা। ১৯৪৭ সালে কয়েকটি অঞ্চল মিলে তৈরি হয়েছে পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে হয়েছে বাংলাদেশ। এক দেশের মানুষ এখন ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিক। তাদের আন্তঃসম্পর্ক বদলে গেছে। এ অঞ্চল এখন রাষ্ট্রীয় মালিকানায় খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেছে।

যখন সীমান্ত বলে কিছু ছিল না, তখন মানুষ কাজের খোঁজে অবাধে যাতায়াত করত। যে জায়গাটা সুবিধাজনক মনে হতো, সেখানেই থিতু হওয়ার চেষ্টা করত। এখন সে পড়েছে নাজুক অবস্থায়। অনেকের কাছে সে হয়ে পড়েছে বিদেশি। রাষ্ট্র তাকে চোখ রাঙায়।

মানুষের সহজাত প্রবণতা হচ্ছে ভালো থাকা। সে চায় স্থিতি। চায় ভালো পরিবেশ, উন্নত জীবন। সেজন্য সে ক্রমাগত স্থান বদলায়। গ্রাম ছেড়ে সে যায় শহরে। ছোট শহর ছেড়ে বড় শহরে যায়। তারপর আরও উন্নত জীবনের আশায় ছোটে দেশের বাইরে। একসময় সম্পদের সন্ধানে ইউরোপের লোকরা ছুটত আমেরিকার দিকে। তারপর আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র তৈরি হলো। এখন সেখানে ধেয়ে চাচ্ছে লাতিন আমেরিকার মানুষ। আফ্রিকা আর এশিয়ার অনেক মানুষ উন্নত জীবনের আশায় প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে ছুটছে ইউরোপের দিকে। ইউরোপ তাদের কাছে জান্নাত। যেখানে যাওয়ার পথে অনেকেই ডুবে মরছে ভূমধ্যসাগরের জলে।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। আকারে অনেক বড়। সেখানে অনেক লোকের বাস। বাংলাদেশ ছোট দেশ। মানুষ অনেক। দারিদ্র্য প্রকট। আছে নিরাপত্তার অভাব। তাই অনেকেই ছোটে ভারতের দিকে। অনেক বছর ধরে এটা হয়ে আসছে।

ভারতে নগরায়ণ ও শিল্পায়ন হয়েছে অনেক আগে থেকে। সেসব জায়গায় কাজের সুযোগ বেশি। তাই সেখানে মানুষ যাচ্ছে। আবার অনেকেই বাংলাদেশে নানা কারণে নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। একটু স্বস্তি, শান্তি আর নিরাপত্তার আশায় তারা যায় ভারতে। সেখানে গিয়েও যে তারা খুব ভালো আছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা কম। সেটা তাদের স্বস্তি দেয়।

বাংলাদেশের আর ভারতের মধ্যকার রাজনৈতিক সমীকরণ বারবার বদলায়। কখনো কখনো মনে হয়, এই বুঝি যুদ্ধ লেগে গেল। গোলাবারুদের যুদ্ধ না হলেও বাগযুদ্ধ চলে অবিরাম। তখন সম্পর্কে চিড় ধরে। কিছু লোককে ‘বিদেশি’ ট্যাগ দিয়ে ঘাড় ধরে সীমান্তের ওপারে ঠেলে দেওয়া হয়। এর একটি নাম আছে-পুশইন। এর পালটা পদক্ষেপ হলো, পুশব্যাক। অর্থাৎ তোমরা বিদেশি বলে যাদের আমাদের দেশে জোর করে পাঠাচ্ছ, আদতে তারা আমাদের নাগরিক নয়। তোমরা নানা ছুতায় তোমাদের লোকদের জবরদস্তি করে পাঠাচ্ছ। আমরা তাদের ঢুকতে দেব না। তোমরা ‘পুশইন’ করাচ্ছ, আমরা ‘পুশব্যাক’ করব। এ নিয়ে সীমান্ত রক্ষীরা খুব তৎপর। একদিকে বিজিবি আর ওদিকে বিএসএফ। দুই দেশের দুই বাহিনীর মাঝখানে পড়ে অসহায় আদমসন্তানরা চিড়েচ্যাপটা হচ্ছে। তারা সবাই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জিম্মি।

আমাদের দেশগুলোতে অনেকেই আছেন টাকার কুমির। তারা মিলিয়ন ডলার খরচ করে যে কোনো দেশের নাগরিকত্ব কিনে নিতে পারেন। তাদের জন্য ‘অভিবাসন’ হচ্ছে ডালভাত। সমস্যায় পড়েছে সাধারণ গরিব মানুষ। তার কোনো রাষ্ট্র নেই। তার দরকার কাজ। সে কাজের সন্ধানে যতই ছোটাছুটি করুক, একবার তার কপালে ‘বিদেশি’ তিলক সেঁটে গেলে তার অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। তাকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়।

সম্প্রতি ভারতে এ নিয়ে বেশ হইচই হচ্ছে। নাগরিকত্ব আইনের বিধান নতুন করে বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সেখানে বসবাসকারী অনেকেই নাকি আর সে দেশের আইনানুগ নাগরিক নন। তাদের ভারত ছাড়তে হবে। আবার যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তাদের অনেকের নাগরিত্ব নাকি ভুয়া। নতুন করে হিসাব-নিকাশ হচ্ছে। একদা নাগরিক কলমের খোঁচায় হয়ে যাচ্ছেন বিদেশি। এ নিয়ে সীমান্ত বরাবর উত্তেজনার পারদ ক্রমেই উঁচুতে উঠছে। এটা নিয়ে এন্তার রাজনীতি হচ্ছে। আর সেই সঙ্গে বাড়ছে জাতিবাদী ‘জিঙ্গোইজম’।

১৯৪৭ সালে যে ভিত্তিতে ভারত ও বাংলা ভাগ হয়েছিল, মনে হয়েছিল, বুঝি সব প্রশ্নের মীমাংসা হয়ে গেছে। আসলে হয়নি। মনে হয়, সমস্যা আরও বেড়েছে। ‘আইডেন্টিটি পলিটিকস’ চলছে সব জায়গায়। তুমি ভারতীয় না বাংলাদেশি, তুমি হিন্দু না মুসলমান, এ পরিচয়টাই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। এ কারণে হাজার হাজার মানুষ কপাল দোষে কিংবা জনশুমারির ফাঁদে পড়ে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেছে। সবার ওপরে জাতিবাদী রাজনীতি চড়াও হচ্ছে। মানুষের সূক্ষ্ম বিবেচনাবোধ চলে গেছে নির্বাসনে। এর শিকার হচ্ছে নিরীহ গরিব মানুষ।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় সরলরেখায় চলে না। এটি ওঠানামা করে। কখনো ভালো, কখনো মন্দ। কখনো দুই দেশের মধ্যে গলাগলি, আবার কখনো সাংঘাতিক আড়াআড়ি। দুই দেশের মধ্যে এখন যে সম্পর্ক, এটি সম্ভবত তলানিতে। এর সঙ্গে ভারতের পুরোনো নাগরিকত্ব আইনের বাস্তবায়ন হঠাৎ শুরু হয়ে যাওয়ায় বিপত্তি বেধেছে। সীমান্তের ওপারে অনেক লোককে জড়ো করা হয়েছে, যাদের বাংলাদেশি বলে চিহ্নিত করেছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ তাদের স্বাগত জানাচ্ছে না। আসলে তারা কোন দেশের নাগরিক, সেটি পূর্বাপর খতিয়ে দেখার অবকাশ নেই রাষ্ট্রের। তাদের তো মানুষ নিয়ে রাজনীতি করতে হবে। রাজনীতিতে মানুষ হচ্ছে কামানের খোরাক।

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভালো রাখাটা দুই দেশের জন্যই জরুরি। এ দুই দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে অমিলের চেয়ে মিল বেশি। কারণ উভয়ের আছে শত শত বছরের অভিন্ন ইতিহাস। রাজনীতি সেটাকে নাজুক করে দিচ্ছে। সম্পর্কের বুননটা ছিঁড়ে দিচ্ছে। এ রকম একটা অবস্থা পৃথবীর আর কোনো অঞ্চলে আছে কিনা, জানি না।

জাতিবাদী রাজনীতির সঙ্গে এসে জুটেছে আরেক উপদ্রব-ধর্ম। মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে তার ব্যক্তিগত বিশ্বাসের জায়গা থেকে। ধর্মবিশ্বাস যখন রাষ্ট্রীয় জীবনের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হয়ে ওঠে, তখন সাধারণ বিচারবুদ্ধি লোপ পায়। যুক্তি কাজ করে না। আমরা এখন ওই পর্যায়ে এসে পৌঁছেছি।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম