হালফিল বয়ান
জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র
ড. মাহফুজ পারভেজ
প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক অতি সংকুল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলছে, যেখানে ভিড় করেছে জুলাই বিপ্লবের শত্রু-মিত্র, উভয় পক্ষই। ফলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে জুলাইকে কেন্দ্র করে বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা তৈরি করার পটভূমিতে অনুসন্ধান করতে হচ্ছে জুলাইয়ের চেতনায় রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে কারা সহযাত্রী, কারা প্রতিবন্ধক?
উত্তরটি খুঁজে বের করার আগে বিপ্লবের ইতিহাসে একটি পুরোনো সত্য জানতে হবে। সত্যটি হলো-বিপ্লবের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা বিপ্লবের সময় নয়, বিপ্লবের পর হয়। বিপ্লব বা আন্দোলনের মাধ্যমে সরকার পতন তুলনামূলক সহজ; কিন্তু বিপ্লবের ভাবাদর্শে রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানো অত্যন্ত কঠিন। কারণ একটি শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হলেও তার গড়ে তোলা রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক মানসিকতা, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী এবং ক্ষমতার নেটওয়ার্ক দীর্ঘদিন টিকে থাকে। তারা চেহারা ও চরিত্র বদলে বিপ্লবীর ভেক ধরে এবং সময় ও সুযোগ পেলে চরম অন্তর্ঘাত করতে থাকে। জুলাই বিপ্লবের দুই বছরের মাথায় বাংলাদেশে চলছে এ প্রতিবিপ্লবী গোষ্ঠীর শাঠ্য-ষড়যন্ত্রের খেলা। যে কারণে শুধু জুলাই বিপ্লবের মতাদর্শকে ব্যাহত করাই নয়, বিপ্লব ও আন্দোলনকে নোংরা ভাষায় আক্রমণ করার ঘটনাও সামনে দেখা যাচ্ছে।
ফলে বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একটি আক্রান্ত পরিস্থিতির মুখোমুখি। অথচ বাস্তবতা হলো, জুলাই কেবল একটি রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। নিছক ক্ষমতার মসনদ বদলের লড়াই ছিল না। ছিল রাষ্ট্রকে আরও জবাবদিহিমূলক, গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক করার আকাঙ্ক্ষা আর একদলীয় ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক সংস্কৃতির নোংরা অতীতকে মুছে ফেলার প্রত্যাশা। কিন্তু এ আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-জুলাইয়ের প্রকৃত মিত্র কারা? আর শত্রুই বা কারা? রাষ্ট্র পুনর্গঠনের পথে কারা সহযাত্রী, কারা প্রতিবন্ধক?
এ প্রশ্নের উত্তর কোনো ব্যক্তি বা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে খোঁজা উচিত নয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় গণতান্ত্রিক রূপান্তরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যক্তি নয়; কাঠামো, সংস্কৃতি এবং স্বার্থের জোট। তাই জুলাইয়ের শত্রু-মিত্রও ব্যক্তি নয়। বরং ধারণা, প্রতিষ্ঠান, আচরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতি। যদিও নানা ব্যক্তি ও গোষ্ঠী জুলাইয়ের শত্রুতা করছে নানা স্বার্থের কারণে। তারা আসলে গণতান্ত্রিক রূপান্তরবিরোধী কাঠামো, সংস্কৃতি এবং স্বার্থের জোটের অংশ।
যদি আমরা জুলাইয়ের মিত্র ও শত্রুদের তালিকা করি, তাহলে স্পষ্টভাবে বিষয়গুলো উন্মোচিত হবে। প্রথমেই মিত্রের তালিকা দেখা যেতে পারে। জুলাইয়ের প্রথম ও সবচেয়ে বড় মিত্র হলো গণতান্ত্রিকতার চেতনা ও মতাদর্শ। এখানে গণতন্ত্র বলতে শুধু নির্বাচন বোঝানো হচ্ছে না। বোঝানো হচ্ছে এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে আইনের শাসন থাকবে, ভিন্নমতের নিরাপত্তা থাকবে, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তন সম্ভব হবে এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় আনুগত্য নয়, সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকবে।
জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় মিত্র দলীয় তাঁবেদারদের বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের স্বাধীন চিন্তা। প্রতিটি গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক শক্তি আসে নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, গবেষক, সংস্কৃতিকর্মী এবং সচেতন নাগরিকদের কাছ থেকে। কিন্তু যখন স্বাধীন চিন্তার জায়গা সংকুচিত হয় এবং দলীয় চাটুকাররা একতরফা ও অগ্রহণযোগ্য বয়ান তৈরি করে, তখন কর্তৃত্ববাদ শক্তিশালী হয় আর ভিন্নমত পদদলিত হয়। জুলাইয়ের প্রকৃত চেতনা দলীয় আনুগত্যের নয়, নাগরিক অংশগ্রহণের স্বাধীন পরিবেশের মধ্যে নিহিত।
জুলাইয়ের তৃতীয় ও শক্তিশালী মিত্র তরুণ প্রজন্ম তথা ছাত্র-যুবশক্তি। ২০২৪ সালের জুলাই দেখিয়ে দিয়েছে, বাংলাদেশের তরুণরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় নয়, তারা প্রয়োজনে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও অবস্থান নিতে পারে। এমন একটি প্রাণবন্ত তরুণদের ভূমিকা যদি কেবল আন্দোলনে সীমাবদ্ধ থাকে এবং নীতিনির্ধারণ, স্থানীয় সরকার, রাজনৈতিক দল, সংসদ কিংবা রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের প্রবেশাধিকার না বাড়ে, তাহলে জুলাইয়ের শক্তি ধীরে ধীরে ক্ষয় হবে।
জুলাইয়ের শত্রুপক্ষের দিকে তাকালে প্রথমেই দেখা যায় আমলাতান্ত্রিক জড়তাকে। বিশেষজ্ঞ ম্যাক্স ওয়েবার আমলাতন্ত্রকে আধুনিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখেছিলেন। কিন্তু তিনি এটিও সতর্ক করেছিলেন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতা একটি লৌহখাঁচায় পরিণত হতে পারে, যেখানে নিয়ম, ফাইল ও ক্ষমতার জটিলতা জনগণের ইচ্ছাকে স্তব্ধ করে দেয়। বাংলাদেশে প্রশাসনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো-রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে অনেক সময় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে অতিরিক্ত অভিযোজনের অভিযোগ ওঠে। ফলে সরকার পরিবর্তিত হলেও প্রশাসনিক আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয় না। আমলারা সরকারি কাজের নামে দলের আজ্ঞাবহ হয়ে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিল করে এবং সরকারকে বিপথগামী করে।
জুলাই চেতনার দ্বিতীয় শত্রু দলবাজি। বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলো-রাষ্ট্র ও দলকে একাকার করে দেখার প্রবণতা। রাষ্ট্রের চাকরি, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদ, স্থানীয় সরকারে কর্তৃত্ব, পেশাজীবী সংগঠন দখল, এমনকি অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠানও দলীয় প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র হয়ে ওঠে। ফলে যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য মূল্যবান হয়ে ওঠে। দলীয়করণের মাধ্যমে সুবিধাপ্রাপ্তরা দলের বিপদে কাজে আসে না। বরং দলকে দুর্নামের ভাগীদারে পরিণত করে।
জুলাইয়ের তৃতীয় শত্রু দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। দুর্নীতি শুধু ঘুস নয়, এটি ক্ষমতার অপব্যবহার। বাংলাদেশে দুর্নীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো-অনেক ক্ষেত্রে এটি সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য আচরণে রূপ নেয়। জুলাইয়ের প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো, দুর্নীতিকে কেবল আইনি অপরাধ হিসাবে নয়, রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকট হিসাবে বিবেচনা করা।
চতুর্থ শত্রু লেজুড় সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশে চরম আকার ধারণ করেছে। যে কোনো বিপ্লবের পর একটি নতুন শ্রেণি তৈরি হয়-যারা আদর্শের জন্য নয়, সুবিধার জন্য বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হয়। বাংলাদেশেও এ প্রবণতা নতুন নয়। ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হলে কিছু মানুষ দ্রুত নতুন ক্ষমতার সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করে ফেলে। এ লেজুড় সংস্কৃতি বিপ্লবের নৈতিক শক্তিকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে।
জুলাইয়ের পঞ্চম শত্রু ব্যক্তিপূজা। ইতিহাসের প্রতিটি গণ-আন্দোলনের একটি ঝুঁকি হলো ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা। যখন কোনো আন্দোলন একটি ব্যক্তির সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে একীভূত হয়ে যায়, তখন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ব্যক্তিপূজার প্রবণতা বহুবার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করেছে।
জুলাইয়ের ষষ্ঠ শত্রু রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। জুলাই যদি ন্যায়বিচারের আন্দোলন হয়, তবে সেটি প্রতিশোধের আন্দোলন হতে পারে না। বিচার ও প্রতিশোধ এক জিনিস নয়। ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন-স্বাধীন তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আইনের সমান প্রয়োগ। যদি বিচারও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে গণতন্ত্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু আত্মতুষ্টি। বিপ্লবের পরে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানসিকতা হলো-‘আমরা সফল হয়েছি, এখন আর কিছু করার নেই।’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এটিকে Revolutionary Complacency বলা যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, গণ-অভ্যুত্থান পরিবর্তনের শুরু, শেষ নয়। যদি সংস্কার থেমে যায়, যদি জবাবদিহি দুর্বল হয়, যদি সমালোচনা গ্রহণের সংস্কৃতি হারিয়ে যায়, তাহলে পুরোনো সংকট নতুন রূপে ফিরে আসতে পারে। বিপ্লব ও আন্দোলন ব্যর্থ হতে পারে। পুরোনো শাসন ও ব্যবস্থাই বরং তখন ন্যায্যতা ও বৈধতা দাবি করতে পারে। ফলে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, জুলাইয়ের সামনে এখন কী করণীয়? এক্ষেত্রে উত্তর হলো, জুলাইয়ের প্রকৃত সুরক্ষা হবে চারটি মৌলিক নীতিতে। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজের উপযুক্ত করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় দলীয় চাটুকারদের উচ্ছেদ করা এবং বাইরে থেকে প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের পথ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, নৈতিক রাজনীতি-দলীয় আনুগত্যের চেয়ে জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। দলীয় নেতাদের গোষ্ঠী ও দলের বাইরে এসে বৃহত্তর পরিসরে চিন্তা ও কাজ করার মানসিকতার প্রমাণ দেওয়া। এর মাধ্যমে সরকারকে অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা এবং দলীয়করণের মাত্রা হ্রাস করা। তৃতীয়ত, নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা। মতামত প্রদান বা দায়িত্ব পালনের সুযোগ সৃষ্টি করে তরুণ, নারী, সংখ্যালঘু, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজকে নীতিনির্ধারণে যুক্ত করা। চতুর্থত, কেবল স্মৃতির রাজনীতিতে আচ্ছন্ন থাকার বদলে সংস্কারের রাজনীতিকে এগিয়ে নেওয়া। জুলাইকে শুধু স্মরণ ও আবেগের বিষয়ে পরিণত না করে রাষ্ট্র ও সরকারের গণতন্ত্রায়ণের বাস্তব নীতিতে রূপান্তর করা।
তাই জুলাই বিপ্লবের একচ্ছত্র চ্যাম্পিয়ন সেজে বাগাড়ম্বর গ্রহণযোগ্য নয়। গ্রহণযোগ্য হলো, জুলাই চেতনায় সমমনাদের একত্রিত করে রাষ্ট্র ও সরকারকে ফ্যাসিবাদী হতে না দেওয়া এবং দেশকে দ্রুততার সঙ্গে গণতান্ত্রিক সুশাসনের পথে এগিয়ে নেওয়া। এক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি। কারণ, ইতিহাস বলে, অনেক বিপ্লব বহিরাগত শক্তির কারণে ব্যর্থ হয়নি। ব্যর্থ হয়েছে নিজস্ব আদর্শ থেকে বিচ্যুতির কারণে।
অতএব, জুলাইকে রক্ষা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শত্রু-মিত্রের স্পষ্ট ধারণা সর্বত্র চিহ্নিত করা। রাষ্ট্র ও সরকারের শীর্ষ থেকে শেকড় বা তৃণমূল পর্যায়ের আমজনতা পর্যন্ত সবাই যেন বিপ্লবের মতাদর্শ, নীতি ও কার্যক্রম সম্পর্কে স্বচ্ছ বার্তা পায়। ব্যক্তি ও গোষ্ঠী যেন বিপ্লবকে কবজা করে বা বিপ্লবের বিরোধিতা করে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটাতে না পারে।
জুলাইয়ের প্রকৃত বিজয় হবে তখনই, যখন মানুষ নতুন ফ্যাসিবাদ বা দলীয়পনায় বিব্রত হবে না এবং আর কোনো নতুন গণ-অভ্যুত্থানের প্রয়োজন অনুভব করবে না। এবং রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও নেতারা নাগরিকের অধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের নির্ভরযোগ্য রক্ষাকবচ হয়ে উঠবে। সেটিই হবে জুলাই বিপ্লবের সর্বশ্রেষ্ঠ সাফল্য।
প্রফেসর ড. মাহফুজ পারভেজ : চেয়ারম্যান, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; নির্বাহী পরিচালক, চট্টগ্রাম সেন্টার ফর রিজিওনাল স্টাডিজ বাংলাদেশ (সিসিআরএসবিডি)
