Logo
Logo
×
   

উপসম্পাদকীয়

জুলাই দিনের স্মৃতি : ভূত না ভবিষ্যত?

Icon

সলিমুল্লাহ খান

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

জুলাই দিনের স্মৃতি : ভূত না ভবিষ্যত?

সলিমুল্লাহ খান। ফাইল ছবি

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব যে সকল বিদেশি সরেজমিন দেখিয়াছিলেন, তাঁহাদের একজন মার্কিন সাংবাদিক জন রীড। ১৯১৯ সালের মার্চ নাগাদ প্রকাশিত তাঁহার ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’ এখনও দুনিয়ার সবদেশেই পঠিত হয়। তিনি ১৯১৪ সালে মেহিকো (বা মেক্সিকো) বিপ্লবের ভাষ্য ‘ইনসার্জেন্ট মেক্সিকো’ নামক আরেকটা কেতাবে প্রকাশ করিয়াছিলেন।

মেহিকোর বিপ্লব শুরু হইয়াছিল ১৯১০ সালে, সেদেশের একনায়ক পরফিরিও দিয়াসের দীর্ঘ দুঃশাসনের বিরুদ্ধে। এই বিপ্লবের ফলে ১৯১৭ সালের সংবিধান প্রণীত হইয়াছিল। ইতিহাস লেখকেরা ১৯২০ পর্যন্ত ঐ বিপ্লবের সীমা নির্দেশ করেন। ঐদিকে রুশ বিপ্লবের পরিণতি দাঁড়াইল সমাজের বৈপ্লবিক রূপান্তরে। সেই বিপ্লব শেষ হইয়াও মনে হয় শেষ হয় নাই।

২০২৪ সালে বাংলাদেশে যে ঘটনা ঘটিয়াছে, তাহা এখনও পুরোপুরি ভূত হয় নাই। তবে ইহার ভবিষ্যত লইয়া গুজব শুরু হইয়াছে। গত শতাব্দীর দুই গণবিপ্লবের-একটা মধ্য-আমেরিকার (১৯১০-১৯২০), আরটা পূর্ব-এয়ুরোপের (১৯১৭-১৯৯১)-কোনটার সঙ্গেই দক্ষিণ এশিয়া মহাদেশের (২০২৪-২০২৬) তুলনীয় হয় নাই। তবু আমার কেন জানি মনে হইতেছে, অন্তত একটা কারণে দুইটি বইয়ের-‘বিদ্রোহী মেহিকো’ আর ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’-বিষয়বস্তুর মধ্যে একটা তুলনা করা চলে।

মার্কিন দেশের নিকটতম পড়শী মেহিকোর পরিণতি সমাজগঠনের সংস্কার আর মানুষের হাতে মানুষ শোষণের জারি থাকার মধ্যে। একটু দূরের দেশ রুশিয়ার বিপ্লবের ফসল একটু অন্যরকম, তাহার স্বাদ আরো লবণাক্ত। সমাজগঠনে আদ্যোপান্ত রূপান্তরের খানিক নোনা বটে।

ইতালির মহান দার্শনিক ও রাজনেতা আন্তনিও গ্রামসি বলিতেন, সচরাচর দুনিয়ার দেশে-মহাদেশে দেখা যায় একেক যুগের একেকটা এথিকস বা নৈতিক আদর্শ। এই আদর্শ শুদ্ধমাত্র বেশির ভাগ মানুষের পক্ষে যাহা হওয়া সম্ভব, সেই সম্ভাবনার সীমার মধ্যেই অসীমের হাতছানি, সমাজ-গঠন পরিবর্তনের জন্য সংগঠিত সংগ্রাম। সন্দেহ নাই এই সংগ্রাম একেক দেশে, একেক যুগে, একেক রূপে সংগঠিত হয়।

মনুষ্য-সমাজের ইতিহাস যতটুকু জানা সম্ভব, তাহার আলোকে দেখি, আজ পর্যন্ত সমাজ পরিবর্তনের যত সংগ্রাম সংগঠিত হইয়াছে, তাহা কমসেকম দুই ধরনের : এক, বিদ্যমান ব্যবস্থার সংস্কার বা ভুলত্রুটি সংশোধনের দাবিতে; আর সমাজ-গঠন আদ্যোপান্ত রূপান্তরের আদর্শে। প্রথম যদি ‘রূপচর্চাকর’ বা ‘রি-ফর্মেটিব’ হইয়া থাকে, দ্বিতীয়ের নাম রাখিতে হয় ‘রূপান্তরকামী’ বা ‘ট্রান্স-ফর্মেটিব’। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের ঝোঁকটা দুই কিসিমের কোনটার দিকে তাহা না বলিলেও চলে।

প্রশ্নের বিষয় : এই পর্যন্ত যাহা ইতিহাস হইল, তাহার ভবিষ্যত কি? ভবিষ্যতের ইতিহাস লেখা যায় না। সেই ইতিহাস সৃষ্টি করিতেও হয়। মনে হইতেছে হয়তো আরেকটা বিশেষণ ছাড়া ‘জাতীয় রাষ্ট্র’ কথাটা আর বেশিদিন ফলাও করিয়া বলা যাইবে না। জাতির মধ্যে পুঁজি সশব্দে হাজির। আর বাংলাদেশের মতন দেশে এই পুঁজি যত জাতীয়, তত আন্তর্জাতিক। ফলে আমাদের সমস্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটেও জাতীয় রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শাসন বদলাইবার নহে।

সংস্কার আর সংস্কার ছিল জুলাই দিনের একটা অবিচল দাবি। সংস্কারপন্থী আন্দোলনের একটা গুপ্ত কথা তাহা বিদ্যমান গঠন বা ব্যবস্থার মধ্যে থাকিয়া শাসকশ্রেণীর আদর্শ বজায় রাখিয়া খুচরো পরিবর্তন প্রার্থনা করে আর শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান অবস্থা বা স্ট্যাটাস কো-র সহযোগী শক্তি, আনসার বা রাজাকার, উপাধি গ্রহণ করে। এই ধরনের আন্দোলন বলুন আর গণ-অভ্যুত্থানই বলুন, অনেক সময় সাধারণ্যে ‘প্রগতিশীল’ বলিয়া গৌরবযুক্তও হয় কিন্তু ইহারা পরিণামে স্বাধীনতা ব্যবসায়ে বা কথিত উদারনৈতিক সংস্কারে থামে। এই প্রগতিশীল সংস্কারের দৌঁড় কখনোই শ্রেণীভেদ, সামাজিক বৈষম্য, বা শোষণের অবসান পর্যন্ত নয়।

অন্যদিকে যেসব আন্দোলন ট্রান্স-ফর্মেটিব বা আদ্যোপান্ত রূপান্তরমুখী, সেগুলিকে একটা নৈতিক আদর্শ বা মাপকাঠি দিয়া চেনা যায়। এই নৈতিক আদর্শের ডাকনাম ‘অন্যায় আর অবিচার প্রতিরোধ’। এই আদর্শ জাতির অন্দরমহল হইতে উদ্ভূত আর ইহাদের লক্ষ্য উদারনৈতিক বা স্বাধীনতা ব্যবসায়ী সংস্কারের সীমানায় সীমিত থাকে না। এই আন্দোলন জাতির মর্মমূল হইতে, নীতিবান শিক্ষকদের সমর্থন লাভ করে। ২০২৪ সালে আন্দোলনরত নিরস্ত্র জনসাধারণের উপর সমস্ত মারাত্মক মারণাস্ত্র আঘাত হানিয়াছে কিন্তু জনসাধারণের হাতে কোন মারণাস্ত্র ছিল না।

দুই বছর পার হয় নাই। ইহার মধ্যেই ২০২৪ সালের দীর্ঘ জুলাই যে ইতিহাস গঠন করিয়াছে, তাহার অর্থ লইয়া এখনই লড়াই শুরু হইয়াছে। এই অচিন্তিতপূর্ব আত্মত্যাগের ফলে একটা ভয়াবহ অন্যায় শাসনের অবসান হইয়াছে, কিন্তু যে সমাজগঠনের কারণে এই ধরনের ঘাতক শাসন সম্ভব হইয়াছিল তাহার বিন্দুমাত্র নড়চড় হয় নাই।

একদা শুনিয়াছিলাম বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড়জোর একবছর। এতদিনে একবিংশ শতকের চার আনা গত হইল। জুলাই দিনের স্মৃতি, তার আগের ষোল এখন কিছু ম্লান হইতে শুরু করিয়াছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের আত্মভাব এখনও পুরোপুরি অবসিত হয় নাই। আর কি আছে তাহার এই ভাবের ভাগ্যে? জুলাই দিনের স্মৃতি মানে কি দাঁড়াইতেছে আজ? পুরাতন পাথরের যুগে যাঁহারা লাভবান হইয়াছিলেন, তাঁহারা আবার মাথা তুলিতেছেন আর বলিতেছেন, কই আমরা তো কাহাকেও হত্যা করি নাই, আমরা তো দেশটাকে উন্নতির চরম শিখরে নিয়া গিয়াছিলাম, একটা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করিয়াছিলাম। এই পরিস্থিতিতে জুলাই দিনের করণীয় কি? যে সমাজগঠন বা ব্যবস্থা সকল মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে আর একটা রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়া প্রতিষ্ঠিত দেশকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির রাজতন্ত্রে পরিণত করে, তাহার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ছাড়া কোন জনগণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথা কল্পনাও করা যায় কি!

একমাত্র ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণই সার্বভৌম বা রাজশক্তির দাবিদার। তাই আর্থিক শ্রেণীবৈষম্য ছাড়াও নানান কিসিমের ধর্ম আর বর্ণভেদ তৈরি করার কোন শেষ নাই এই অব্যবস্থার অভ্যন্তরে। এই মুহূর্তে আমাদের একটাই কর্তব্য। সে কর্তব্যের নাম মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো। হর্হে রাইশমান নামক একজন দক্ষিণ আমেরিকান চিন্তাবিদ বলিতেন, ‘দাঁড়াইবার কাজটা মোটেই সহজ নয়, কিন্তু হেন দাঁড়ানো কোনদিন বিফলে যায় না।’ কোন খেদ থাকে না তাহার।

জুলাই শহীদের কাফেলা আমাদের দেখাইয়াছে কিভাবে জুলুম আর অবিচারের মুখে দাঁড়াইয়া মজলুমের পক্ষে লড়াই করিতে হয়।

২৩ জুলাই ২০২৬

সলিমুল্লাহ খান : অধ্যাপক, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

(লেখকের বানান ও ভাষারীতি অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে)

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম