ডেঙ্গু বিস্তার : মশার প্রজননস্থল ধ্বংসই সমাধান
Advertisement
মোহাম্মদ সফি উল্যাহ
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: যুগান্তর
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ক্রমেই একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। এখন আর নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমেই শুধু ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া সীমাবদ্ধ নেই; বরং সারা বছরই এ দুই রোগের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। গবেষক ও বিশেষজ্ঞ হিসাবে আমি মনে করি, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে গবেষণাভিত্তিক ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে বিষয়গুলো ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বিস্তারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত, সেগুলোর বিরুদ্ধে জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের ডেঙ্গু ইতিহাসে ২০২৩ সাল এক ভয়াবহ অধ্যায়। ওই বছর মোট ৩২১,১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ২০২৪), যা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চরম চাপে ফেলে। মৃত্যুর সংখ্যাও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে এবং কেস ফ্যাটালিটি (১,৭০৫ জন) রেট দাঁড়িয়েছে ০.৫০৪ শতাংশ, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ (বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ২০২৩; স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ২০২৪)। এর আগ পর্যন্ত ২০১৯ সালকে বাংলাদেশের ডেঙ্গুর সবচেয়ে বড় প্রাদুর্ভাব হিসাবে ধরা হতো, কিন্তু ২০২৩ সালের পরিস্থিতি সেই রেকর্ডও ভেঙে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী এরপরও ২০২৪ সালে আরও এক লাখ ১ হাজার ২১৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে এবং ৫৭৫ জন মারা গেছে। ২০২৫ সালেও (ডিসেম্বর পর্যন্ত) এক লাখ দুই হাজার পাঁচশ বাষট্টি জন আক্রান্ত হয় এবং ৪১২ জনের মৃত্যু হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এবারের প্রাদুর্ভাবের সময়কালও পরিবর্তিত হয়েছে। আগে সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ডেঙ্গুর পিক দেখা যেত, কিন্তু ২০২৩ সালে জুন মাস থেকেই রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং এ প্রবণতা ২০২৪-২০২৫ সালেও অব্যাহত ছিল। শহরাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকায় ডেঙ্গুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এটি দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ছে।
২. বাংলাদেশে গত এক দশকে ডেঙ্গুর প্রকোপ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০০০ সালের দিকে ডেঙ্গুকে মূলত একটি নগর রোগ হিসাবে দেখা হলেও বর্তমানে এটি দেশের প্রায় সব জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। ২০২৩ সালে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ জেলায় প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যায় গড়ে ৬.৯৩ ও ৬.৩৬ জন আক্রান্ত হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর চেয়ে ২৩ গুণ বেশি (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ২০২৪)। দক্ষিণ উপকূলীয় জেলা বরিশাল, খুলনা, পিরোজপুরেও ঝুঁকি বেড়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এ প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে, যা প্রমাণ করে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি রোগ নয়, এটি সারা বছরের হুমকি।
২০২৩ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেখিয়েছে, শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে এ সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, বিশেষ করে উৎস নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
৩. ডেঙ্গু একটি অ্যার্বোভাইরাল রোগ, যা ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সৃষ্ট। এই ভাইরাসের চারটি সেরোটাইপ রয়েছে-DENV-1, DENV-2, DENV-3 ও DENV-4। ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রধানত DENV-2 সেরোটাইপ ছড়িয়েছে, যেখানে ২০১৯ সালে DENV-3 ছিল প্রধান (WHO, 2023)। সেরোটাইপ পরিবর্তনের ফলে দ্বিতীয় সংক্রমণে রোগের তীব্রতা এবং মৃত্যুহার বাড়তে পারে।
ডেঙ্গুর প্রধান বাহক এডিস ইজিপ্টি মশা, যা মূলত শহুরে এলাকায় বেশি সক্রিয়। এছাড়া এডিস অ্যালবোপিকটাস গ্রামীণ অঞ্চলেও দেখা যায়। এ মশাগুলো স্থির বা বদ্ধ পানিতে ডিম পাড়ে। ডিমগুলো পানির পাত্রের দেওয়ালে লেগে থাকে এবং শুকনো অবস্থায়ও দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে পানি জমলেই সেখান থেকে লার্ভা জন্ম নেয়। বাসাবাড়ির ছাদ, ফুলের টব, ড্রাম, টায়ার, বোতল, পানির ট্যাংক, ফ্রিজের নিচের ট্রে কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জমে থাকা পানি-এ সবই এডিস মশার সম্ভাব্য প্রজননস্থল। এক চামচ পানিতেও এই মশা ডিম পাড়তে পারে। তাই ফগিং বা ওষুধ ছিটানো সাময়িকভাবে কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মশা মারতে পারলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। ডিম ও লার্ভা থেকে নতুন মশা আবার জন্ম নেয়।
৪. ডেঙ্গু প্রতিরোধে নগর ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব হলো নিয়মিতভাবে সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করা এবং তা অপসারণ করা। নির্মাণাধীন ভবন, খোলা জায়গা, জলাবদ্ধ এলাকা এবং বর্জ্য জমে থাকা স্থানগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
৫. নাগরিক সচেতনতা ও অংশগ্রহণ ডেঙ্গু প্রতিরোধে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এডিস মশার বেশির ভাগ প্রজননস্থলই মানুষের বাসাবাড়ির আশপাশে তৈরি হয়। তাই বাসা বা আশপাশে তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেওয়া যাবে না।
ফুলের টব, পানির ড্রাম, ছাদের পানির ট্যাংক, ফ্রিজের ট্রে বা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। প্রতি তিন থেকে সাত দিনে এসব পাত্র খালি করে পরিষ্কার করা উচিত। পুরোনো টায়ার, বোতল, কৌটা উলটে রাখতে হবে বা ফেলে দিতে হবে। স্কুল, মসজিদ, সামাজিক সংগঠন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সচেতনতা বাড়লে জনগণ নিজেরাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী হবে।
৬. আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ডেঙ্গু ঝুঁকি নির্ণয় করা এখন অনেক সহজ হয়েছে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার ডেঙ্গু ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আমার গবেষণায় দৈনিক ডেঙ্গু কেস ডেটা, আবহাওয়া, জনসংখ্যা, ভূ-প্রকৃতি এবং সামাজিক-পরিবেশগত তথ্য মিলিয়ে প্রায় ১৫টি ফ্যাক্টর বিবেচনা করে ডেঙ্গুর ঝুঁকি এলাকা চিহ্নিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, নির্মাণাধীন ভবন, ভেজা পাত্র, নগরায়ণ এবং জলাশয়ের নিকটবর্তিতা ফ্যাক্টরগুলো ডেঙ্গুর ঝুঁকির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। তাপমাত্রা বাড়লে মশার জীবনচক্র দ্রুত হয় এবং ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতাও বাড়ে। বর্ষাকালে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। জনঘনত্ব, হাসপাতালের দূরত্ব, সড়কের দূরত্ব, উচ্চতা এবং নারী শিক্ষার হার প্রতিটি ফ্যাক্টরিই ডেঙ্গুর ঝুঁকির সঙ্গে জড়িত। তবে, আমার গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে নির্মাণাধীন ভবনগুলো এডিস মশা (Aedes) পজিটিভ গণনার সঙ্গে প্রায় r = 0.597 সম্পর্কিত এবং পানি জমে থাকা পাত্রগুলো এডিস মশার পজিটিভ গণনার সঙ্গে প্রায় r = 0.766 সম্পর্কিত। ফলে এ দুটি ইস্যু অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
এ ধরনের ডেটাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা গেলে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব। এতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারে। হটস্পট স্থানান্তর এবং মৌসুমী পরিবর্তন বিবেচনা নিয়ে ডেঙ্গু প্যটার্ন চিহ্নিত করা এখন সময়ের দাবি।
৭. ডেঙ্গু শুধু একটি স্বাস্থ্য সমস্যা নয়; এটি নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও সামাজিক সচেতনতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়ন ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো মশার উৎস ধ্বংস করা। ফুলের টব, ড্রাম, টায়ার বা অন্য কোনো পাত্রে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করা হলে মশার প্রজনন উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। গবেষণা বলছে, সঠিকভাবে উৎস নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ডেঙ্গু মশার সংখ্যা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ কমানো সম্ভব। তাই প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ নাগরিক-সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকেরও দায়িত্ব। যদি আমরা আজ থেকেই সচেতন হই এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে উদ্যোগী হই, তবে ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
মোহাম্মদ সফি উল্যাহ : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, ফাউন্ডেশন ফর জিওইন্টেলিজেন্স পলিসি সাপোর্ট
