Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

নিউইয়র্কের চিঠি

যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী বহিষ্কারের সর্বগ্রাসী রূপ

Advertisement

Icon

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

Advertisement

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ চলাকালে অবৈধ অভিবাসীদের আটক ও ডিপোর্টেশনের সংখ্যা কিছুটা কমলেও তা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধ শুরু হয়েছিল গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে। মাঝে কিছু সময়ে যুদ্ধের প্রচণ্ডতা কমলেও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা প্রায় নাকচ হওয়ার পর হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অভিবাসনবিষয়ক প্রধান আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট এজেন্সি’র (আইস) অবৈধ অভিবাসী আটক ও বহিষ্কার কার্যক্রম পুনরায় গতি সঞ্চার করেছে। বলা যায়, সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসীবিরোধী অভিযান।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসী আটক গত জানুয়ারির তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে। কেবল নিউইয়র্ক সিটিতেই গত সাড়ে তিন মাসে ‘আইস’ প্রায় ২৬ হাজার অবৈধ অভিবাসীকে গ্রেফতার করেছে। অথচ এপ্রিলের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৬ লাখের কম। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী ডিটেনশন সেন্টারগুলোতে আটক রয়েছে ৬৫ হাজার ৭৭০ জন অভিবাসী। ধরপাকড়ের ব্যাপকতায় নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অভিবাসীসহ সব অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে ভীতি ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর ‘আইস’ গত দেড় বছরে ৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি অভিবাসীকে বহিষ্কার করেছে। ২০২৫ সালে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৬৬৩ জন এবং ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ৪ লাখ ৩ হাজার ২৯৪ জন বহিষ্কৃত হয়েছে। স্থানীয় বাংলাদেশি কমিউনিটি, সংবাদপত্র, বাংলাদেশ ইমিগ্রেশন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, গত দেড় বছরে বহিষ্কৃত অভিবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল তিনশ’র বেশি। নতুন অভিযানে কতজন বাংলাদেশি আটক হয়েছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন দায়িত্ব গ্রহণের পর মেক্সিকো সীমান্ত দিয়ে অভিবাসী অনুপ্রবেশ লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে। কারণ ট্রাম্পযুগে যুক্তরাষ্ট্রের ‘কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন’ এজেন্টরা অবৈধ অভিবাসীদের অনুপ্রবেশ করতে না দেওয়ার ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট বাইডেন যুগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর আচরণ করছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটির দাবি অনুযায়ী, ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে প্রবেশ করার পর ২০২৫-এর জানুয়ারি থেকে ২০২৬-এর জুন পর্যন্ত বর্ডার প্রটেকশন এজেন্টরা মেক্সিকো সীমান্তে আটকে দিয়েছে প্রায় ৩০ লাখ বিদেশিকে। সৌভাগ্যবশত অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যা অতি নগণ্য।

এছাড়া যেসব অবৈধ অভিবাসী স্বেচ্ছায় যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে তাদের নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবেন, তাদের জন্য ট্রাম্প প্রশাসন বিমানভাড়া ছাড়াও নগদ ৩ হাজার ডলারের আর্থিক প্রণোদনা ঘোষণা করার পর গত দেড় বছরে সরকারি প্রণোদনা নিয়ে প্রায় এক লাখ অভিবাসী নিজ নিজ দেশে ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে। প্রশাসনের মতে, গ্রেফতার ও আটক রাখার চেয়ে প্রণোদনা দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো কম ব্যয়বহুল। ডিটেনশন সেন্টারে আটক রাখার মাথাপিছু বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১৭ হাজার ডলার। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গ্রেফতার ও আটক থাকার ভয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে গেছে আরও প্রায় ১০ লাখ অবৈধ অভিবাসী।

ট্রানজেকশনাল রেকর্ডস অ্যাকসেস ক্লিয়ারিং হাউজের হিসাবমতে, অভিবাসন আদালতগুলোতে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা মামলার সংখ্যা গত বছরের জুনের ৩১ হাজার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে চলতি বছরের জুনে দাঁড়িয়েছে ৫২ হাজারে। এ মামলাজট কবে খুলবে তা প্রশাসনও জানে না। মামলাগুলোর আওতায় থাকা একক ও পারিবারিক সদস্যসহ আবেদনকারী মোট অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ৩২ লাখ।

চলতি জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক রিপোর্টে যুক্তরাষ্ট্রের শহর এলাকাগুলোতে মাত্র ৫ দিনে ১০ হাজারের বেশি অভিবাসী আটকের কথা বলা হয়েছিল। এরপর থেকে আটককৃতের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। ফলে অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ‘আইস’কে নির্দেশ দিয়েছে, যাতে তারা বহিষ্কারযোগ্য অভিবাসীদের আটকের কাজে অধিক মনোযোগী হন এবং কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করেন। এরপর থেকে ‘আইস’ এজেন্টরা অভিবাসীদের আদালতে হাজিরার সময়, ট্রাফিক সিগন্যালে এবং পথেঘাটে সন্দেহভাজন অভিবাসীকে গ্রেফতার শুরু করেছে।

এ উদ্যোগের ফলে চলতি বছরের শুরুতে দৈনিক আটক সংখ্যা ১ হাজারের তুলনায় এখন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, হোয়াইট হাউজ গ্রেফতারের সংখ্যা আরও বাড়াতে চায়। বর্তমান গতি কতদিন বজায় রাখা সম্ভব হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে দৈনিক ২ হাজার গ্রেফতারই এখন নতুন মানদণ্ড। টাইমস বলেছে, গ্রেফতার বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবৈধ অভিবাসীদের ব্যাপক সংখ্যায় ডিপোর্ট করার প্রতিশ্রুতি পূরণে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ডিপার্টমেন্ট অফ হোমল্যান্ড সিকিউরিটির মুখপাত্র লরেন বিস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, ‘আমাদের বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। কেউ যদি অবৈধভাবে আমাদের দেশে আসেন, আমরা তাকে খুঁজে বের করব, গ্রেফতার করব এবং ডিপোর্ট করব।’

‘আইস’-এর সূত্র উল্লেখ করে রিয়েল-টাইমট্রেকিং প্ল্যাটফর্মের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ থেকে ২০ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রে ২১ হাজার ৯০০-এর বেশি অভিবাসীবিরোধী অভিযান চালানো হয়েছে এবং এসব অভিযানে গ্রেফতার, ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো এবং কিছু ডিপোর্টেশনের ঘটনাও ঘটেছে। কেবল নিউইয়র্ক সিটিতেই এপ্রিল থেকে সাড়ে তিন মাসে ২৬ হাজারের বেশি অভিবাসীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের তথ্যমতে, টেক্সাসে হিসপানিক অধ্যুষিত এলাকাগুলো-হারলিঞ্জেন, এল পাসো এলাকায় সর্বোচ্চসংখ্যক অবৈধ অভিবাসী গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেছে। শহরাঞ্চলের মধ্যে নিউইয়র্ক সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেসে, মায়ামি ও হিউস্টনে অভিবাসী আটকের সংখ্যা অধিক। পেনসিলভেনিয়া, ওয়াশিংটন, ক্যালিফোর্নিয়া ও মিডওয়েস্টেও ‘আইস’-এর ব্যাপক ধরপাকড় অভিযানের খবর পাওয়া গেছে। গণমাধ্যম কর্মীরা উল্লেখ করেছেন, অভিবাসীদের গ্রেফতারের জন্য ইমিগ্রেশন কোর্ট এলাকা, অভিবাসীদের কর্মস্থল ও বাসস্থান, বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বেছে নেওয়ার পাশাপাশি ‘আইস’-এর নজরদারি, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি করেছে বলেও ‘ডিপোর্টেশন ট্রেকারডট লাইভ’ উল্লেখ করেছে।

একটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘আইস’-এর অভিযান দেশের সর্বত্র চলছে। কিন্তু তাদের অভিযান সব অঞ্চলে একরকম নয়। যেখানে যে কৌশলে অভিযান পরিচালনা করলে অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে, তারা সেভাবে অভিযান চালাচ্ছে। যদিও দৃশ্যত শহর ও সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অবৈধ অভিবাসী ধরপাকড়ের সংখ্যা অধিক, কিন্তু আমেরিকান গ্রাম ও শহরতলিতেও ‘আইস’-এর অভিযান চলছে। অভিবাসন অধিকার প্রবক্তারা প্রতিটি অভিবাসী কমিউনিটির বৈধ-অবৈধ অভিবাসীদের প্রতি ‘আইস’-এর অভিযানে আটক হওয়ার আগে, এমনকি আটক হওয়ার পরও আইনি সহায়তা লাভের সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রকে অবৈধ অভিবাসীমুক্ত করার লক্ষ্যে ‘আইস’-এর কর্মকাণ্ড আরও বেগবান করতে গত বছর ফেডারেল সংস্থাটির বার্ষিক বাজেট ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি করে ২৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। ফেডারেল সরকারের যে কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে ‘আইস’-এর বরাদ্দ সর্বোচ্চ। এ বিশাল বাজেটের আওতায় ‘আইস’ নতুন লোক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তারা ১০ হাজার নতুন নিয়োগ দেবে। এছাড়া একটি পাইলট প্রকল্পের আওতায় ‘আইস’ এজেন্টদের ৫০ হাজার ডলার বোনাস প্রদানের ঘোষণাও করা হয়েছে, যাতে তারা অভিবাসীদের আটকের পর যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে বহিষ্কার করতে সব বাধা অতিক্রম করে প্রশাসনের কর্মসূচিকে সফল করে। তবে অভ্যন্তরীণ চাপে এ প্রকল্প সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও প্রশাসনের উদ্যোগে যে আদৌ ভাটা পড়েনি, তা অভিবাসী আটকের তোড়জোড়ে স্পষ্ট।

নিউইয়র্কভিত্তিক ‘ভেরা ইনস্টিটিউট অফ জাস্টিসে’র অ্যাডভান্সিং ইউনিভার্সাল রিপ্রেজেন্টেশনের পরিচালক শায়না কেসলার এক বিবৃতিতে ‘আইস’-এর চলতি অভিবাসীবিরোধী অভিযানকে নিরীহ-নিরপরাধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে নির্বিচার-অমানবিক উদ্যোগ হিসাবে বর্ণনা করে বলেছেন, অবৈধ অভিবাসী হিসাবে যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অনেকে ছাত্র, ব্যবসায়ী এবং নিউইয়র্কের দীর্ঘদিনের বাসিন্দা। কুইন্স বরো প্রেসিডেন্ট ডনোভান রিচার্ডস ঢালাও অভিবাসী গ্রেফতারের ফলে নিউইয়র্কের অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে উপস্থিতি কমেছে, এমনকি ক্লিনিক ও ডাক্তারের অফিসে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। তবে নিউইয়র্কবাসী অভিবাসীদের জন্য আশার কথা হলো, এ অঙ্গরাজ্যের ডেমাক্রেট গভর্নর ক্যাথি সি হকুল অভিবাসীরা এখন যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, সেটিকে তাদের ওপর ফেডারেল সরকারের নজিরবিহীন আক্রমণ বলে মনে করেন এবং অঙ্গরাজ্যের পক্ষ থেকে অভিবাসীদের বহিষ্কার ঠেকাতে আইনি সহায়তা দিতেও তিনি প্রস্তুত। ভেরা ইনস্টিটিউটের শায়না কেসলার অভিবাসীদের আইনি সহায়তা তহবিল জরুরি ভিত্তিতে ১৭৫ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার জন্য গভর্নর হকুলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রে মোট বাংলাদেশি অভিবাসীর তিন-চতুর্থাংশেরই বসবাস ও কর্মসংস্থান যেহেতু নিউইয়র্ক নগরীতে, সেজন্য ট্রাম্পের অভিবাসী বিতাড়ন অভিযান থেকে বাংলাদেশি অভিবাসীদের রক্ষায় নিউইয়র্কের মেয়রের অফিসের অভিবাসনবিষয়ক অফিস এবং বিভিন্ন বাংলাদেশি অধিকার সংগঠন অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের বিনামূল্যে আইনগত সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। তাদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের আইনগতভাবে বসবাস ও কাজ করার বৈধ অধিকার না থাকা সত্ত্বেও তারা যাতে ‘আইস’-এর হাতে আটক না হন, বা আটক হলেও যেসব অধিকার তাদের ওপর প্রযোজ্য, সেগুলো সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জেনে গ্রেফতার এড়াতে। মেয়র অফিস অভিবাসী কমিউনিটির পাশে থাকার এবং তাদের জন্য আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে।

আনোয়ার হোসেইন মঞ্জু : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সিনিয়র সাংবাদিক

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম