Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

অন্যমত

বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, শিক্ষার মান বাড়ছে কি?

Advertisement

Icon

আবু আহমেদ

প্রকাশ: ২২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্ববিদ্যালয় বাড়ছে, শিক্ষার মান বাড়ছে কি?

Advertisement

একটি জাতি অজ্ঞ বা অর্ধশিক্ষিত থাকলে সেই জাতি কখনোই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। কারণ শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। দেশে শিক্ষার মান বাড়ছে না, বরং ক্রমেই কমছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকেই মানসম্মত ছাত্রছাত্রী বের হওয়ার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে তা হচ্ছে না। দেশে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে। এর মধ্যে কিছু ভালো করছে। তবে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার প্রয়োজন হয় না, টাকা থাকলেই হয়। টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট কেনা যায়। এমনকি এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, আমাদের লেখাপড়ার সিস্টেমটা এমন হয়ে গেছে যে, টাকা খরচ করলে যে কোনো সার্টিফিকেট পাওয়া সম্ভব। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আমাদের সময় তো শিক্ষাব্যবস্থা এমন ছিল না। আমাদের পড়াশোনা করে, দিন-রাত লেখাপড়ার পেছনে শ্রম দিয়ে তবেই সার্টিফিকেট অর্জন করতে হতো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছি। যতদিন সিলেকশন বোর্ডে ছিলাম, ততদিন কখনো আপস করিনি। ছাত্রছাত্রী সিলেকশনের জন্য আমি প্রথমেই দেখতাম ছেলেটা কোথা থেকে পাশ করেছে, কোন ইনস্টিটিউশন বা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অথবা কোন কলেজ থেকে এসেছে, বিদেশে হলে বিদেশের কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসেছে। সে লেখাপড়ায় ফুলটাইম ছিল, নাকি পার্টটাইম ছিল, নাকি দূরশিক্ষা নিয়েছিল-আমি এসব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম। এসব দেখার পর যোগ্য মনে হলে তবেই আমি তাকে সিলেক্ট করতাম। জানি না এখন এগুলো দেখা হয় কিনা। কারণ, একজন ছাত্র বা ছাত্রী কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করে এসেছে, এটা অবশ্যই দেখা উচিত। কেননা একজন হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ছাত্রের মেধার সঙ্গে সাধারণ কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের মেধার তুলনা করা চলে না। কারণ হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির লেখাপড়ার মান অন্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের সমান হবে না কখনোই। ওইসব বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে সবসময় উপরে।

এক সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হতো, এটা ঠিক আছে। কিন্তু এ অক্সফোর্ডের খেতাবটা একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্তই ছিল। সময়ের আবর্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ খেতাব মুছে গেছে। যখন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দলীয়করণ ঢুকেছে, তখন থেকেই তার জৌলুস হারানো শুরু হয়েছে। শিক্ষার মান কমতে শুরু করেছে। এখন তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয়ভাবে শিক্ষক নিয়োগ হয়। মেরিটে ৫০ নম্বরে যিনি অবস্থান করছেন, তাকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। ১ থেকে ৫ মেধাতালিকায় থাকা শিক্ষকরা নিয়োগ থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছেন। সুতরাং ৫০ নম্বর মেরিটে থাকা শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষার্থীরা কী পাবে, তা বলাই বাহুল্য। তারপর, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নানা ধরনের বিভাগ চালু করা হয়েছে, যেগুলোর দরকার নেই। একটা বিভাগের অধীনে তিনটি বিষয়ের সংস্থান করা যায়। কিন্তু সেটা করা হয়নি। প্রতিটিকে আলাদা আলাদাভাবে রাখা হয়েছে। যেমন-নাট্যকলা, সংগীত, নৃত্যকলা সবই আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। যাদের সেখানে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের কোনো ফর্মাল ডিগ্রি নেই। এই হলো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। এ শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে কতদূর এগিয়ে নিতে পারবে জানি না।

আরেকটি দুর্ভাগ্যের বিষয় এখানে উল্লেখ করছি। সেটা হলো, অনেকে বিদেশের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যেমন-কেমব্রিজ, হার্ভার্ড, অক্সফোর্ড বা কলোম্বিয়ার মতো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়ে এসে দেশে কোণঠাসা হয়ে বসে থাকেন। কারণ তাদের তেমন কোনো সুযোগ দেওয়া হয় না। ফলে একটা সময় বিরক্ত হয়ে এ মেধাবীরা আবার বিদেশে চলে যান। বলতে গেলে, মেধা পাচার হয়ে যায়। আসলে একাডেমিক অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি। এ ব্যর্থতার কারণে আমরা তাদের ধরে রাখতে পারিনি। কতটা দুর্ভাগা জাতি আমরা!

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে দু-চারটি অবশ্য ভালো করছে। তাদের সাধুবাদ জানাই। তবে আমি জানি না এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অবস্থাটা কী। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকা দরকার। ভালো বরাদ্দ পেলে ভালো গবেষণা হবে। শিক্ষার মান বাড়বে। তবে দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভালোমানের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যিকীকরণ চালু হয়ে গেছে। এর কারণ, এসব বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ডে বাণিজ্যিকীকরণের জন্য কিছু লোক বসে আছে। টাকা-পয়সা বিভিন্ন কায়দায় নেওয়ার ব্যবস্থা করছে। অথচ এগুলোর আইনে আছে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসাবে। অর্থাৎ এসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যে আয় হবে, তা নেওয়া যাবে না। এ আয়কে বিশ্ববিদ্যালয়ের মান বাড়ানোর জন্য, গবেষণার জন্য, সম্প্রসারণের জন্য আবার খাটাতে হবে। এসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা নামধারী কিছু লোক, যারা ট্রাস্টি বোর্ডে আছেন, তারা যদি এটাকে বিভিন্ন কায়দায় বাণিজ্য হিসাবে দেখেন, তাহলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়কে ডায়াগনোসিস সেন্টারের মতো বাণিজ্যিকীকরণ করা যাবে না। আসলে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাণিজ্যিকীকরণ করা উচিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় সবসময় থাকবে স্বাধীন-যেখানে গবেষণা হবে, মানসম্মত শিক্ষা দেওয়া হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করার যোগ্যতা সৃষ্টি করতে হবে।

আরেকটি বিষয় হলো, ইংরেজি শিক্ষার বিষয়টি আমাদের কাছ থেকে প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। কিছু ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া ইংরেজির চর্চা হয় না বললেই চলে। অথচ ইংরেজির গুরুত্ব বহুবিধ। বিদেশে উচ্চশিক্ষা বলি, ইন্টারনেট ব্রাউজিং বলি, আমদানি-রপ্তানি বলি-সোজা কথায় বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হলে ইংরেজির বিকল্প নেই। আমি মনে করি, উপরের পর্যায়ে সব বিষয় ইংরেজি মাধ্যমে হওয়া উচিত। কারণ গ্লোবাল ল্যাংগুয়েজ হচ্ছে ইংরেজি। আমরা বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থেকে ভালো কিছু করব, এমন আশা করা দুরাশা মাত্র। বেসিক শিক্ষা-ইংরেজি ভাষা, গণিত, তথ্যপ্রযুক্তি আর হয়তো সাধারণ বিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-এগুলো ছাড়া বাদবাকি যত বিদ্যাই হোক না কেন, সেগুলো খুব একটা বিবেচনায় নেওয়া হবে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এত এত বিভাগ অথচ এর বেশির ভাগই আর্টস বা কলা। বাস্তব জীবনে আর্টস বা কলার খুব একটা প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। যেসব বিষয়ের বাজারে চাহিদা নেই, সেসব বিষয় খুলে বসে রয়েছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। যেসব বিষয়ে দেশ-বিদেশে চাহিদা রয়েছে, কর্মসংস্থানের জায়গা রয়েছে, সেসব বিষয়ের ওপর আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। যদি শিক্ষাকে আমরা কাজেই লাগাতে না পারি, তাহলে জনগণের টাকা ব্যয় করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়িয়ে তো কোনো লাভ নেই। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে শিক্ষার মান নিশ্চিত না করে, যোগ্য শিক্ষকের প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করে। তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান তৈরি করে লাভটা কী হবে? যেমন, আমি দেখলাম নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো হচ্ছে অর্থনীতি।

যা হোক, সরকারের কাছে একটা অনুরোধ রাখব, উচ্চতর পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীদের স্কলারশিপের মাধ্যমে বিদেশের ভালো ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য। পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা অর্জন করেই তারা যাবে। আইএলটিএসের মতো যা যা দরকার হবে, সবই কমপ্লিট করে, প্রতিযোগিতামূলক যোগ্যতার ভিত্তিতে কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ হাজার ছাত্রছাত্রীকে প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় টাকায় বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। কারণ স্কলারশিপ না পেলে অনেক মেধাবী গরিব শিক্ষার্থী বিদেশে পড়তে যেতে পারবে না। সরকারের এ কর্মসূচিতে খুব বেশি খরচ হবে না। দুর্নীতির মাধ্যমে দেশে যত চুরি হয়েছে, অর্থের অপচয় হচ্ছে, তার একটা ভগ্নাংশই যাবে মাত্র। এভাবে ১০-১৫ হাজার ছাত্রছাত্রীকে প্রমোট করতে হবে উচ্চশিক্ষার জন্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, প্রোগ্রামিং, এআই’র মতো আধুনিক সব বিষয় এ প্রোগ্রামের আওতায় রাখতে হবে। এক থেকে দুই আড়াই বছরের কোর্স শেষ করে আসা এসব শিক্ষার্থীকে আমাদের দেশে কাজে লাগাতে হবে। দেশের সব পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিতে হবে। লক্ষ রাখতে হবে, এসব মেধাবী যাতে দেশে সুযোগ না পেয়ে আবার বিদেশে চলে না যায়। এ মেধাগুলোকে ধরে রাখতে হবে। আশা করি, এতে করে আমাদের দেশের শিক্ষার মান বাড়বে। তলানিতে পড়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাণ ফিরে আসবে। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো একটা সম্মানজনক অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে।

আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ; চেয়ারম্যান, আইসিবি

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম