Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও পরিবেশগত সংকট

Advertisement

Icon

ড. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

অপরিকল্পিত উন্নয়ন, ভৌগোলিক বাস্তবতা ও পরিবেশগত সংকট

ফাইল ছবি

Advertisement

বাংলাদেশ মূলত একটি বন্যাপ্রবণ নিম্নভূমি, যা আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে নিচু। দেশের উত্তর দিকে হিমালয় পর্বতমালা এবং পূর্ব দিকে মিয়ানমার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এ ভূখণ্ডকে দুই দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। এ অববাহিকার উপর দিয়ে অসংখ্য নদী প্রবাহিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রধান তিনটি নদী হলো-পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা। নদীগুলোর ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা পানির উৎস অঞ্চল প্রায় ১৫ লাখ বর্গকিলোমিটার, যা থেকে সংগৃহীত বিপুল পানিপ্রবাহ মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ বাংলাদেশের উপর দিয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে।

এ ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে বর্ষা মৌসুমে ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় বৃষ্টি হলে এ দেশের বেশিরভাগ এলাকা নিমজ্জিত হয়ে যায়। বড় ধরনের বন্যা হলে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি প্লাবিত হয়। এটি এ প্লাবনভূমির একটি চিরায়ত প্রাকৃতিক ঘটনা। প্রতিবছরই এখানে কম-বেশি বন্যা হয় এবং ২০ থেকে ৫০ বছর পরপর ১৯৮৮, ১৯৯৮, ১৯৯৯ বা ২০০৪ সালের মতো বড় ধরনের বন্যা দেখা দেয়। এর বাইরে ২০২২ সালে সিলেটের বন্যার মতো কিছু আঞ্চলিক বন্যাও হয়ে থাকে।

বন্যার মূল কারণ এ নিম্নাঞ্চল এবং মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে প্রচুর বৃষ্টিপাত। অতিবৃষ্টি সারা ক্যাচমেন্ট এরিয়ায় হলে বড় বন্যা হয়, আর আংশিক বৃষ্টি হলে সৃষ্টি হয় আঞ্চলিক বন্যা। যেমন, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে একটি নিম্নচাপের কারণে গত ৪২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। কিন্তু এ অল্প সময়ে বিপুল বৃষ্টিপাতের পানি নিষ্কাশন করার ক্ষমতা আমাদের বর্তমান ড্রেনেজ সিস্টেমের নেই।

বাংলাদেশ যখন প্রাকৃতিকভাবে একটি নদীমাতৃক দেশ ছিল, তখন অসংখ্য নদী ও খাল মানবদেহের রক্তবাহী শিরার মতো প্রতিটি অঞ্চল থেকে পানি টেনে নিয়ে যেত। কিন্তু বর্তমানে অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে বহু নদী ও খাল ভরাট করে ফেলা হয়েছে। এ দেশের ভূপ্রকৃতি উত্তর থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে ক্রমেই ঢালু। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দিনাজপুর অঞ্চল যেখানে ৩৬ থেকে ৪০ মিটার উঁচু, সেখানে বঙ্গোপসাগর সম্পূর্ণ সমুদ্রপৃষ্ঠের সমান্তরালে অবস্থিত। ফলে অতীতে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি কোনো বাধা ছাড়াই এ ঢাল বেয়ে সাগরে চলে যেত।

উন্নয়ন ও শস্যের সুরক্ষার উদ্দেশ্যে নদীগুলোর প্লাবনভূমিতে ডিকে প্রজেক্ট, মেঘনা-ধনাগোদা প্রজেক্ট এবং উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ বা এমবাংকমেন্ট দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর একটি মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব এখন স্পষ্ট। পলি জমে বা সিল্টেশন হয়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে গেছে এবং খালের উপর বাড়িঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বন্যার পানি এখন আর প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে না, কেবল নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়। আগে স্বাভাবিক বর্ষায় প্লাবনভূমিতে পানি উঠত এবং পলি জমে জমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি পেত। কিন্তু এখন অনেক প্লাবনভূমিতে পানি ঢোকার সুযোগই নেই।

নদী ও খালের পানি ধারণ ও নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টি হলেই বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও শহরাঞ্চলে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ঢাকা শহরের ভূপ্রকৃতি অত্যন্ত চমৎকার। এর কেন্দ্রভাগ বেশ উঁচু এবং পুরোনো মাটিতে গঠিত হওয়ায় তা সাধারণত বন্যায় প্লাবিত হয় না। অন্যদিকে এর পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণাঞ্চল তুলনামূলক নিচু। অতীতে ঢাকা শহর যখন ছোট ছিল, তখন ভারি বৃষ্টি হলে পানি প্রাকৃতিকভাবেই এ তিন দিকের নিচু জলাভূমিতে চলে যেত এবং সেখান থেকে বালু, শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদী হয়ে দ্রুত নিষ্কাশিত হতো। কিন্তু বর্তমানে এ নিচু জলাভূমি ও খাল ভরাট করে অপরিকল্পিত আবাসন ও উপশহর গড়ে তোলা হয়েছে। তার ওপর পলিথিন ও অপচনশীল বর্জ্য ফেলে শহরের ড্রেনেজ সিস্টেমকে সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় পানি জমে যায়, যাকে ‘আরবান ফ্লাডিং’ বা নগর বন্যা বলা হচ্ছে। এখন প্রাকৃতিকভাবে পানি সরার পথ না থাকায় কৃত্রিম পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে পানি সেচে সরাতে হচ্ছে। এ পাম্পগুলো চালানোর জন্য প্রচুর পরিমাণ পেট্রোলিয়াম বা জ্বালানি তেল পোড়াতে হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম শহরের ভূপ্রকৃতি ও সংকট ঢাকার চেয়ে ভিন্ন। ঢাকা সমতল ভূমি হলেও চট্টগ্রাম মূলত পাহাড় ও উপত্যকার সমন্বয়ে গঠিত। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে ঢলের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাটি ও পলি সরাসরি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় এসে পড়ে। ফলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে যেসব বক্স কালভার্ট বা ড্রেন তৈরি করা হয়েছে, তা এক বছরের মধ্যেই পলিতে সম্পূর্ণ ভরাট হয়ে যায়। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার প্রজেক্টের মধ্যে ১০ হাজার কোটি টাকাই খরচ হয়ে গেছে; কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। এর বড় কারণ, এ মেগা প্রজেক্ট করার সময় চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক জোয়ার-ভাটার মেকানিজমকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। জোয়ারের সময় সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় শহরের পানি দীর্ঘ সময় নদীতে বা সাগরে নামতে পারে না, অনেক সময় ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত পানি অবরুদ্ধ থাকে।

জলাবদ্ধতার এ সমস্যা এখন শহরের গণ্ডি ছাড়িয়ে গ্রামেও দেখা দিয়েছে। গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেও অপরিকল্পিতভাবে খাল ভরাট করে রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে। আমাদের নদী ও ভূমিরূপ প্রাকৃতিকভাবে উত্তর থেকে দক্ষিণে বিস্তৃত হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়িভাবে অসংখ্য সড়ক ও মহাসড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরের পানি যে দক্ষিণের দিকে নেমে যাবে, তার জন্য এ আড়াআড়ি সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণ ব্রিজ, কালভার্ট বা ওপেনিং রাখা হয়নি। ফলে আড়াআড়ি সড়কগুলো বাঁধের মতো কাজ করছে এবং অল্প বৃষ্টিতেই পুরো গ্রামে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে দেশটা একটি অবরুদ্ধ জলাভূমিতে পরিণত হচ্ছে।

এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও মডেল নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে হবে এবং একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পূর্ব-পশ্চিমে আড়াআড়িভাবে নির্মিত বড় বড় রাস্তাগুলোর ক্ষেত্রে জলবিজ্ঞানসম্মত মডেলিং করতে হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ কী পরিমাণ বৃষ্টিপাত হতে পারে, তা হিসাব করে সড়কগুলোতে পর্যাপ্ত সেতু ও কালভার্ট রাখতে হবে, যাতে পানি দ্রুত নেমে যেতে পারে।

আমাদের দেশের সামগ্রিক উন্নয়নকে পরিবেশ ও ভূপ্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে (অ্যাডাপটেশন) বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রকৃতির নিজস্ব মেকানিজম, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশকে রক্ষা করে যদি উন্নয়ন করা যায়, তবেই জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বর্তমান পরিবেশের এ নাজুক অবস্থাকে বিবেচনা না করে এবং সচেতনতা তৈরি না করে যদি সরকার অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত রাখে, তাহলে তা থেকে কোনো সুফল আসবে না।

ড. মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান : অধ্যাপক, দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম