Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

সৃষ্টির মাঝেই বেঁচে থাকবেন তিনি

Advertisement

মানুষ মাত্রই মরণশীল। মৃত্যুর অমোঘ সত্য পৃথিবীর সব মানুষকেই গ্রহণ করতে হবে। তবে কিছু কিছু মৃত্যু যুগ যুগ ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকে মানুষের হৃদয়ে। মানুষের কর্ম, চিন্তা-চেতনা, সৃষ্টিশীলতা তাকে বাঁচিয়ে রাখে যুগ থেকে যুগান্তরে। অমরত্বের অবগাহনে লালিত হন মনুষ্য স্মৃতিতে। তেমনই এক মানুষ ছিলেন যমুনা গ্রুপের মরহুম প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম। ২০২০ সালের আজকের এই দিনে আমরা তাকে হারিয়েছি। কোভিড-১৯ নামের একটি ভয়াল রোগ তাকে আমাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়।

তার সঙ্গে আমার তেমন কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল না; তবে যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানগুলোয় দেখা হতো, কথা হতো। যখনই তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তিনি হাস্যোজ্জ্বল মুখে আমাকে সাদর সম্ভাষণ জানিয়েছেন। পাশে বসিয়ে কুশল বিনিময় করেছেন। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেছেন। সদালাপী, বন্ধুবৎসল, সুঠামদেহী এ মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার কর্ম, সৃষ্টিশীলতা রয়ে গেছে। তার সবচেয়ে বড় অবদান হলো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি। দৃঢ়চেতা এ মানুষটি নিজের অক্লান্ত শ্রম আর মেধায় একে একে চল্লিশেরও অধিক শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যা দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং এসব শিল্প ও সেবা প্রতিষ্ঠানে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পাঠকপ্রিয় ও বহুল প্রচারিত জাতীয় দৈনিক ‘যুগান্তর’ এবং প্রথম সারির টেলিভিশন চ্যানেল ‘যমুনা টেলিভিশন’ তারই ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফসল। এ দুই মিডিয়াও তারই মতো দৃঢ়চেতা ও সাহসী ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। আমি যুগান্তরে নিয়মিত কলাম লিখছি। আমার লেখনীর স্বাধীনতায় তারা কখনোই হস্তক্ষেপ করেননি।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশের বাঙালিদের জীবনবোধে এক বিশাল পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ হিসাবে আমরা দেখতে পাই, এ দেশের বেশির ভাগ তরুণ আর্থিক সচ্ছলতা অর্জনে আগ্রহী। এরা দরিদ্র থাকতে চায় না। এরা হতে চায় প্রচুর অর্থবিত্তের মালিক। দরিদ্র জীবনের গ্লানি এরা একেবারেই পছন্দ করে না। এর পাশাপাশি এখনো একটি বিপরীতমুখী মনোভাব ক্রিয়াশীল রয়েছে। কেউ অর্থবিত্তের মালিক হলে তাকে দেখে অন্যদের চোখ টাটায়। এটাই হলো আমাদের জীবনের কন্ট্রাডিকশন। তবে এ কথা সত্য, সমাজের সবাই যদি পরস্পরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রাচুর্যের জীবনে উন্নীত হতে পারে, তাহলে তার মতো ভালো কিছু হতে পারে না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে পুঁজিবাদী সমালোচকরা বলত, সমাজতন্ত্র হলো দারিদ্র্যের বণ্টন। সমাজতান্ত্রিক দেশে সমতা এলেও মানুষের জীবনযাত্রা দারিদ্র‌্যাবস্থায় থেকে যায়। কিছু কিছু সমাজতান্ত্রিক দেশের অভিজ্ঞতা অনেকটাই এমন ছিল। ধনীদের জীবন লাগামছাড়া ভোগবিলাসের ফলে উচ্ছন্নে যেতে বাধ্য, এমন ধারণা আমাদের সমাজে এখনো বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথ শেষের কবিতায় তার ধনাঢ্য এক চরিত্রের অধস্তন তিন পুরুষের অধঃপাতে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে উল্লেখ করেছেন। দেখা যাচ্ছে, আমাদের সমাজে চিন্তায় ধনবান হওয়ার ব্যাপারে বহুকাল ধরেই নেতিবাচক মনোভাব বিরাজ করছে।

চীনের নেতা দেং শিয়াও পিং-এর একটি বিখ্যাত উক্তি হলো-‘ধনী হওয়া খারাপ নয়’-এ উক্তিতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে এ ধনী হওয়াকে তিনি সবাই মিলে ধনী হওয়াই বুঝিয়েছেন। তাই চীনের বর্তমান জাতীয় লক্ষ্য হলো ২০৫০ সালের মধ্যে একটি মডারেটলি প্রস্পারাস নেশনে পরিণত হওয়া। পুঁজিবাদী সমাজে জাত পুঁজিপতিরা একটি ডায়নামিজম নিয়ে আসেন। এ গতি বা চলার শক্তি সমাজ বিকাশের জন্য অপরিহার্য। মরহুম নুরুল ইসলাম তার প্রাথমিক পুঁজি কীভাবে সংগ্রহ করেছিলেন, তা আমার জানা নেই। যেভাবেই সে পুঁজি সংগৃহীত হয়ে থাক না কেন, তাকে তিনি চমৎকারভাবে ব্যবহার করেছেন। গড়ে তুলেছেন নানা রকম শিল্প। বাংলাদেশের অভ্যুদয়কালে বাংলাদেশ ছিল শিল্পে অত্যন্ত অনগ্রসর একটি দেশ। টাকা-পয়সা ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যবহার করা যায়, টাকা-পয়সাওয়ালারা অনেকেই ভাবতেও পারতেন না, এ টাকা-পয়সা শিল্পকারখানা গড়ার জন্য ব্যয় করা যায়। অর্থাৎ তারা টাকা দিয়ে টাকা করতে চেয়েছেন; কিন্তু টাকা দিয়ে পণ্য তৈরির ঝুঁকি তারা নিতে চাননি। এ অনগ্রসর মনমানসিকতার জগতে নুরুল ইসলাম রীতিমতো একটি বিপ্লব ঘটিয়ে দেন নানা রকমের শিল্পকারখানা গড়ে তুলে। অর্থাৎ তিনি কাগজের মুদ্রার রূপান্তর ঘটিয়ে বস্তুগত পণ্য তৈরি করার ঝুঁকি নিয়েছিলেন। মার্কিন অর্থনীতিবিদ ফ্র্যাংক নাইটের একটি বিখ্যাত গ্রন্থের শিরোনাম হলো ‘Risk, Uncertainty and Profit’. এই গ্রন্থে ফ্র্যাংক নাইট দেখিয়েছেন, পুঁজিবাদী অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য ঝুঁকি নিতে পারলে মুনাফা আহরণ করা যায়। এ মুনাফা উত্তরোত্তর বিনিয়োগ করে পুঁজিবাদী অর্থনীতি সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়। এটাকেই কাল মার্কস্ বলেছেন, বর্ধিত পুনরুৎপাদন। বর্ধিত পুনরুৎপাদন না থাকলে পুঁজিবাদ হয়ে পড়ত বদ্ধ জলাশয়ের মতো স্থবির ও উৎপাদন বৃদ্ধিহীন। মরহুম নুরুল ইসলাম একের পর এক শিল্পকারখানা গড়ে প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের মতো দেশেও বর্ধিত পুনরুৎপাদন সম্ভব। তিনি একের পর এক নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়েছেন। যেমন যমুনা ফ্যান, অ্যারোমেটিক সাবান, পেগাসাস কেড্স, পেগাসাস মোটরসাইকেলের মতো জনপ্রিয় বাংলাদেশি ব্র্যান্ড তৈরি করেছেন তিনি। শুধু গার্মেন্টস বা ডেনিম নয়, উৎপাদনের নানা বৈচিত্র্য এনেছেন স্বপ্নবান এ মানুষটি। গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন ফ্রিজের মতো নানা প্রয়োজনীয় পণ্য। পণ্যের মানের ব্যাপারে তিনি ছিলেন আপসহীন। তিনি সবসময় ভাবতেন, পণ্যের গুণগত মানের কারণে যে পণ্য মানুষ একবার কিনবে, প্রয়োজনে সে আবারও সেই পণ্য কিনতে দ্বিধা করবে না।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক জোসেফ এ শুম্পিটারের নামে একশ্রেণির উদ্যোক্তা বা এন্টারপ্রেনিয়ারের বৈশিষ্ট্য পুঁজিবাদী অর্থনীতি প্রসঙ্গে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। তিনি বলেছেন, উদ্যোক্তাদের ড্রাইভ, ইনিশিয়েটিভ ও ঝুঁকি গ্রহণের চরিত্র না থাকলে তারা প্রকৃত অর্থে উদ্যোক্তা হতে পারেন না। মরহুম নুরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ঝুঁকি গ্রহণ করতে শিখেছিলেন। শিখেছিলেন ড্রাইভ ও ইনিশিয়েটিভের মতো গুণাবলির চর্চা। যুদ্ধের ময়দানে যেসব চারিত্রিক গুণাবলির উৎকর্ষ সাধন তিনি করেছিলেন, সেগুলো অব্যাহত রাখেন শিল্পোদ্যোক্তা হিসাবে জীবনযুদ্ধে। তিনি কখনো ঋণখেলাপি হননি। যে দেশে ঋণখেলাপি হওয়াই বেশির ভাগ তথাকথিত শিল্পপতিদের অভ্যাস, সেখানে বিরল ব্যতিক্রম হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নুরুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠিত দৈনিক সংবাদপত্র যুগান্তর ঋণখেলাপ, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত সংগ্রাম করে যাচ্ছে। তার নিজের জীবনে এসব পাপাচারের কোনো ঠাঁই ছিল না। তাই নিজের প্রতিষ্ঠিত দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলতে পেরেছেন এমন এক সমাজসচেতনতা, যা এসব পাপাচারকে ঘৃণা করে। তিনি যমুনা টেলিভিশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। এটি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে তাকে বিরাট বাধা মোকাবিলা করতে হয়েছে। আর্থিক ক্ষতিও কম হয়নি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হয়েছেন এই প্রথম শ্রেণির স্যাটেলাইট টেলিভিশন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠায়।

এক নদী রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব যে কোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু কারা এ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পারে-সেটি এক বিরাট প্রশ্ন। আমার দৃষ্টিতে মনে হয়, তিনটি শ্রেণি স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার বর্ম হিসাবে কাজ করে। এ শ্রেণি তিনটি হলো-জাতীয় শিল্পোদ্যোক্তা, কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণি। জাতীয় শিল্পোদ্যোক্তা স্বাধীনতা রক্ষায় দাঁড়াতে চাইবে তার বাজার রক্ষার জন্য। কৃষক স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কাজ করবে তার জমি ও ফসল রক্ষার জন্য। শ্রমিক শ্রেণি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে তার শ্রমের বাজার অটুট রাখার জন্য। মরহুম নুরুল ইসলামের জন্ম ও জীবন ধন্য হয়েছে দেশপ্রেমিক শ্রেণির কাতারভুক্ত হওয়ার ফলে। তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তাহলে বাংলাদেশ উপকৃত হতো।

তাকে একজন সফল স্বদেশি শিল্পোদ্যোক্তা বলা যায়। কারণ তিনি যা কিছু গড়েছেন, নিজ দেশেই গড়েছেন। দেশের টাকা দেশেই সদ্ব্যবহার করেছেন, যেটা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। কঠিন প্রতিকূলতাকে কীভাবে কাটিয়ে উঠতে হয়, সেটা তার জানা ছিল। যে কোনো ধরনের কঠিন কাজ তিনি চমৎকারভাবে সুসম্পন্ন করেছেন। তার তৈরি করা পথে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই হয়তো এগিয়ে আসবেন। তবে এমন একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, সফল উদ্যোক্তা এবং বিচক্ষণ ও অদম্য সাহসী ব্যক্তিকে হারানোর ক্ষতি অপূরণীয়। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে আমাদের হয়তো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

বাংলাদেশের শিল্পপতিদের অনেকে ঋণখেলাপি হয়ে যান। কিন্তু তিনি এক টাকাও খেলাপি না হয়ে পরপারে যাত্রা করেছেন। এই মৃত্যু মহৎ মৃত্যু। আজকে তার এই প্রয়াণ দিবসে আমি আল্লাহতায়ালার কাছে তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম