Logo
Logo
×
   

Advertisement

উপসম্পাদকীয়

কর্মসংস্থানে অদৃশ্য বাস্তবতা

Advertisement

Icon

ড. হাসান সাইমুম ওয়াহাব

প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

কর্মসংস্থানে অদৃশ্য বাস্তবতা

Advertisement

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি এখন আর চাকরির নিশ্চয়তা দেয় না। প্রার্থীর দক্ষতা, সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক সক্ষমতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর নিয়োগব্যবস্থা, সব মিলিয়ে বদলে গেছে কর্মসংস্থানের বাস্তবতা। এ পরিবর্তনের সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে কেন জীবনবৃত্তান্ত আজ সাফল্যের গল্পের মাত্র অর্ধেক অংশ, তা দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

সাধারণত উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রক্রিয়াটিকে আমরা প্রায়শই শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনের মানদণ্ডে বিচার করি। কিন্তু স্নাতকদের কেউ কেউ কেন সফলতার চূড়ায় পৌঁছান আর কেউ কেন তা অর্জনে ব্যর্থ হন, তা গভীরভাবে বুঝতে হলে আমাদের সমাজের কাঠামোগত বাস্তবতার দিকে তাকাতে হবে। কর্মসংস্থান যোগ্যতা বা ‘এমপ্লয়েবিলিটি’ শুধু আপনি কতটুকু জানেন তার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি একই সঙ্গে একটি জটিল সামাজিক বিন্যাস, যেখানে আপনার অবস্থান কোথায়, সেটিও একটি বড় বিষয়। বহু দশক ধরে শিক্ষাব্যবস্থার ‘সামাজিক চুক্তিটি’ ছিল খুবই সরল; মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করো, একটি ডিগ্রি অর্জন করো এবং সমাবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই একটি নিশ্চিত ক্যারিয়ার তোমার জন্য অপেক্ষা করবে। পথটি ছিল সোজা এবং স্পষ্ট। কিন্তু বর্তমানে ‘এন্ট্রি লেভেল : ৫ বছরের অভিজ্ঞতা আবশ্যক’ লেখা বিজ্ঞাপনের সামনে হতাশ হয়ে বসে থাকা কোনো নবীন স্নাতককে জিজ্ঞাস করলে জানা যাবে, সেই সুনির্দিষ্ট পথটি এখন এক জটিল গোলকধাঁধায় পরিণত হয়েছে। সিজিপিএ চার পেয়েও একজন কেন একটি সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেতে হিমশিম খায়, অথচ তিন পাওয়া আরেকজন অনায়াসে করপোরেটজগতে জায়গা করে নেয়? এর উত্তর শুধু ‘ভাগ্য’ নয়। উত্তর লুকিয়ে রয়েছে সমাজতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের এক অদৃশ্য স্তরে, যা নির্ধারণ করে দেয় কে চাকরি পাবে, কার পদোন্নতি হবে আর কে পেছনে পড়ে থাকবে। সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে একজন গ্র্যাজুয়েট বাজারে মূলত তিন ধরনের ‘সম্পদ’ নিয়ে আসেন। তবে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী শুধু প্রথমটির ওপরই জোর দেন, যেটি হলো ‘অর্জিত দক্ষতা’ বা ‘হিউম্যান ক্যাপিটাল’; এটি হলো শ্রেণিকক্ষে শেখা বিদ্যা, যেমন: আপনার কোডিং করার দক্ষতা, সামষ্টিক অর্থনীতির জ্ঞান কিংবা নার্সিংয়ের সনদ। দীর্ঘদিন এটুকুই চাকরি পাওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের এ সময়ে দাঁড়িয়ে আমরা ডিগ্রি অর্জনের এক বিশাল জোয়ার দেখছি। যখন সবার কাছেই ডিগ্রি থাকে, তখন সেই ডিগ্রি হয়ে দাঁড়ায় একটি ‘সনদ’ মাত্র।

দ্বিতীয় সম্পদটি হচ্ছে ‘সামাজিক নেটওয়ার্ক’ বা ‘সোশ্যাল ক্যাপিটাল’, সহজ কথায় এটি হলো ‘কার সঙ্গে আপনার পরিচিতি আছে।’ চাকরির বাজারে এটি এখনো সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি। সমাজবিজ্ঞানের আলোকে এখানে এক বিশাল বৈষম্য স্পষ্ট। উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক যোগাযোগের একটি সুদৃঢ় সুযোগ থাকে, যেমন-কোনো ল ফার্মে পারিবারিক পরিচিতি কিংবা কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিবেশী। এ জানাশোনাগুলো এমন কিছু অভ্যন্তরীণ তথ্য জোগায়, যা পেশাদার যোগাযোগ মাধ্যমে (যেমন লিঙ্কডইন) পাওয়া যায় না। অন্যদিকে, প্রথম প্রজন্মের গ্র্যাজুয়েটদের জন্য এ সামাজিক মূলধনের অভাবই চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা।

তৃতীয় সম্পদটি হলো সাংস্কৃতিক খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা। এটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম এবং সম্ভবত সবচেয়ে কার্যকর উপাদান। এটি হলো নির্দিষ্ট কোনো পেশাদার পরিবেশে সহজে ‘খাপ খাইয়ে নেওয়ার’ সক্ষমতা। সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা প্রয়োগ, কথা বলার ধরন কিংবা নিয়োগকর্তার মতো একই মানসিকতা ও রুচি বহন করা। নিয়োগদাতারা প্রায়ই একে ‘সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন’ বলে থাকেন, কিন্তু সমাজবিজ্ঞানের বিচারে এটি অনেক সময় একটি সূক্ষ্ম বার্তা দেয় ‘তুমি আমাদেরই লোক।’ এটি মূলত এমন একটি ব্যবস্থা যা শুধু তাদেরই সুযোগ দেয়, যারা পেশাদার জগতের অদৃশ্য নিয়মগুলো আগে থেকেই জানে।

কর্মসংস্থান যোগ্যতার ইতিহাস হলো দায়িত্ব হস্তান্তরের এক দীর্ঘ গল্প। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর সোনালি যুগে নতুন কর্মী গড়ে তোলার দায়িত্ব ছিল রাষ্ট্র ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর। নব্বইয়ের দশকে এসে এক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। হঠাৎ করেই পাশ করার দিন থেকেই ‘চাকরির জন্য প্রস্তুত’ থাকার দায়িত্ব গিয়ে পড়ে স্বয়ং শিক্ষার্থীর কাঁধে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে ওঠে দ্রুত প্রয়োগযোগ্য দক্ষতা তৈরির কারখানা।

আধুনিক বাস্তবতায় বর্তমানে আমরা ‘সনদের মূল্যস্ফীতির’ যুগে বসবাস করছি। ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ায় নিয়োগকর্তারা আরও বেশি দাবি করছেন; প্রশাসনিক পদের জন্যও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বা বিনা বেতনের ইন্টার্নশিপ, যা শুধু সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের পক্ষেই নেওয়া সম্ভব।

২০২৬ সালের কর্মক্ষেত্রকে বদলে দেওয়া তিনটি প্রবণতা তথা বাস্তবতা এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, যার পেছনে রয়েছে মূল তিনটি কারণ, যথা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ছাঁকনি : আপনার জীবনবৃত্তান্ত প্রথম যে ‘সত্তা’ দেখে, তা এখন কোনো মানুষ নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এতে এক অদ্ভুত সামাজিক বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে! ছাঁকনিতে টিকতে আপনাকে রোবটের মতো নিখুঁত হতে হবে, আর চাকরি টিকিয়ে রাখতে আপনাকে হতে হবে পুরোপুরি মানবিক। স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার এই যুগে শুধু সেই পদগুলোই সুরক্ষিত, যেখানে উচ্চমানের ‘মানসিক বুদ্ধিমত্তা’ প্রয়োজন, যা ক্লাসরুমে শেখানো সবচেয়ে কঠিন।

প্রারম্ভিক বা ‘এন্ট্রি-লেভেল’ চাকরির বিলুপ্তি : প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রশিক্ষণের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের ওপরই চাপিয়ে দিচ্ছে। ‘অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অভিজ্ঞতা দরকার’ এই চক্রটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। এটি শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরো সময়টাই বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করতে বাধ্য করে; যা শুধু তাদের জন্যই সুবিধাজনক যাদের জীবিকার জন্য খণ্ডকালীন চাকরি করতে হয় না।

‘গিগ’নির্ভর গ্র্যাজুয়েটের সংখ্যাবৃদ্ধি : অনেক গ্র্যাজুয়েট এখন আর নির্দিষ্ট ‘ক্যারিয়ারে’ প্রবেশ করছেন না; তারা যুক্ত হচ্ছেন ‘গিগ’ বা চুক্তিভিত্তিক কাজে। তারা ফ্রিল্যান্সার, চুক্তিভিত্তিক কিংবা স্বাধীন উদ্যোগী কিংবা উদ্যোক্তা। এতে অতীতের মতো সামাজিক সুরক্ষাবেষ্টনী নেই, যা কর্মসংস্থান যোগ্যতাকে দিনরাত নিজের প্রচার চালিয়ে যাওয়ার এক নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় পরিণত করেছে।

নতুন পথের সন্ধানে : একটি মানবিক রূপরেখায় পুরো পরিস্থিতি হতাশাজনক মনে হলেও এতে ভেঙে পড়ার কিছু নেই। সামাজিক কাঠামোর এ ‘খেলাটি’ বুঝতে পারাটাই জয়ের প্রথম ধাপ।

গ্র্যাজুয়েটদের করণীয় : নিজেকে কেবল একটি নিখুঁত ‘পণ্য’ হিসাবে উপস্থাপন বন্ধ করুন। জোর দিন সম্পর্কের শক্তিতে। নতুন নতুন সামাজিক মাধ্যমে যুক্ত হন, নিজের গণ্ডির বাইরের অভিজ্ঞ মানুষদের থেকে পরামর্শ নিন এবং নিজের খাতের অঘোষিত নিয়মগুলো শিখুন। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির যুগে আপনার সহানুভূতিশীলতা, নেতৃত্ব এবং জটিল সমস্যার সমাধানের ক্ষমতাই হবে আপনার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

নিয়োগকর্তাদের করণীয় : শুধু ‘খাপ খাইয়ে নেওয়ার’ মানসিকতা দেখে নিয়োগ না দিয়ে ‘নতুন কিছু যুক্ত করার’ সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিন। ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষকে সুযোগ দিলে প্রতিষ্ঠানে নতুন চিন্তার বিকাশ ঘটে। ‘অভিজ্ঞতার চক্রাবর্ত’ ভেঙে আবার মানুষের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করার সময় এসেছে।

শেষ কথা, ডিগ্রি একটি মাধ্যম মাত্র, মূল গন্তব্য নয়। ২০২৬ সালের কর্মক্ষেত্রের এ জটিল পথ অতিক্রম করার সময় আমাদের মনে রাখা দরকার, কর্মসংস্থান যোগ্যতা শুধু কোনো অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি মানুষের জীবনের গল্প। এটি সুযোগ-সুবিধা এবং এমন একটি ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার সাহস, যা সবার সফলতার কথা ভেবে তৈরি হয়নি। ঐতিহ্যবাহী সেই মইটি হয়তো আর নেই, কিন্তু যারা এ নতুন ব্যবস্থার রূপরেখা বোঝেন, তাদের জন্য চূড়ায় পৌঁছানোর আরও অনেক পথ খোলা আছে। আমাদের শুধু নিশ্চিত করতে হবে যেন আমাদের পেছনের পথটি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য সবসময় উন্মুক্ত থাকে!

ড. হাসান সাইমুম ওয়াহাব : কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষজ্ঞ; উপপরিচালক গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ, রিসার্চ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি রিলেশন্স (জিএসআরআইআর), ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি)

Advertisement

Advertisement

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম