কালচারাল রোডম্যাপ
Advertisement
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
(গতকালের পর)
আরকিওলজি, কালচার ও পর্যটনের সমন্বয়
যৌক্তিক কারণেই অনেক দেশই সংস্কৃতি ও পর্যটনকে একই মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালনা করে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় ধরনের পর্যটনই নির্ভর করে একটি দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, মিউজিয়াম, ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক ও প্রাকৃতিক নিদর্শন, কুলিনারি এবং সামগ্রিক কালচারাল রিপ্রেজেন্টেশনের ওপর। বর্তমান বিশ্বে শুধু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অস্তিত্বই যথেষ্ট নয়। মানুষকে এসব স্থানে আকৃষ্ট করতে হলে মিউজিক, সাউন্ড, লাইট, ইতিহাস বর্ণনা করার জন্য আর্ট ইনস্টলেশন, কুলিনারি এবং নানা রকম ভিজুয়াল ইলেমেন্ট প্রয়োজন হয়।
এ কাজগুলো করার জন্য বর্তমানে সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ বিভাগ সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলেও পর্যটন খাত বেসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। দায়িত্ব বণ্টনের এ কাঠামোটি খানিকটা অস্বাভাবিক। দুই খাতকে একীভূত করা গেলে প্রতিবছর পরিষ্কার টার্গেট বেজ্ড অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি, বাস্তবায়ন ও মনিটর করা যাবে।
পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারও প্রয়োজন। বর্তমানে আমাদের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, আর্কাইভ, জাদুঘর এবং অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে, এসব প্রতিষ্ঠানের প্রধানরা নিজ নিজ ক্ষেত্রে যেন বিশেষজ্ঞ হন। সাবজেক্ট এক্সপার্ট ছাড়া বর্তমান দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করা অসম্ভব হবে। এ কারণেই বিধান সংশোধন করে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, পাহাড়পুরসহ দেশের অন্যান্য বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থানগুলোকে একটা ক্লাস্টারের আওতায় এনে একটা বুদ্ধিস্ট ট্যুর প্যাকেজ করলে এবং সেখানে বুদ্ধিস্ট কালচার, মিউজিক, কুলিনারির সমন্বয় ঘটালে এটা পূর্ব-এশিয়ার বিপুলসংখ্যক পর্যটককে আকৃষ্ট করতে পারে। এরকম আরও অনেক ইনোভেটিভ পরিকল্পনা সম্ভব, যদি আমরা সাবজেক্ট এক্সপার্টদের নিয়োগ দিতে পারি।
মিউজিয়াম সংস্কার
গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল আমাদের প্রথম দৃশ্যমান অর্জন। কিন্তু ইতিহাসকে দলীয় ও আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করতে না পারলে এ অর্জন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। ইতিহাস ও ঐতিহাসিক বয়ান প্রায়ই একটি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রণ করার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো, বিকৃত সিলেক্টিভ ইতিহাস থেকে বেরিয়ে আমাদের দীর্ঘ ইতিহাসকে সম্পূর্ণরূপে গ্রহণ করা। কৃষক আন্দোলন থেকে শুরু করে শের-ই-বাংলার উত্তরাধিকার, ভাসানী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়া, সবার অবদান ও ভূমিকা ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে স্বীকার করতে হবে। এতে আমরা আওয়ামীপন্থি বুদ্ধিজীবীদের তৈরি ‘এক ব্যক্তি, এক দল, এক সংস্কৃতি’-কেন্দ্রিক আধিপত্যবাদী কাঠামো থেকে মুক্ত হতে পারব।
এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমাদের ইতিহাস গবেষণা এবং এর ভিত্তিতে মিউজিয়াম ডিসপ্লে এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল কনটেন্টকে একত্রে নিয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। জাদুঘর কোনো নির্দিষ্ট সময়কালকে দেখার বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে জাদুঘর সবচেয়ে অর্থবহ সাংস্কৃতিক পরিসরগুলোর একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু আমাদের জাদুঘরগুলোর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। প্রথমত, জাদুঘরগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ খুবই দুর্বল। দ্বিতীয়ত, সেখানে এমন কোনো কার্যকর কিউরেশন নেই, যার মাধ্যমে প্রদর্শিত বিষয়বস্তু ও গল্পগুলো দর্শকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গল্প বলতে পারে। একটি জাদুঘরে কিছু নিদর্শন দেখানোই যথেষ্ট নয়। আধুনিক জাদুঘর পরিকল্পনা করা হয় এমনভাবে, যাতে দর্শক একটি এনগেজিং স্টোরিটেলিং এক্সপেরিয়েন্সের মধ্য দিয়ে যাত্রা করতে পারেন। জুলাই জাদুঘর এর একটা বড় উদাহরণ। ফরাসি শীর্ষ দৈনিক লা মোঁদে থেকে শুরু করে জার্মান ডেইলি টাজ বা ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টাইমস জুলাই জাদুঘরের ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছেন। এর প্রধান কারণ জুলাই মিউজিয়াম নানারকম আধুনিক মাধ্যম ব্যবহার করে ধাপে ধাপে ফ্যাসিজমের নিষ্ঠুরতার গল্পটা এমনভাবে বলে যে, দর্শক একটা ভিসারাল এক্সপেরিয়েন্সের মধ্য দিয়ে যায়। তরুণ প্রজন্মের কাছে মিউজিয়ামকে আকর্ষণীয় করে তুলতে জাতীয় জাদুঘরসহ দেশের সব জাদুঘরে এই জুলাই মিউজিয়ামের মডেল অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জিয়া উদ্যানকে কেন্দ্র করে একটি ‘মিউজিয়াম আইল্যান্ড’
ক্রিসেন্ট রোডের শেষপ্রান্তে ইতোমধ্যে জুলাই জাদুঘর নির্মিত হয়েছে, যা উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে। এ জাদুঘর শুধু জুলাই মাসের ৩৬ দিনের ঘটনাপ্রবাহের গল্প বলে না; বরং এটি ৫৪ বছরের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস এবং ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ ও জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের একটি বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে। তবে এর চেয়েও বৃহৎ একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা যেতে পারে। জিয়া উদ্যান থেকে জুলাই জাদুঘর পর্যন্ত সমগ্র এলাকাকে একটি ‘মিউজিয়াম আইল্যান্ড’ বা জাদুঘর দ্বীপে রূপান্তর করা। জিয়া উদ্যান মূলত স্বাধীনতার ইতিহাস থেকে শুরু করে ১৯৯১ সালে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের ইতিহাসকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা যেতে পারে। এর পাশাপাশি জমিদারবিরোধী কৃষক আন্দোলন, শের-ই-বাংলা, ভাসানী এবং ১৯৭১ সালের আগে শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান এবং খালেদা জিয়ার ভূমিকা সেখানে স্থান পাওয়া উচিত। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত জাদুঘরে পরিণত হতে পারে।
ঢাকার উপকণ্ঠে একটি কালচারাল ডিস্ট্রিক্ট প্রতিষ্ঠা
বিশ্বের প্রতিটি দেশই তাদের নিজস্ব শক্তি বিবেচনায় নিয়ে নিজেদের সংস্কৃতিকে ব্র্যান্ডিং করার চেষ্টা করে। দক্ষিণ কোরিয়া নিজেকে কে-পপ, কে-ড্রামা, কে-ফুড এবং শক্তিশালী
চলচ্চিত্রশিল্পের দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ফ্রান্স নিজেকে শিল্প ও সংস্কৃতির ভূমি হিসাবে তুলে ধরেছে। ভারত বলিউড, যোগব্যায়াম এবং শাস্ত্রীয় সংগীতকে কেন্দ্র করে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করেছে। বাংলাদেশের এমন একটা ঐশ্বর্য আছে, যেটা দিয়ে আমরা একটা শক্তিশালী কান্ট্রি ব্র্যান্ডিং করতে পারি। সংগীত হচ্ছে আমাদের সেই কালচারাল অ্যাসেট। গান ছিল সবসময় আমাদের প্রধান ক্রিয়েটিভ এক্সপ্রেশন। আমরা আমাদের আনন্দ-বেদনার গল্প বলার পাশাপাশি গানের মাধ্যমে দর্শনের চর্চাও করেছি। চর্যাপদ থেকে লালন, ভাওয়াইয়া থেকে ভাটিয়ালি, শাহ আবদুল করিম থেকে রক, পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত আমাদের সংগীত ঐতিহ্য অতুলনীয়। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়ই নিজস্ব সংগীত ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক সম্পদ বিদ্যমান।
প্রস্তাবিত এ সাংস্কৃতিক জেলার কেন্দ্রবিন্দুতে বাংলাদেশি সংগীত নিয়ে একটি আধুনিক ও ইন্টারঅ্যাকটিভ মিউজিয়াম থাকা প্রয়োজন। এটি শুধু বাংলাদেশকে ‘সংগীতের দেশ’ হিসাবে ব্র্যান্ডিং করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসাবেই কাজ করবে না, বরং দেশি ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য একটি বড় আকর্ষণের জায়গায়ও পরিণত হবে। এ জাদুঘরের সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ইনডোর ও ওপেন-এয়ার কনসার্ট স্পেসও থাকবে, যাতে দর্শনার্থীরা সরাসরি মিউজিক্যাল এক্সপেরিয়েন্স পেতে পারেন।
যেহেতু এটার মূল উদ্দেশ্য হলো স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের মাঝে আমাদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের একটি পূর্ণাঙ্গ অভিজ্ঞতা দেওয়া, তাই শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শাখাকেও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এখানে থাকতে পারে-১. একটা ফিল্ম স্ট্রিট, যেখানে থাকবে মালটিপ্লেক্স চেইন এবং একটি মিনি সিনেমাথেক এবং একটি ফটোগ্রাফি গ্যালারি; ২. একটা আর্ট স্ট্রিট, যেখানে থাকবে আর্ট গ্যালারি এবং ওপেন-এয়ার ইনস্টলেশনের স্থান; ৩. একটা ক্রাফট স্ট্রিট, যেখানে পাহাড় ও সমতলের স্থানীয় হস্তশিল্প বিক্রি করা যাবে; ৪. একটা থিয়েটার স্ট্রিট, যেখানে থাকবে একাধিক থিয়েটার হল এবং ওপেন এয়ার থিয়েটার স্পেস; ৫. একটা ফ্যাশন স্ট্রিট, যেখানে থাকবে ফ্যাশন র্যাম্প এবং দেশি ডিজাইনারদের পোশাক বিক্রির শোরুম; ৬. একটা বুক স্ট্রিট, যেখানে থাকবে উন্মুক্ত স্থানে গল্প বলা, বই, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা ও বক্তৃতার সুযোগ এবং বই বিক্রয়ের ব্যবস্থা; ৭. একটা কুলিনারি স্ট্রিট, যেখানে থাকবে পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার প্রদর্শন ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা।
কক্সবাজারকে একটি সাংস্কৃতিক হাব হিসাবে গড়ে তোলা
কক্সবাজারকে একটি কালচারাল হাবে রূপান্তর করার উদ্যোগ অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে। এ ধারণাটি একটি টাউনশিপের মতো হবে, যেখানে বিভিন্ন ডিসিপ্লিনের আর্ট এডুকেশনের জন্য আবাসিক ক্যাম্পাস তৈরি করা হবে। যেমন-চলচ্চিত্র, থিয়েটার, সংগীত, চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, ভিডিও গেম ও ডিজাইন স্কুল, পাশাপাশি এআই ল্যাবও থাকবে। এ ক্যাম্পাসগুলো সমুদ্রকে কেন্দ্র করে স্থাপত্যগত দৃষ্টিনন্দনভাবে ডিজাইন করা হবে। দিনে দর্শনার্থীরা এসব ক্যাম্পাস ঘুরে দেখবে, আর রাতে সমুদ্রসৈকতের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের পরিবেশনা ও প্রদর্শনী উপভোগ করবে। এখানে প্রতি মাসে ছোট পরিসরের একটি সংগীত, চলচ্চিত্র ও থিয়েটার উৎসবের আয়োজন করা যেতে পারে, যেখানে দেশের শীর্ষ শিল্পীরা অংশ নেবেন। পাশাপাশি প্রতিবছর কক্সবাজারে একটি আন্তর্জাতিক ফ্ল্যাগশিপ সংগীত, চলচ্চিত্র ও থিয়েটার উৎসব আয়োজন করা যেতে পারে। একই সঙ্গে একটি আর্ট অ্যান্ড কালচার এক্সপোও অনুষ্ঠিত হতে পারে। আমাদের ফিল্ম স্টুডিও, পোস্ট ল্যাব এবং স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট হাব-এগুলো সব কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়া উচিত, যাতে করে এখানে একটা পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম সিটি গড়ে ওঠে।
এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো কক্সবাজারকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা। এ ছাড়া বিদ্যমান বড় আর্ট ইভেন্ট যেমন ‘ছবি মেলা’ এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক আয়োজনকে সরকারি সহায়তা দেওয়া উচিত এবং সেগুলোও ধীরে ধীরে কীভাবে কক্সবাজার ও ঢাকায় যুগপৎ আয়োজন করা যায়, সেটা ভেবে দেখা যেতে পারে। এগুলো সূক্ষ্মভাবে কালচারাল ডিপ্লোমেসির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পানাম নগরকে আর্ট ও ক্রাফটনির্ভর রিসোর্ট টাউন হিসাবে গড়ে তোলা
ইতোমধ্যেই পানাম সিটিতে একটি ক্রাফ্ট মিউজিয়াম রয়েছে, যা অবশ্যই আধুনিকায়ন ও সুন্দরভাবে কিউরেট করা প্রয়োজন। তবে আরও বড় করে ভেবে পুরো পানাম নগরকে একটি আর্ট ও ক্রাফটের শহরে রূপান্তর করা যেতে পারে। এখানে যে ৪৮টি বাড়ি এখনো রেনোভেট করা হয়নি, সেগুলোকে লিভিং মিউজিয়াম হিসাবে তৈরি করা যেতে পারে। প্রতিটি বাড়ি নির্দিষ্ট একটি থিমকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে। যেমন-তাঁতশিল্প, টেক্সটাইল, রন্ধনশিল্প, সংগীত, ফটোগ্রাফি, চলচ্চিত্র ও সাহিত্য। এর পাশাপাশি বাকি বাড়িগুলোয় পর্যাপ্ত রিসোর্ট নির্মাণ করতে হবে, যাতে পর্যটকরা সেখানে অবস্থান করে পুরো অভিজ্ঞতা উপভোগ করতে পারেন।
আর্কাইভ সংস্কার
আর্কাইভ এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যাকে আধুনিক দর্শনার্থীদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। আমাদের তরুণ প্রজন্মের অনেকে জানেই না ঢাকায় একটা আর্কাইভ আছে। সে হয়তো প্রতিদিন আর্কাইভের সামনে দিয়ে যাতায়াত করে, কিন্তু আর্কাইভ তার কাছে এগজিস্ট করে না। ডিজিটাল মিডিয়া প্ল্যানিংয়ের মাধ্যমে এটা পরিবর্তন করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন একটি পোস্ট করা হয় যে, ‘চা খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে প্রথম বিজ্ঞাপনটি কেমন ছিল জানেন?’ এবং এর সঙ্গে একশ বছরের পুরোনো সেই বিজ্ঞাপনের প্রিন্ট যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি বার্তাও থাকে যে, ‘আমাদের অতীতের বিস্ময়কর ইতিহাস জানতে জাতীয় আর্কাইভ ভিজিট করুন’-তাহলে তরুণরা সহজেই আকৃষ্ট হবে। বর্তমানে আর্কাইভে মূলত গবেষণার কাজে যুক্ত মানুষজনই বেশি যান।
দ্বিতীয় যে বিষয়টি প্রয়োজন, তা হলো জাতীয় আর্কাইভে ভৌত প্রদর্শনীর কিউরেশনকে উন্নত করা। শুধু মূল্যবান আর্কাইভাল সম্পদ থাকাই যথেষ্ট নয়; সেগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যাতে দর্শনার্থীরা একটি আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতার মাধ্যমে সেই ইতিহাসের ভেতর দিয়ে যাত্রা করতে আগ্রহী হয়। একটি টেকসই সংস্কারের পরিকল্পনা করতে হলে শীর্ষ পর্যায়ে একজন দূরদর্শী ও বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা জরুরি। বর্তমানে এটি ক্যাডার সার্ভিসভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ এবং এখানেই অনেক ভালো উদ্যোগ প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে যায়।
লালন ইনস্টিটিউট এবং আটটি বিভাগে সংগীত কনজারভেটরি
লালন আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সাংস্কৃতিক দূত, কিন্তু আমাদের ঔপনিবেশিক ও আধিপত্যবাদী মানসিকতা তাকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে সাহস পায়নি। লালনের দর্শন এ ভূখণ্ডের ভাব এবং অন্তর্নিহিত অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে চমৎকারভাবে একত্রিত করে। গত বছর থেকে লালনকে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের উদ্যাপনের অংশ করা হয়েছে। এখন যেহেতু আমরা লালনকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছি, তাই কুষ্টিয়ায় ‘লালন ইনস্টিটিউট’ নামে একটি সংগীত কনজারভেটরি প্রতিষ্ঠা করা সময়োপযোগী। এ ইনস্টিটিউট শুধু সংগীতশিল্পী প্রশিক্ষণের কেন্দ্রই হবে না; বরং লালন গবেষণার একটি প্রধান কেন্দ্র হিসাবে কাজ করবে। এটি আন্তর্জাতিক গবেষকদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসাবেও কাজ করবে।
দেশজুড়ে আরও ৯টি সংগীত কনজারভেটরি স্থাপন ও পরিচালনা করা উচিত। এর মধ্যে ৮টি থাকবে বিভাগীয় পর্যায়ে এবং একটি থাকবে আমাদের নৃতাত্ত্বিকভাবে বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জন্য নিবেদিত। এ কাঠামোটি সারা দেশের সংগীতশিক্ষা, গবেষণা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়কে বিকেন্দ্রীকরণও করা হবে, আবার সমন্বিত ব্যবস্থার অধীনেও আনবে, যা স্থানীয় ঐতিহ্য ও জাতিগত বৈচিত্র্যকে আরও সুসংগঠিতভাবে সংরক্ষণ ও বিকাশের সুযোগ দেবে।
কালচারাল ডিপ্লোম্যাসি
কালচারাল ডিপ্লোম্যাসি এমন একটি ক্ষেত্র, যাকে বাংলাদেশে কখনোই যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। অথচ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিক থেকে বিশ্বকে দেওয়ার মতো বাংলাদেশের অনেক কিছুই রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে সক্রিয়ভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে, যার লক্ষ্য হবে বাংলাদেশকে বিশ্বে সংগীতের দেশ, সুস্বাদু রন্ধনশিল্পের দেশ এবং উষ্ণ আতিথেয়তার দেশ হিসাবে ব্র্যান্ডিং করা। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পর্যায়ে তার কাঙ্ক্ষিত কালচারাল ন্যারেটিভ কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে পারবে। (চলবে)
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী : বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা; চলচ্চিত্র নির্মাতা
