Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

শতফুল ফুটতে দাও

যাদু মিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন ঈর্ষণীয়

Advertisement

ড. মাহবুব উল্লাহ্

ড. মাহবুব উল্লাহ্

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

যাদু মিয়ার বর্ণাঢ্য জীবন ঈর্ষণীয়

Advertisement

আজ মঙ্গলবার। প্রতি সপ্তাহে আমার লেখা যে কলাম দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়, তার পাণ্ডুলিপি মঙ্গলবারেই লেখা হয়। প্রেস ক্লাবে গিয়েছিলাম জননেতা মরহুম মশিউর রহমান যাদু মিয়ার ১০২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আলোচনা সভায় যোগ দিতে। এই স্মরণসভার আয়োজন করেছিল মশিউর রহমান যাদু মিয়ার কন্যা রিটা রহমান। বাংলাদেশোত্তর কালে অনেক বরেণ্য ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। এর আগে পাকিস্তান আমলেও এবং ব্রিটিশ আমলে আমরা অনেক জ্ঞানী-গুণী সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিকে হারিয়েছি। দেশ ও সমাজ গঠনে এদের ভূমিকা ছিল অনন্য। কিন্তু আমরা ক’জনের কথা মনে রেখেছি? ক’জনের জন্ম ও মৃত্যুদিবস পালন করা হয়। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারোর জন্য স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়, তার বেশির ভাগই হয় তাদের পরিবারের সদস্যদের উদ্যোগে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এদের স্মরণ করার এবং এদের অবদানকে জনগণের কাছে তুলে ধরার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। সে ধরনের কিছু আয়োজন করা যায় জাতীয় জাদুঘর কিংবা জাতীয় আর্কাইভের ব্যবস্থাপনায়। বর্তমানে প্রযুক্তির ঘাটতি নেই। এসব মহান ব্যক্তির জীবন ও কর্মের ওপর প্রামাণ্য ডকুমেন্টারি তৈরি করে এদের স্মৃতি রক্ষা করা যায়। নতুন প্রজন্ম যদি না জানে তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কারা মানবজাতির হীতকল্পে অবদান রেখেছেন, তাহলে তারা কীভাবে মহৎ কিছু অর্জনের জন্য অনুপ্রাণিত হবে। আশা করি বর্তমান সরকার এ ঘাটতি পূরণের জন্য যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। কোনো কোনো দৈনিক পত্রিকা অবশ্য পরলোকগত স্মরণীয়-বরণীয় ব্যক্তিদের নিয়ে তাদের জীবন পরিচিতি প্রকাশ করে। এ উদ্যোগ প্রশংসনীয় এবং আরও ব্যাপকভাবে ও সুষ্ঠুভাবে প্রতিপালিত হলে জাতির কৃতজ্ঞতা সার্থকভাবে প্রকাশ পাবে।

এবার মশিউর রহমান যাদু মিয়ার প্রসঙ্গে আসি। ১৯২৪ সালের ৯ জুলাই রংপুর জেলার এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ওসমান গণি ও মাতা আলহাজ আবিয়ন নেছা তৎকালে সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তি ছিলেন। তার মাতা আবিয়ন নেছা একজন প্রাগ্রসর নারী ছিলেন। তিনি অল বেঙ্গল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। এটা কম কথা নয়।

ছাত্রজীবন থেকে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। ছাত্র থাকাকালীন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি নেতাজি সুভাস চন্দ্রের আহ্বানে বার্মা যান এবং সেখানে আইএনএ’র সঙ্গে সহযোগিতা করেন। ১৯৪৩-এ দুর্ভিক্ষের সময় রংপুরের চরাঞ্চলে প্লেগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। তিনি মারাত্মক সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেন। মশিউর রহমান যাদু মিয়ার জনসেবার এ দৃষ্টান্তকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ভুরুঙ্গামারিসংলগ্ন একটি চরের নাম রাখা হয় ‘যাদুর চর’।

যাদু মিয়া ছিলেন একজন অসাম্প্রদায়িক মানুষ। তিনি ১৯৪৬-এর ভয়াবহ হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার সময় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে দাঙ্গার মর্মান্তিক ছবি ও মানবিক দিকগুলো তুলে ধরে যাদু মিয়ার ওপর একটি বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেন। বুলেটিনে প্রকাশিত লাশের ছবি উত্তেজনায় উসকানি দিচ্ছে অভিযোগ এনে ব্রিটিশ সরকার তাকে গ্রেফতার করে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত বিচার সভায় যাদু মিয়া নিজেই আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। তার ক্ষুরধার যুক্তির মুখে তাকে সসম্মানে মুক্তি দেওয়া হয়। এবং একটি স্পেশাল স্কোয়াড তাকে তার নিজ বাড়ি নীলফামারীর খগা খড়িবাড়িতে পৌঁছে দেয়।

যাদু মিয়া ছিলেন ইয়াং ম্যান অ্যাসোসিয়েশন অব পাকিস্তানের ইস্ট পাকিস্তান শাখার প্রধান, রংপুর ডিস্ট্রিক্ট স্পোর্টস অ্যাসোসিয়েশনের অনারারি সেক্রেটারি এবং তিনি ১৯৫৪-৫৮ পর্বে রংপুর ডিস্ট্রিক্ট কনজুমার্স কোঅপারেটিভ সোসাইটির নির্বাচিত অনারারি সেক্রেটারি এবং পরবর্তী সময়ে এর নির্বাচিত সভাপতি। ৫০-এর দশকের প্রথমার্ধে তিনি রংপুর জেলা বোর্ডের নির্বাচিত কনিষ্ঠতম চেয়ারম্যান ছিলেন এবং তিনি এই পদে ২ মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির ফ্রন্ট সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান যুব উৎসবের প্রস্তুতি কমিটির চেয়ারম্যান হন। সেই সময় যুব উৎসবটি যাতে না হতে পারে, সেজন্য অনেক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। তারই বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ফলে যুব উৎসবটি সফল হয়।

১৯৫৭ সালে তিনি মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগ দেন এবং একই বছর ঐতিহাসিক কাগমারি সম্মেলন সফল করার জন্য সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধী দল গঠন করেন এবং এর উপনেতা হিসাবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পাকিস্তান ন্যাশনাল এসেম্বলিতে তিনি শোষিত-বঞ্চিত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের স্বার্থে বুলন্দ আওয়াজ তুলেছিলেন। তার এ ভূমিকা ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টিতে বিরাট ভূমিকা রাখে।

এখন আমি আমার স্মৃতি থেকে যাদু মিয়া সম্পর্কে কিছু কথা বলব। ১৯৭০-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলার কর্মসূচি উত্থাপনের কারণে সামরিক আদালত আমাকে সশ্রম কারাদণ্ড ও ১৫ বেত্রদণ্ডে দণ্ডিত করে। ওই সময় আরও একটি মামলার কারণে আমাকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেল থেকে বিশেষ পুলিশ এসকোর্টে আদালতে নেওয়া হতো। আদালতে আমার সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃস্থানীয় কর্মী সৈয়দ রুহুল আমিনের নেতৃত্বে কর্মীরা আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য আসত। একই বছর জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনের পরে মামলাটির তারিখ পড়েছিল। ওই দিন যাদু মিয়া সৈয়দ রুহুল আমিনের মাধ্যমে আমাকে একটি গোপন সংবাদ পাঠান। এই গোপন সংবাদে যাদু ভাই জানিয়েছিলেন, পাকিস্তান আর্মি আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না। তিনি এ ব্যাপারে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আমার কাছ থেকে জানতে চেয়েছিলেন। আমার পরামর্শ ছিল স্বাধীনতাকামী সব রাজনৈতিক শক্তির সমন্বয়ে একটি জাতীয় মুক্তিফ্রন্ট গঠন। ১৯৭১-এর মার্চে সামরিক বাহিনী ক্র্যাকডাইন করার পর যাদু ভাই ভারতে চলে যান এবং কলকাতায় অবস্থান করে ভারতের মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে এবং এর নেতা কমরেড জ্যোতি বসুর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। তিনি আওয়ামী লীগসহ অন্যদের সঙ্গে সমন্বিতভাবে মুক্তিযুদ্ধ গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালান। তার এ প্রচেষ্টাকে তৎকালীন ভারতীয় শাসক দল কংগ্রেস গভীর সন্দেহের চোখে দেখে এবং তাকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে। তিনি শিলিগুড়ি হয়ে দেশে ফিরে আসেন।

শিলিগুড়িতেও তার প্রাণনাশের চেষ্টা করা হয়। অল্পের জন্য তিনি বেঁচে যান। পূর্ব পাকিস্তানে ফেরত আসার পর তাকে পাক আর্মি গ্রেফতার করে নির্যাতন চালায়। অবশ্য তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর তার পক্ষে সক্রিয়ভাবে কিছু করা সম্ভব হয়নি। তবে ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগের ৮৮ জন পাকিস্তন ন্যাশনাল এসেম্বলির সদস্যের নির্বাচন বাতিল করলে একটি উপনির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সে সময় যাদু মিয়ার নেতৃত্বে ন্যাপের একটি সভা হয় এবং সে সভায় সিদ্ধান্ত হয় ন্যাপ তথাকথিত উপনির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে না। যাদু ভাইয়ের বিরুদ্ধে ভারতপন্থিরা প্রচারণা চালায় যে তিনি পাকিস্তান আর্মির একজন কোলাবোরেটর ছিলেন। এ অপপ্রচারের মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী এবং একইসঙ্গে আধিপত্যবাদ বিরোধীদের রাজনীতিকে কালিমালিপ্ত করা। দুর্জনের ছলের শেষ নেই। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জানুয়ারি মাসে যাদু ভাই শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার ৩২ নম্বর ধানমণ্ডির বাসায় সাক্ষাৎ করেন। শেখ মুজিবুর রহমান ও যাদু মিয়া ছিলেন কলকাতায় ছাত্রজীবনের বন্ধু। শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ঢাকায় থাকার পরামর্শ দেন এবং রংপুরে যেতে নিষেধ করেন। যে মানুষটির রাজনীতিতে উত্থান রংপুর থেকে, যে রংপুরের সঙ্গে তার নাড়ির যোগাযোগ, সেই রংপুরে তিনি না গিয়ে কীভাবে থাকতে পারেন। তিনি রংপুরে গেলেন এবং সেখানে কাজী জাফর আহমদের অনুসারী আশরাফ হোসেনের প্ররোচনায় সংঘটিত বিক্ষোভের সম্মুখীন হন এবং বিক্ষোভকারীরা তাকে পাকিস্তানের দালাল আখ্যা দেয়। তিনি দালাল আইনে গ্রেফতার হন এবং দীর্ঘদিন কারারুদ্ধ থাকেন। অবশেষে হাইকোর্টের রায়ে তিনি বেকসুর খালাস পান। হাইকোর্ট এ রায় দিয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ শাসন করছিল।

আমার স্মৃতির ঝুলিতে যাদু ভাই সম্পর্কে অনেক স্মৃতি জমে আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে তার চীন সফর, আব্দুল মতিনদের পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী আত্রাইতে সশস্ত্র সংঘাতের পূর্বাভাস দেওয়া, তার মগবাজারের বাসায় পাকিস্তান কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান এস বি আওয়ান ও পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল) নেতাদের কাকতালীয়ভাবে একই দিনে একই সময়ে উপস্থিত হওয়া এবং এ থেকে পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে সৃষ্ট বাক পরিবর্তন এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল সৃষ্টির প্রস্তুতি পর্বের কাহিনি। এসব নিয়ে লেখা উচিত, তবে লেখাটি দীর্ঘ হয়ে যাবে বলে এ যাত্রা ওইসব বিষয়ে লেখা সম্ভব হলো না।

মশিউর রহমান যাদু মিয়া ছিলেন একজন পারফেক্ট বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক জাতীয় নেতা। তিনি দীর্ঘায়ু হননি। কিন্তু স্বল্পদীর্ঘ জীবনে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছেন এবং তিনি যা অর্জন করেছেন, তা সত্যই ঈর্ষণীয়। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুন।

২২-০৭-২৬

ড. মাহবুব উল্লাহ : শিক্ষাবিদ ও অর্থনীতিবিদ

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম