Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

জলাবদ্ধতা : নগর পরিকল্পনার সংকট

Advertisement

Icon

খালিদ মাহমুদ

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জলাবদ্ধতা : নগর পরিকল্পনার সংকট

ফাইল ছবি

Advertisement

বৃষ্টিকে ঘিরে মানুষের আবেগের শেষ নেই। গান, কবিতা, গল্প-সবখানেই বৃষ্টি এক রোমান্টিক অনুভূতির উপাদান। জীবনে একবারও বৃষ্টিকে উপভোগ করেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বোধহয় কঠিন। অথচ ঢাকা শহর এক অদ্ভুত বাস্তবতার নাম, যেখানে বৃষ্টি আশীর্বাদ না হয়ে অনেক সময় ভোগান্তির প্রতীকে পরিণত হয়।

যে বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল পরম কাঙ্ক্ষিত, সেটাই কেন নগরবাসীর দুর্ভোগের কারণ হয়ে ওঠে? কোটি মানুষের শহর ঢাকায় বৃষ্টি নামলেই প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ে, তা হলো সুয়ারেজ লাইনের উপচে পড়া নোংরা পানি। রাস্তাজুড়ে সৃষ্টি হয় অসহনীয় যানজট। কাকভেজা অফিসগামী মানুষের সময় বাঁচাতে হেঁটে যাওয়ারও উপায় থাকে না। ভাঙাচোরা ফুটপাত যেন আরেক মৃত্যুফাঁদ। সামান্য অসাবধানতায় খোলা ম্যানহোলে দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার ঝুঁকিও থেকে যায়।

এ দৃশ্য নতুন নয়; বহু পুরোনো। কিন্তু সমস্যার কার্যকর সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা আজকের সমস্যা নয়-যুগের পর যুগ এটি চলমান। অসংখ্য পরিকল্পনা, প্রকল্প ও গবেষণা হয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো দৃশ্যমান উন্নতির লক্ষণ খুবই সামান্য। প্রশ্ন হলো, ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতার স্থায়ী প্রতিকার কীভাবে সম্ভব?

আসলে ‘বৃষ্টি আমাদের ভোগায়’-এ কথাটিকে উলটো করেও বলা যায়, ‘আমরাই বৃষ্টিকে ভোগাচ্ছি।’ কারণ বৃষ্টির পানির একটি স্বাভাবিক প্রবাহপথ রয়েছে। অতিরিক্ত পানি শহরের প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও পরিকল্পিত ড্রেনেজব্যবস্থার মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী নদীতে গিয়ে মিশে যাওয়ার কথা; কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। শহরের বেশির ভাগ খাল দখল ও ভরাট হয়ে পিচঢালা সড়কে পরিণত হয়েছে। ড্রেনগুলো প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা ধরনের বর্জ্যে আটকে আছে। ফলে পানি নামার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সত্য কথা বলতে গেলে, নগরবাসী হিসাবে আমরাই নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে এনেছি।

একটি সমস্যা যখন দীর্ঘদিন চলতে থাকে, তখন তার শাখা-প্রশাখাও বিস্তৃত হয়। জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু ‘পানি জমার’ সমস্যা নয়; এটি নগরজীবনের বহুমাত্রিক সংকটে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, ইন্টারনেট, সড়ক যোগাযোগ-প্রতিটি নগরসেবাই এর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাটির নিচে থাকা অদৃশ্য অবকাঠামোগুলো সচরাচর চোখে না পড়লেও জলাবদ্ধতার কারণে সেগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো প্রাণঘাতী রোগের আতঙ্ক। স্থির পানিতে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য আজ মারাত্মক হুমকির মুখে।

এর পাশাপাশি জলাবদ্ধতার অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থেকে প্রতিদিন অপচয় হচ্ছে কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি। ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা সময়মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারছে না, জরুরি চিকিৎসাসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। অর্থাৎ জলাবদ্ধতা এখন শুধু একটি মৌসুমি দুর্ভোগ নয়; এটি নগর অর্থনীতি ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে সমস্যা যত গভীরই হোক, সমাধানের পথ অবশ্যই আছে। প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সমস্যার মূল কারণ সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। এখানেই আমাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আমাদের অধিকাংশ সমাধানই অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদি-যেন বাইপাস সার্জারির মতো। যেখানে সমস্যা দেখা দেয়, সেখানেই সাময়িক কাটাছেঁড়া করে তাৎক্ষণিক স্বস্তি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। ফলে বাস্তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয় না; বরং এক এলাকার সমস্যা অন্য এলাকায় গিয়ে সৃষ্টি হয়।

ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েকটি বিষয় অত্যন্ত জরুরি। প্রথমত, শহরের প্রাকৃতিক খাল ও জলাধার উদ্ধার করতে হবে এবং সেগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আধুনিক ও সমন্বিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা ভবিষ্যতের জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিও বিবেচনায় নেবে। তৃতীয়ত, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করতে হবে, যাতে প্লাস্টিক ও আবর্জনা ড্রেনে জমে পানি প্রবাহ বন্ধ না করে। চতুর্থত, নগর পরিকল্পনায় জলাধার ও উন্মুক্ত সবুজ এলাকার পরিমাণ বাড়াতে হবে, যাতে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে শোষিত হতে পারে। একই সঙ্গে নাগরিক সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি; কারণ শুধু সরকারি উদ্যোগ দিয়ে এ সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

ঢাকা শহরকে বাসযোগ্য রাখতে হলে জলাবদ্ধতাকে আর সাময়িক সমস্যা হিসাবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন একটি নগর অস্তিত্বের সংকট। প্রকৃতিকে জোর করে দমিয়ে রেখে টেকসই নগর গড়া যায় না; বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে সম্মান জানিয়েই পরিকল্পনা করতে হবে। আর সেই পরিকল্পনার সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে।

উন্নয়ন পরিকল্পনার সফলতা ও গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ যদি সমস্যাটিকে নিজের সমস্যা বলে মনে না করে, তবে যত সমাধানই প্রস্তাব করা হোক না কেন, তা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। তাই বিভিন্ন বিকল্প বিবেচনায় নিয়ে নাগরিকদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের চূড়ান্ত প্রস্তাবনা তৈরি করতে হবে। তাহলেই হয়তো একদিন বৃষ্টি আবারও ঢাকাবাসীর কাছে স্বস্তি ও সৌন্দর্যের প্রতীক হয়ে উঠবে, ভোগান্তির নয়।

খালিদ মাহমুদ : স্থপতি ও নগর উন্নয়ন পরামর্শক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম