জিয়া হত্যার সব তথ্য উদ্ঘাটিত হোক
Advertisement
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফাইল ছবি
|
ফলো করুন |
|
|---|---|
বাংলাদেশের ইতিহাসে জঘন্যতম একটি ঘটনা ছিল দেশের অন্যতম জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড। এ হত্যাকাণ্ডটা ঘটেছিল বিদেশি চক্রান্তের মাধ্যমে দেশীয় বিভ্রান্ত কিছু সামরিক অফিসারের মাধ্যমে। আমাদের তৎকালীন সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিভিন্ন বিভক্তি এবং বিভিন্ন দল-উপদল সৃষ্টি হওয়ার কারণে সেই সুযোগটা নিয়ে কিছু অফিসারকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল একটি প্রতিবেশী দেশ। এবং এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত হয়ে পড়েছিলেন আমাদের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং মেজর জেনারেল মঞ্জুর। মেজর জেনারেল মঞ্জুর একজন স্বনামধন্য মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন স্বাধীনতাযুদ্ধে। তার অপরিপক্বতার কারণে তিনি প্রতিবেশী দেশটির ফাঁদে পড়ে যান। তিনিসহ তার ২৪ ডিভিশনের হেডকোয়ার্টারে যেসব অফিসার ছিলেন এবং দু-চারজন সিনিয়র অফিসার ওই বিপথগামী অফিসারদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নির্মমভাবে ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জেনারেল জিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তবে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, জেনারেল জিয়াউর রহমানকে আগেই এসব সংকেত দেওয়া হয়েছিল গোয়েন্দা সংস্থা থেকে। বিভিন্ন ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছিল তখন দেশে। কিন্তু জিয়াউর রহমান যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কেননা যারা সঠিক নেতৃত্ব দেন দেশকে এবং বড় নেতায় পরিণত হন, তারা কিন্তু সহজসরল হন। মূলত তারা বক্র পথ নিয়ে চিন্তা করেন না। তিনি মনে করেছেন, আমি দেশের রাষ্ট্রপতি, আমি এত জনপ্রিয় সেনাবাহিনীতে, এ বাহিনী কোনো বিপদ ঘটাবে না। এ ধরনের একটা বিশ্বাস নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে গিয়েছিলেন দলীয় একটা মতবিরোধ দূর করার জন্য। আর সেই নির্মম রাতটা এলো এবং তাকে হত্যা করলেন আমাদের সামরিক বাহিনীর অফিসাররা। এটি খুবই মর্মান্তিক ঘটনা।
দেশের একজন রাষ্ট্রপতি এবং জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি, যিনি দেশকে ধারণ করেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে তার পরিষ্কার একটা দর্শন মানুষের কাছে দিয়েছেন, সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর ছিল তার পূর্ণ আস্থা-বিশ্বাস। তিনি এ দেশকে উপহার দিচ্ছিলেন সঠিক দিশা, সেই রাষ্ট্রপতির হত্যাকাণ্ডের বিচারটি কিন্তু এখনো হয়নি। তবে বিদ্রোহের বিচার হয়েছে। অর্থাৎ বিদ্রোহের বিচার হয়েছে সামরিক আদালতে।
আপনারা অনেকেই জানেন, সেই সামরিক আদালতের বিচার কার্যকর করতে গিয়ে তৎকালীন আইজি প্রিজন, যিনি ছিলেন একজন সামরিক অফিসার, তার নিজের ছেলে ক্যাপ্টেন জামিলকে পর্যন্ত তার সামনে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হয়। সেটা ছিল সবচেয়ে কষ্টকর বিষয়, বাবা নিজে ছিলেন আইজি প্রিজন এবং তার ছেলে আর্মির ক্যাপ্টেন, তাকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হচ্ছে। অর্থাৎ বিদ্রোহের বিচার হয়েছে; কিন্তু জেনারেল জিয়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে যেসব চক্রান্ত হয়েছে, কারা এ চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, দেশে-বিদেশের এ তথ্যগুলো কিন্তু তখন মানুষের মুখে মুখে চাউর হতো। কিন্তু বাস্তবে তদন্ত করে সেই বিষয়গুলো পরিপূর্ণভাবে বের করা হয়নি এবং তাদের বিচারও করা হয়নি।
পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া, স্বয়ং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী এবং যিনি দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতায় ছিলেন দুই টার্মে, তিনিও কিন্তু তখনো সেই বিচারের চেষ্টা করেননি কিংবা উদ্যোগ নেননি। কেন নেননি, সেটা তিনি ভালো বলতে পারবেন এবং তার দলই ভালো বলতে পারবে। এখন এ ঘটনার এত বছর পরে এসে মেজর মোজাফফর নামক এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলো। যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা রং দিয়ে এ কথাগুলো প্রচার করা হচ্ছে; কিন্তু এত রং লাগানো সঠিক নয়। কারণ মেজর মোজাফফর তো গত দুই বছর ধরেই বনানী ডিওএইচএসে বসবাস করছেন। তিনি তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠান করছেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। বেসিক্যালি হি ইজ নট ফ্রম মিলিটারি একাডেমি। তিনি জাতীয় রক্ষীবাহিনীর একজন অফিসার ছিলেন। তিনি ছিলেন সিক্স জেআরবি অর্থাৎ জাতীয় রক্ষীবাহিনীর যে ব্যাটালিয়ন ছিল, সেটার অধিনায়ক। জেআরবির একটু ব্যাকগ্রাউন্ড সংক্ষেপে বলতেই হয়। জেআরবি কোনো মিলিটারি অর্গানাইজেশন ছিল না। এটা ছিল বেসিক্যালি একটা আলাদা সংস্থা, ভারত যেসব ছাত্রকে দেরাদুনে নিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় জেনারেল ওসমানীর অজ্ঞাতে এবং তৎকালীন প্রবাসী সরকারের অজ্ঞাতে একটা প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, মূলত তাদের দিয়েই জাতীয় রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয় এবং এই মেজর মোজাফফর ছিলেন সেই জাতীয় রক্ষীবাহিনীর একজন সদস্য। তিনি কোনো সামরিক একাডেমি থেকে প্রশিক্ষিত অফিসার ছিলেন না। এবং এটা জেনে অনেকেই হয়তো মন খারাপ করবেন যে, জেআরবির অধিকাংশ লোকই ছিল শেখ মুজিব আর আওয়ামী লীগের ভক্ত এবং ভারতের ভক্ত। কেননা তাদের ওভাবেই তৈরি করা হয়েছিল। সেই সুবাদে মেজর মোজাফফরের ভারতপ্রীতি কিংবা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে আক্রোশ থাকতেই পারে এবং সেটাতে হয়তো তিনি জড়িত ছিলেন এবং ছিলেন বলেই হয়তো তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন তদন্ত করে বাকি সব তথ্য উদ্ঘাটিত হওয়ার পরেই বোঝা যাবে তার সম্পৃক্ততা কতটুকু ছিল। এবং সেই ইনভলভমেন্ট যদি সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেই হয়ে থাকে, তাহলে তাকে অবশ্যই সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করবে সরকার। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, তারেক রহমান অবশ্যই তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিচার করবেন। এবং সেই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে যারাই জড়িত ছিল, এখনো যারা বেঁচে আছে, তাদের সবাইকেই আইনের আওতায় আনতে হবে। আর বিশেষ করে আমি মনে করি, জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি একটি দেশ জড়িত। ওই দেশটির চক্রান্ত ছাড়া এ দেশে কোনো কিছু ঘটে না, বিপদ ঘটে না। প্রতিটি অঘটনের পেছনে তারা দায়ী এবং তাদের সংশ্লিষ্টতাও প্রমাণ করতে হবে এবং উদ্ঘাটন করতে হবে; যাতে এ থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারি। আমাদের দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এখনো কেন তারা মেনে নেয়নি-এ জিনিসগুলো বের হয়ে আসবে।
আমি মনে করি, মেজর মোজাফফরের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে আরেকটি নতুন দিগন্তের উন্মোচন হবে; যেটাকে একটা শিক্ষণীয় হিসাবে গ্রহণ করে বাংলাদেশের মানুষ আবার একটা নতুন ধারায় অর্থাৎ দেশের মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি, সাম্য, মৈত্রী তৈরি করে আমরা একটা শক্তিশালী দেশ গড়ে তুলব-এ আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক : সামরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক; চেয়ারম্যান, রাওয়া ক্লাব
