Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

পকেটে একটি টিস্যু ও নাগরিক সচেতনতার নবতর পাঠ

Advertisement

Icon

মোহাম্মদ মামুন শিবলী

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

পকেটে একটি টিস্যু ও নাগরিক সচেতনতার নবতর পাঠ

সংগৃহীত

Advertisement

একটি জাতির অভ্যাসগত বৈশিষ্ট্য অনেক সময় বড় বড় দৃশ্যকল্পে চিত্রিত হয় না, বরং দৃশ্যমান হয় জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক জীবনের ছোট ছোট কর্মকাণ্ডে। আমরা উন্নয়নকে সাধারণত উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা আধুনিক নগরীর আলোয় মাপি। কিন্তু উন্নত সমাজের আরেকটি অদৃশ্য অবকাঠামো আছে, যার নাম নাগরিক শৃঙ্খলা। সেই শৃঙ্খলার শুরু হয় খুব সাধারণ কিছু কাজ দিয়ে। যেমন, রাস্তার ওপর প্লাস্টিক না ফেলা, নিজের আবর্জনা নিজে বহন করা, কিংবা একটি ব্যবহৃত টিস্যু ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রেখে দেওয়া।

সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরিশাল সফরের মাঝে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, তার প্যান্টের পকেটে হাত দিলেই ব্যবহৃত টিস্যু পাওয়া যাবে। কারণ তিনি টিস্যু ব্যবহার করে যেখানে-সেখানে ফেলেন না, ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত নিজের কাছেই রাখেন। বক্তব্যটি শুনে কেউ হয়তো এটিকে নিছক ব্যক্তিগত অভ্যাস হিসাবে দেখেছেন। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, এটি শুধু একজন ব্যক্তির অভ্যাস নয়, এটি একটি নাগরিক দর্শন।

আমাদের সমাজে পরিচ্ছন্নতার ধারণাটি এখনো অনেকাংশে দায়িত্ব হস্তান্তরের সংস্কৃতির মধ্যে আটকে আছে। আমরা ঘর পরিষ্কার রাখি, কিন্তু ঘরের আবর্জনা রাস্তায় ফেলতে সংকোচ বোধ করি না। দোকানের সামনে চায়ের কাপ রেখে চলে আসি। গাড়ির জানালা দিয়ে পানির বোতল কিংবা চিপসের প্যাকেট ছুড়ে ফেলি। মনে করি, এগুলো পরিষ্কার করা অন্য কারও দায়িত্ব। অথচ সভ্য সমাজে পরিচ্ছন্নতা শুরু হয় এই উপলব্ধি থেকে যে, জনপথও আমার ঘরেরই সম্প্রসারিত অংশ।

অনেক উন্নত দেশের নাগরিকদের দেখলে একটি বিষয় খুব স্পষ্ট হয় : সেখানে আইন আছে, জরিমানাও আছে, কিন্তু এর চেয়েও বড় বিষয় হলো সামাজিক অভ্যাস। জাপানে মানুষ নিজের আবর্জনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাগে করে বহন করে, কারণ আশপাশে ডাস্টবিন নাও থাকতে পারে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শেষে জাপানি সমর্থকদের গ্যালারি পরিষ্কার করার দৃশ্য এখন বিশ্বজুড়ে নাগরিক দায়িত্ববোধের প্রতীক। সিঙ্গাপুরে পরিচ্ছন্নতা শুধু সরকারের কর্মসূচি নয়, এটি মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। ইউরোপের বহু শহরে পার্কে বসে খাবার খাওয়ার পর নিজের আবর্জনা নিজেই নির্দিষ্ট বিনে ফেলে আসা এতটাই স্বাভাবিক যে সেটি নিয়ে আলাদা করে কেউ প্রশংসাও করে না।

আমরা প্রায়ই প্রশ্ন করি, তারা কেন উন্নত? উত্তরটি অনেক সময় অর্থনীতির চেয়ে অভ্যাসে লুকিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের নগরজীবনের একটি বড় সংকট বর্ষাকালের জলাবদ্ধতা। বৃষ্টি হলেই শহরের অনেক এলাকায় হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি জমে যায়। আমরা তখন স্বাভাবিকভাবেই ড্রেনের নকশা, সিটি করপোরেশন কিংবা উন্নয়ন সংস্থার ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা করি। এসব প্রশ্ন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আরেকটি প্রশ্নও করা দরকার। ড্রেনে জমে থাকা পলিথিন, প্লাস্টিক, বোতল, খাবারের মোড়ক কিংবা টিস্যুগুলো সেখানে এলো কীভাবে?

প্রকৌশলীরা বহু বছর ধরেই বলে আসছেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার সক্ষমতা যতই বাড়ানো হোক, যদি কঠিন বর্জ্য নির্বিচারে নালায় ফেলা হয়, তাহলে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হবেই। ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসাবে ড্রেন ও খালের মুখ প্লাস্টিক বর্জ্যে আটকে যাওয়ার বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। নগর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন গবেষণায়ও বলা হয়েছে, কঠিন বর্জ্য সঠিকভাবে সংগ্রহ না হওয়া এবং যত্রতত্র ফেলার কারণে ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রত্যক্ষ ফল জলাবদ্ধতা।

ভাবুন, একটি পলিথিন হয়তো খুব ছোট। একটি প্লাস্টিকের বোতলও তেমন বড় নয়। একটি ব্যবহৃত টিস্যুও তুচ্ছ। কিন্তু কোটি মানুষের শহরে প্রতিদিন যদি লাখ লাখ মানুষ এই তুচ্ছ জিনিসগুলো রাস্তায় ফেলে, তাহলে সেই ছোট ভুলগুলোই একসময় বড় দুর্যোগে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। একইসঙ্গে বেড়েছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের পরিমাণ। পরিবেশবিদরা বহুদিন ধরেই সতর্ক করছেন, এসব প্লাস্টিকের বড় অংশ সঠিকভাবে সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সেগুলো নালা, খাল, নদী এবং শেষ পর্যন্ত সাগরে গিয়ে জমা হচ্ছে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই নয়, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জনস্বাস্থ্য এবং নগর ব্যবস্থাপনাতেও পড়ছে।

একটি শহর পরিষ্কার রাখতে শুধু পরিচ্ছন্নতাকর্মীর সংখ্যা বাড়ালেই হবে না। প্রয়োজন মানুষের আচরণে পরিবর্তন। কারণ পরিচ্ছন্নতাকর্মী আবর্জনা পরিষ্কার করতে পারেন, কিন্তু মানুষ যদি প্রতিনিয়ত নতুন আবর্জনা তৈরি করে ভুল জায়গায় ফেলতেই থাকে, তাহলে সেই লড়াই কখনো শেষ হবে না।

এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ও রয়েছে। আমরা সাধারণত এমন আচরণই অনুসরণ করি, যা সমাজে স্বীকৃত বা সম্মানজনক বলে মনে হয়। যখন কোনো শিক্ষক, শিল্পী, ক্রীড়াবিদ বা রাষ্ট্রনেতা নিজের আচরণের মাধ্যমে একটি ভালো অভ্যাসের উদাহরণ তৈরি করেন, তখন সেটি মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ওই বক্তব্যের গুরুত্ব শুধু একটি টিস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। এটি একটি বার্তা যে, নাগরিক দায়িত্ব শুরু হয় নিজের হাত থেকেই।

এই অভ্যাসটি যদি বিদ্যালয়ে শেখানো হয়? যদি শিশুদের বলা হয়, ডাস্টবিন না পাওয়া পর্যন্ত আবর্জনা নিজের ব্যাগে রাখবে? যদি পরিবারে বাবা-মা নিজেরাই সেই উদাহরণ তৈরি করেন? যদি অফিসে সহকর্মীরা রাস্তায় কিছু না ফেলার ব্যাপারে একে অন্যকে উৎসাহ দেন? তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই একটি নতুন সামাজিক সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।

আমরা অনেক সময় দেশপ্রেমকে বড় বড় স্লোগানে খুঁজি। অথচ প্রকৃত দেশপ্রেম অনেক সময় প্রকাশ পায় এমন কাজের মধ্যেই, যা কেউ দেখে না। ভোরবেলায় হাঁটতে গিয়ে একটি প্লাস্টিক কুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলা, নদীতে ময়লা না ফেলা, কিংবা ব্যবহৃত টিস্যু নিজের পকেটে রেখে বাড়ি ফিরে ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া-এগুলো ছোট কাজ, কিন্তু এগুলোর সম্মিলিত শক্তি অসাধারণ।

বাংলাদেশ একসময় খুব সাহসী একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পলিথিন ব্যাগ নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিশ্বের পথিকৃৎ দেশগুলোর একটি ছিল বাংলাদেশ। সেই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল পরিবেশ রক্ষার চিন্তা এবং জলাবদ্ধতা কমানোর বাস্তব প্রয়োজন। কিন্তু আইন একা কখনো সফল হতে পারে না, যদি মানুষের অভ্যাস না বদলায়।

আজ আমাদের সামনে নতুন এক সুযোগ এসেছে। উন্নয়নকে শুধু অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আচরণগত উন্নয়নের আন্দোলনে রূপ দেওয়ার সুযোগ। প্রত্যেক নাগরিক যদি প্রতিদিন মাত্র একটি কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন, আমি আমার কোনো আবর্জনা রাস্তায় ফেলব না, তাহলে কয়েক মাসের মধ্যেই শহরের চেহারায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসতে পারে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব অবশ্যই রয়েছে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন বসাতে হবে। বর্জ্য সংগ্রহ আরও কার্যকর করতে হবে। প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারযোগ্য শিল্পকে উৎসাহ দিতে হবে। ড্রেন ও খাল নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। আইনও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কিন্তু এসব উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন নাগরিকের নীরব অংশগ্রহণ।

হয়তো আগামীকাল আপনি একটি টিস্যু ব্যবহার করবেন। আশপাশে কোনো ডাস্টবিন থাকবে না। তখন সেটি রাস্তায় ফেলে দেওয়ার বদলে নিজের পকেটে রেখে দেবেন। বাড়ি ফিরে ডাস্টবিনে ফেলবেন। কাজটি করতে সময় লাগবে কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু সেই কয়েক সেকেন্ডই হয়তো আমাদের নাগরিক চেতনার নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

নিছক সামান্য মনে পারে এই ছোট্ট অভ্যাসটিতে। অথচ সেটি হতে পারে একটি শহরকে জলাবদ্ধতা থেকে রক্ষার ক্ষুদ্রতম অবদান। সেটি হতে পারে একটি শিশুর শেখা প্রথম নাগরিক শিক্ষা। আর সেটিই হতে পারে এমন একটি অভ্যাস, যার মাধ্যমে আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শুধু পরিচ্ছন্ন বাংলাদেশ নয়, আরও দায়িত্বশীল বাংলাদেশ উপহার দিতে পারি।

মোহাম্মদ মামুন শিবলী : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব-১

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম