Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

ভারতে ভয় এবার স্থান বদলেছে

Advertisement

Icon

বিদ্যা কৃষ্ণন

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেওয়ার পর এই প্রথমবার দিল্লির রাজপথে সম্পূর্ণ নির্ভয়ে, সাক্ষী ও ক্যামেরার সামনে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারিত হলো-‘মোদিকে পদত্যাগ করতে হবে’।

ভারতের ‘জেন-জি’ এক সময়ের অকল্পনীয় কথাগুলোকে এখন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান প্রতিবাদস্থল যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বে শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। তবে চলতি সপ্তাহে আন্দোলনের দাবি এক নতুন মাত্রা পায়, যেখানে শিক্ষার্থীরা এখন প্রধানমন্ত্রী মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগও দাবি করছেন।

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দিন, অর্থাৎ সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে এক পদযাত্রার আহ্বান জানিয়েছিল সিজেপি। তবে আন্দোলনের ২১তম দিনে অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে জোরপূর্বক দিল্লির সফদারজং হাসপাতালে ভর্তি করানোই সরকারের জন্য বড় ভুল পদক্ষেপে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীদের দাবির সমর্থনে তিনি ২৮ জুন থেকে অনশনে ছিলেন। তাকে বলপূর্বক হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রতি জনসমর্থন আরও বহুগুণ বেড়ে যায়। কোনো দল বা সংগঠনের আহ্বান ছাড়াই ‘সাধারণ মানুষ’ও দলে দলে পার্লামেন্টের দিকে মিছিল করে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে।

দিল্লি পুলিশের সতর্কবার্তা, যন্তর মন্তরগামী ১৬টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ করা, রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া, ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা কিংবা সাদা পোশাকের গুন্ডা নামানো-কোনো কিছুকেই তোয়াক্কা না করে এক লাখেরও বেশি ‘ককরোচ’ সেন্ট্রাল দিল্লিতে আছড়ে পড়ে। আসতে থাকে আরও মানুষ। সেন্ট্রাল দিল্লি যেন এক বারুদকুণ্ডে পরিণত হয়। মুষলধারে বৃষ্টি, টিয়ার গ্যাস, টিয়ার শেলের ধোঁয়া এবং পেলেট গান ও লাঠিচার্জের মুখেও শিক্ষার্থীরা বীরদর্পে মাটি কামড়ে পড়ে থাকে।

পার্লামেন্ট অভিমুখে অভিযান শেষে অন্তত ২০০ জন আহত হন। পুলিশ সদস্যদের ভুয়া প্রমাণ তৈরি করা, নারীদের ওপর হামলা চালানো এবং স্পাইকযুক্ত লাঠি ও টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করতে দেখা যায়। দিল্লি পুলিশের এই বর্বরোচিত হামলা আন্দোলনকে আরও ছড়িয়ে দেওয়ার অনুঘটক হিসাবে কাজ করে। ভারতের বিরোধী দলগুলোও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বাইরে নিজেদের প্রতিবাদ শুরু করে।

এই বিক্ষোভ খুব দ্রুত পাটনা, মুম্বাই থেকে শুরু করে গোয়া পর্যন্ত পুরো ভারতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিশুদের পরিবারগুলোও এ আন্দোলনে যোগ দেয়। অন্যদিকে, ২০২১ সালে দিল্লির সীমান্তে টানা এক বছর আন্দোলন করা কৃষকরা আবার পাঞ্জাব থেকে খাবার, রসদ ও অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবক নিয়ে ফিরে আসেন। মোদির দল বিজেপির সাবেক ভোটারদের এই প্রতিবাদে যোগ দেওয়ার অজস্র ‘রিল’ বা ভিডিওতে ভরে যায় সোশ্যাল মিডিয়া।

যা কেবল একটি শিক্ষাসংক্রান্ত বিরোধ হিসাবে শুরু হয়েছিল, তা এখন এক বৃহত্তর প্রতিরোধ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ভারতের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে ভোটার কারচুপি, হর্স-ট্রেডিং (এমপি/এমএলএ কেনাবেচা), বিদ্বেষমূলক ভাষণ, জোরপূর্বক রাজনৈতিক দলবদল এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহারের মাধ্যমে ম্যানিপুলেট করা হচ্ছে, তা নিয়ে আর কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত ‘জরুরি অবস্থার’ সময় যেভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, বর্তমানের ভোটার কারচুপির তুলনায় সে সময়টাকেও তুলনামূলক ভালো মনে হয়।

মোদি এমন এক দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যা তার সব নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নিজের তিনটি মেয়াদে কোভিড-১৯ মহামারি, নোটবাতিল (ডিমোনিটাইজেশন), ৩৭০ ধারা বাতিল, মণিপুরের সহিংসতা কিংবা মূল্যস্ফীতি-কোনো সংকটেই তিনি নাগরিকের কাছে বিন্দুমাত্র দায় স্বীকার করেননি। যখনই তাকে জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে, তিনি ভারতের ভিত্তিমূল অর্থাৎ গণতান্ত্রিক নীতিগুলো থেকে আরও দূরে সরে গেছেন। ২০১৯ সালে কোনো সুনির্দিষ্ট আলোচনা ছাড়াই যখন তিনি সংসদে নাগরিকত্ব সংশোধন আইন গায়ের জোরে পাশ করিয়েছিলেন, তখনো একইভাবে জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। তৎকালীন সেই ক্ষোভের সঙ্গে বর্তমান মুহূর্তের অনেকটাই মিল রয়েছে, তবে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে তা হঠাৎ থমকে যায়। তবে এবার তিনি তার প্রধানমন্ত্রিত্বের, এমনকি পুরো রাজনৈতিক জীবনের, সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি।

২০০২ সালে প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর থেকে মোদি কখনো হারেননি। ২০০১ সালে নির্বাচিত না হয়েও তাকে গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি টানা তিনবার মুখ্যমন্ত্রী এবং পরবর্তীকালে টানা তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন-আর প্রতিবারই নিজের সুবিধার্থে নির্বাচনের নিয়মকানুনে কারচুপি করেছেন।

সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রথম দুই দিন মোদি ব্যক্তিগতভাবে শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে কোনো কথাই বলেননি। আর তৃতীয় দিনে, আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করে, তিনি সংসদ থেকেই গায়েব হয়ে যান। তার বিবেচনায় সব সময়ই কোনো না কোনো দোষ বিরোধী দল অথবা নাগরিকদের, কিংবা কোনো ‘বিদেশি শক্তির’। দায়ভার সব সময় অন্য কারও ওপর চাপানোই যেন তার নিয়ম।

কিন্তু এবার হয়তো এই কৌশল আর কাজ করবে না। তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে এত ঐক্যবদ্ধ, বৈচিত্র্যময়, তরুণ ও ক্ষুব্ধ বিরোধী শক্তির মুখোমুখি তিনি এর আগে কখনো হননি। শিক্ষার্থীরা চায় শিক্ষামন্ত্রীকে জবাবদিহি করতে হবে এবং স্বভাবতই এর দায় মোদিকেও নিতে হবে। আয়োজকরা এই পদযাত্রাকে ভারতের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসাবে দেখছেন এবং তা যথার্থই। শাহীনবাগ এবং কৃষক আন্দোলনের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রতিবাদ এখন গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে।

সোনম ওয়াংচুককে আটক করা থেকে শুরু করে আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো-সরকারের নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্তই হিতে বিপরীত হয়েছে এবং আন্দোলনকারীদের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করেছে। সারা ভারতের মানুষের একত্রিত হওয়ার যে অনন্য অনুভূতি ২০১৪ সালে হারিয়ে গিয়েছিল, যন্তর মন্তরে আজ তা আবার ফিরে এসেছে। নিজেদের ওপর নেমে আসা এত হিংস্রতার বিপরীতে গিয়েও শিক্ষার্থীরা সেই প্রতিবাদস্থলে ফিরে এসেছে। তারা জায়গাটি পরিষ্কার করছে, একে অপরকে সাহায্য করছে এবং দিল্লি পুলিশের বর্বরোচিত কর্মকাণ্ডের নথিপত্র তৈরি করছে। অন্যদিকে ওয়াংচুক হাসপাতালেই তার অনশন অব্যাহত রেখেছেন। অজ্ঞাত পরিচয় দানকারীরা ফুড-ডেলিভারি অ্যাপের মাধ্যমে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার ও পানি পাঠাচ্ছেন। ডাক্তাররা আহতদের চিকিৎসা দিতে স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে এগিয়ে এসেছেন। অন্যরা আগামী দিনগুলোতে কী কী সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত, তা নিয়ে ভিডিও বানাচ্ছেন, গান গাইছেন, কবিতা আবৃত্তি করছেন এবং সামনে যা-ই আসুক না কেন, তার মুখোমুখি হতে নিজেদের প্রস্তুত করছেন।

মোদি এখনো ক্ষমতায় আছেন এবং এখনো আন্দোলনকারীদের সঙ্গে দেখা করতে, ক্ষমা চাইতে বা শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত করতে অস্বীকার করছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যে কোনো বিক্ষোভকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসাবে গণ্য করে আন্দোলনকারীদের গ্রেফতার করার জন্য পুলিশের ক্ষমতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনকি যন্তর মন্তর খালি করার জন্য কলকাতা ও কাশ্মীর থেকে আধা-সামরিক বাহিনী আনার উদ্বেগজনক খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

তবে ২০১৪ সালের পর এই প্রথম-ভয় এবার স্থান বদলেছে।

আলজাজিরা থেকে ভাষান্তরিত

বিদ্যা কৃষ্ণন : ভারতের অনুসন্ধানী সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম